ইতিহাস নাকি সতর্ক সংকেত? পানির নিচের চাপা পড়া ‘সানকেন সিটি’র রহস্য

ইতিহাস নাকি সতর্ক সংকেত? পানির নিচের চাপা পড়া ‘সানকেন সিটি’র রহস্য
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

এক সময় যেখানে মানুষের কোলাহল ছিল, পথের ধুলো উড়ত, উপাসনার ঘণ্টা বাজত কিংবা বাজারের দরকষাকষি চলত, আজ সেখানে শুধু নীরব পানি। ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ে আছে রাস্তা, দেয়াল, ঘরবাড়ি, এমনকি পুরো নগরজীবনের ছাপ। এই হারিয়ে যাওয়া শহরগুলোকেই বলা হয় সানকেন সিটি বা ডুবে যাওয়া নগরী। এটি কোনো রূপকথা নয়, বরং মানবসভ্যতা, প্রকৃতি ও সময়ের সংঘাতে তৈরি হওয়া এক বাস্তব ইতিহাস। সানকেন সিটির ধারণা আমাদের কৌতূহলী করে তোলে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও। সভ্যতা কতটা নাজুক, আর প্রকৃতির পরিবর্তনের সামনে মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে, এটিই তার প্রমান!

সানকেন সিটি কী?

লস অ্যাঞ্জেলেসের সান পেড্রো পাড়ার, পয়েন্ট ফার্মিন এলাকায় ১৯২৯ সালে ঘটে যাওয়া একটি প্রাকৃতিক ভূমিধসের স্থান হলো সানকেন সিটি।এই অঞ্চলটি, ১৯২০-এর দশকে জর্জ এইচ. পেক দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। 

সানকেন সিটি বলতে বোঝায় এমন সব জনবসতি বা শহর, যেগুলো কোনো সময় স্থলভাগে গড়ে উঠেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই ডুবে যাওয়া হতে পারে হঠাৎ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে, আবার হতে পারে, ধীরে ধীরে শতাব্দীজুড়ে ঘটে যাওয়া পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলেও। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই শহরগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও পুরোপুরি মুছে যায়নি। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাঠামো আজও পানির তলে অক্ষত আছে, যা গবেষকদের কাছে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।

কীভাবে একটি শহর পানির নিচে চলে যায়?

বেশ কিছু কারন রয়েছে শহরটির এই পরিনতির পেছনে।

যেমন:

⇨ ভূমিকম্প ও ভূমিধস! ভূমিকম্পের ফলে কখনো কখনো ভূমি হঠাৎ নিচে নেমে যায়। উপকূলীয় বা নদীঘেঁষা অঞ্চলে এটি ঘটলে পানি খুব দ্রুত সেই জায়গা দখল করে নেয়। অনেক সানকেন সিটি এক মুহূর্তেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে এভাবেই।

⇨ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি! দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি ধীরে ধীরে বাড়ে। উপকূলবর্তী শহরগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পরিবর্তনের মুখে পড়ে একসময় সম্পূর্ণ ডুবে যায়। এই প্রক্রিয়া ধীর হলেও এর প্রভাব স্থায়ী।

⇨ আগ্নেয়গিরি ও ভূ-গঠন পরিবর্তন! আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত শুধু আগুন নয়, ভূমির কাঠামোও বদলে দেয়। কোথাও ভূমি দেবে যায়, কোথাও আশপাশের জলাধার ফুলে ওঠে। এর ফলে জনবসতি পানির নিচে চলে যেতে পারে।

⇨ নদীপথ পরিবর্তন ও বন্যা! নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে অনেক শহর ধীরে ধীরে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। একসময় সেই এলাকাগুলো স্থায়ী জলাশয়ে পরিণত হয়।

⇨ মানবসৃষ্ট কারণ! সব সানকেন সিটির পেছনে প্রকৃতিই একমাত্র দায়ী নয়। বড় বাঁধ, জলাধার বা বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির ফলে ইচ্ছাকৃতভাবেই অনেক শহর ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নের স্বার্থে মানুষ নিজেই নিজের বসতি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।

সানকেন সিটি কেন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ?

সানকেন সিটি শুধু ডুবে যাওয়া কিছু ইট-পাথরের গল্প নয়। এগুলো মানবসভ্যতার সময়রেখার ফাঁকা জায়গা পূরণ করে। এই শহরগুলোর মাধ্যমে প্রাচীন মানুষের নগর পরিকল্পনা কেমন ছিল তা জানা যায়। তারা জল, কৃষি ও বাণিজ্যকে কীভাবে ব্যবহার করত, কোন পরিবেশগত পরিবর্তন সভ্যতার পতন ডেকে এনেছিল এসবের ধারণা পাওয়া যায়।পানির তলে সংরক্ষিত থাকার কারণে অনেক সময় এসব শহর স্থলভাগের ধ্বংসাবশেষের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকে। ফলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে এগুলো অমূল্য সম্পদ।

সানকেন সিটি গবেষণা সহজ কাজ নয়। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় গবেষকরা ধীরে ধীরে এই হারানো নগরীগুলোর রহস্য উন্মোচন করছেন। বিশেষ ডাইভিং পদ্ধতিতে পানির তলের কাঠামো পর্যবেক্ষণ, সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরের নকশা নির্ণয়,পানির তলের ছবি ও থ্রিডি মানচিত্র তৈরি,পলিমাটি ও স্থাপনার নমুনা বিশ্লেষণ ইত্যাদি গবেষণাগুলো শুধু অতীত জানতেই নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও সাহায্য করে, বিশেষ করে উপকূলীয় শহরগুলোর ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে।

আজকের দিনে সানকেন সিটির আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বরফ গলা, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, এসব কারণে আধুনিক অনেক শহরও ঝুঁকির মুখে। অতীতের সানকেন সিটিগুলো আমাদের দেখায় সভ্যতা ধ্বংস হতে সময় লাগে, কিন্তু শুরুটা হয় অবহেলা থেকে। যে শহরগুলো একসময় শক্তিশালী ছিল, সেগুলোও প্রকৃতির পরিবর্তনের কাছে টেকেনি। এই কারণেই সানকেন সিটি এখন আর শুধু ইতিহাস নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেতও বটে।

মানুষের মানসিকতায় সানকেন সিটির প্রভাব:

ডুবে যাওয়া শহরের ধারণা মানুষের মনে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে। মনে জাগে কৌতূহল, বিস্ময় আর হালকা ভয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা যে শহরগুলোকে স্থায়ী বলে ধরে নিই, সেগুলোও চিরস্থায়ী নয়। অনেক গবেষকরা মনে করেন, সানকেন সিটির গল্প মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এগুলো কল্পনার নয়, বাস্তবতার উদাহরণ।

সানকেন সিটি আসলে মানবসভ্যতার এক স্মৃতিভাণ্ডার। পানির নিচে থাকা প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি রাস্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় ও প্রকৃতির কাছে কোনো শহরই অজেয় নয়। তাই হারিয়ে যাওয়া শহরগুলোকে শুধু কৌতূহলের চোখে দেখলে চলবে না। এগুলোকে বুঝতে হবে সতর্কবার্তা হিসেবে। সানকেন সিটি শুধু অতীতের গল্প নয়, বরং বর্তমানের আয়না এবং ভবিষ্যতের জন্য এক কঠিন শিক্ষা।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ