শুষ্ক ও রুক্ষ চুলে সিল্ক প্রোটিন! মিরাকল নাকি শুধু হাইপ?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
চুল কেবল সৌন্দর্যের অনুষঙ্গই নয়, এটি ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য ও যত্নের নীরব বার্তাবাহক। একটি নারীর সৌন্দর্যের অন্যতম দিকই হলো তার ঘন স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল। কিন্তু আধুনিক জীবনের ধুলো–দূষণ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ,অতিরিক্ত হিট স্টাইলিং, রাসায়নিক প্রসাধনীর ব্যবহার, আবহাওয়ার রেডিকাল চেঞ্জ এবং শারীরিক সমস্যাসহ নানা রকম কারণই চুলকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তোলে। ফলে রুক্ষতা, শুষ্কতা, ভাঙন, উজ্জ্বলতা হারানো এবং অকাল ক্ষয়! ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুলের যত্নে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি নাম, সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট।
রেশম থেকে প্রাপ্ত এই প্রোটিন কীভাবে চুলের গভীর স্তরে কাজ করে, কেন এটি চুলকে শুধু মসৃণই নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যবান করে তোলে! এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে সিল্ক প্রোটিন থেরাপি।
সিল্ক প্রোটিন কী এবং এটি আসে কোথা থেকে?
সিল্ক প্রোটিন মূলত প্রাকৃতিক রেশম তন্তু থেকে নিষ্কাশিত একধরনের প্রোটিন, যা প্রধানত দুইটি উপাদানে গঠিত হয়।
১। ফাইব্রোইন ও
২। সেরিসিন।
এই দুই উপাদানই চুলের গঠনগত প্রোটিনের সঙ্গে আণবিকভাবে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। মানব চুলের প্রধান উপাদানটি হলো কেরাটিন। সিল্ক প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড গঠন এমনভাবে সাজানো যে এটি কেরাটিনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সহজেই সংযুক্ত হতে পারে। ফলে এটি কেবল চুলের উপরের স্তরে আস্তরণ তৈরি করে না, বরং চুলের ভেতরের দুর্বল বন্ধনগুলোকে শক্তিশালী করতেও সহায়তা করে।
চুলের সমস্যার মূল কারণ এবং সিল্ক প্রোটিনের ভূমিকা!
আর্দ্রতা ও প্রোটিনের ঘাটতি, চুলের রুক্ষতা ও প্রাণহীনতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ। নিয়মিত সূর্যের তাপ, ধোয়ার সময় অতিরিক্ত ডিটারজেন্টযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার, রং বা স্ট্রেইট করার মতো কেমিক্যাল প্রসেসগুলো চুলের প্রাকৃতিক তেল ও প্রোটিন ধুয়ে নিয়ে যায়। সিল্ক প্রোটিন এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি চুলের কিউটিকল স্তরের ফাঁকগুলো পূরণ করে, আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং চুলের উপর একটি সূক্ষ্ম সুরক্ষাবলয় তৈরি করে। এর ফলে চুল কম শুষ্ক হয়, সহজে জট বাঁধে না এবং ভাঙনের প্রবণতাও কমে আসে।
অনেকের ধারণা, সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্টের মসৃণতা হয়তো সাময়িক বা কেবল উপরের স্তরের প্রভাব। বাস্তবে বিষয়টি আরও গভীর। সিল্ক প্রোটিনের অণুগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় এটি চুলের কোর্টেক্স স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই প্রোটিন চুলের ভেতরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন চেইনকে সাময়িকভাবে হলেও পুনর্গঠন করে। ফলে চুল দেখতেই মসৃণ লাগার পাশাপাশি স্পর্শেও শক্তিশালী ও নমনীয় অনুভূত হয়। এটি নিয়মিত ব্যবহারে চুলের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ে, যা চুল ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়।
সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট কীভাবে কাজ করে?
এই ট্রিটমেন্ট সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে চুল গভীরভাবে পরিষ্কার করা হয়, যাতে জমে থাকা তেল, ময়লা ও পুরোনো প্রোডাক্টের অবশিষ্টাংশ দূর হয়। পরিষ্কার চুলে প্রোটিন শোষণ ক্ষমতা বেশি থাকে।
পরবর্তী ধাপে সিল্ক প্রোটিনসমৃদ্ধ ফর্মুলা চুলে প্রয়োগ করা হয়। এটি চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত সমানভাবে লাগানো হয়, যাতে প্রতিটি স্ট্র্যান্ড প্রোটিন পায়। কিছু ক্ষেত্রে হালকা তাপ প্রয়োগ করা হয়, যা প্রোটিনকে চুলের ভেতরে প্রবেশে সহায়তা করে।
একদম শেষ ধাপে চুলকে স্থিতিশীল করা হয়, যাতে প্রোটিন স্তর দীর্ঘসময় ধরে চুলে ধরে থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় চুলের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত না করে বরং ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা হয়।
কাদের জন্য বেশি জরুরি?
যাদের চুল নিয়মিত রং করা, স্ট্রেইট বা কার্ল করা হয়, তাদের চুলে প্রোটিন ক্ষয় তুলনামূলক বেশি। সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট এই ধরনের চুলের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। এছাড়া অতিরিক্ত শুষ্ক, ফ্রিজি বা প্রাণহীন চুলে এই থেরাপি দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এটি এমন কোনো ম্যাজিক সমাধান নয়, যা একবার করলেই চুল চিরতরে সুস্থ হয়ে যাবে এটি একটি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া, যার ফল স্থায়ী করতে নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন।
চুলের যত্নে অনেক সময় সৌন্দর্যের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু চুলের স্বাস্থ্য অবহেলিত থাকে। সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে। এই প্রোটিন চুলকে উজ্জ্বল ও মসৃণ করে, একই সঙ্গে চুলের প্রাকৃতিক আর্দ্রতাও ধরে রাখে। ফলে চুল অতিরিক্ত ভারী বা কৃত্রিমভাবে চকচকে দেখায় না। বরং একটি স্বাভাবিক, স্বাস্থ্যবান লুক তৈরি হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকে।
অতিরিক্ত প্রোটিন কি চুলের ক্ষতি করতে পারে?
যেকোনো ভালো জিনিসের মতো প্রোটিনেরও সীমা আছে। চুলে অতিরিক্ত প্রোটিন জমলে তা উল্টো চুলকে শক্ত ও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। একে বলা হয় প্রোটিন ওভারলোড। তাই সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে চুলের বর্তমান অবস্থা বোঝা জরুরি। যদি চুল ইতিমধ্যে শক্ত কিন্তু শুষ্ক হয়, তাহলে আর্দ্রতাদায়ী উপাদানের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে এই ট্রিটমেন্ট করা প্রয়োজন। সঠিক ব্যবহারে এটি চুলের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী।
বর্তমানে বাজারে সিল্ক প্রোটিনসমৃদ্ধ শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ও সিরাম সহজেই পাওয়া যায়। এগুলো নিয়মিত ব্যবহারে চুলের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে। অন্যদিকে পেশাদার ট্রিটমেন্টে প্রোটিনের ঘনত্ব ও প্রয়োগ পদ্ধতি তুলনামূলক গভীর। এটি সাধারণত দীর্ঘদিনের ক্ষতিগ্রস্ত চুল পুনরুদ্ধারে বেশি কার্যকর।
নিয়মিত ও সঠিকভাবে সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট গ্রহণ করলে কয়েকটি পরিবর্তন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। যেমন: চুলের ভাঙন কমে, আগা ফাটার সমস্যা হ্রাস পায়, চুল সহজে ম্যানেজ করা যায় এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুল তার প্রাকৃতিক স্থিতিস্থাপকতা ফিরে পায়। ফলে দৈনন্দিন আঁচড়ানো বা স্টাইলিংয়ে চুল কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট চুলের যত্নের জগতে কোনো ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ড নয়। এটি এমন একটি সমাধান, যা চুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভেতরের স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেয়। সিল্কের সূক্ষ্ম প্রোটিন চুলের দুর্বল অংশে ভর করে ধীরে ধীরে শক্তি ফিরিয়ে আনে। তবে মনে রাখতে হবে, সুস্থ চুলের জন্য কোনো একক ট্রিটমেন্টই যথেষ্ট নয়। সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি, কম রাসায়নিক ব্যবহার এবং নিয়মিত যত্নের সঙ্গে সিল্ক প্রোটিন ট্রিটমেন্ট যুক্ত হলে তবেই চুল সত্যিকার অর্থে মসৃণ, প্রাণবন্ত ও স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।