বারবার সেলফি তুলতে ইচ্ছে করে? এটি নিছক কোন অভ্যাস নয় বরং....

বারবার সেলফি তুলতে ইচ্ছে করে? এটি নিছক কোন অভ্যাস নয় বরং....
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

স্মার্টফোনের ক্যামেরা খুললেই এখন আর শুধু ছবি তোলা হয় না অনেকের ক্ষেত্রে সেটি হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয় খোঁজার আয়না। বাসে বসে, লিফটে দাঁড়িয়ে, রেস্টুরেন্টে খাবারের আগে, এমনকি দুঃখের মুহূর্তেও, নিজের মুখ ক্যামেরাবন্দি করার প্রবণতা যেন নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কি শুধু ছবি তুলছে, নাকি নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে? সেলফি অ্যাডিকশন বা সেলফির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কি নিছক আধুনিক ফ্যাশন, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে জটিল কোনো মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা?

আমরা সামাজিক জীব। আদিকাল থেকেই অন্যের চোখে নিজেকে দেখার প্রবণতা আমাদের আচরণে প্রভাব ফেলেছে। আগে শুধুমাত্র আয়না ছিল নিজের মুখ দেখার প্রধান উপায়, আর এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোনের সামনের ক্যামেরা। তবে পার্থক্য একটাই, আয়নায় দেখা মুখ অন্য কেউ বিচার করত না, কিন্তু সেলফি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের পৌঁছে যায় অসংখ্য মানুষের চোখে।


মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষ নিজের অস্তিত্ব ও মূল্যবোধকে সবসময়ই অন্যের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করতে পছন্দ করে। একটি সেলফিতে পাওয়া লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে সামাজিক স্বীকৃতির একটি পরিমাপক। এই স্বীকৃতির অনুভূতি মস্তিষ্কে স্বল্পমেয়াদি আনন্দের সংকেত পাঠায়, যা ধীরে ধীরে অভ্যাসে রূপ নেয়।

"সেলফি" শব্দটি মূলত এসেছে "সেল্ফ" শব্দ থেকে।  সাধারণত স্মার্টফোন বা ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করে নিজের তোলা ছবিগুলিকে সেল্ফি বোঝায়। এটা কখনও কখনও সেলফিম্যানিয়া নামেও পরিচিত।  অনলাইনে একটি আদর্শ স্ব-চিত্র উপস্থাপনের  বাধ্যতামূলক অনুভূতির প্রতিফলিত করে এটি।  সাম্প্রতিক দশকগুলিতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের বিস্ফোরণ এই আচরণকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ক্রমাগত ছবি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন করছে, যেখানে বাহ্যিক উপস্থিতি এবং সাফল্য বা সুখের প্রদর্শনীই মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

কেন এই আসক্তি তৈরি হয়?

সেলফি আসক্তি আধুনিক আচরণগত  একটি সমস্যা। সেলফির প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক হঠাৎ করেই তৈরি হয়ে যায় না। এর পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি মানসিক স্তর।

প্রথমত, আত্মমূল্যবোধের অনিশ্চয়তা। যাদের নিজের সম্পর্কে সন্দেহ বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে, তারা বাইরের স্বীকৃতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে থাকে। একটি সুন্দর সেলফি এবং  তাতে সেটায় পাওয়া প্রশংসা সাময়িকভাবে সেই ঘাটতি ঢেকে দেয়।

দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি। বাস্তব জীবনে সব কিছু নিজের মনের মতো হয় না, কিন্তু সেলফিতে মানুষ আলো, কোণ, অভিব্যক্তি, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটি এক ধরনের কৃত্রিম ক্ষমতার অনুভূতি দেয়, যেখানে মানুষ নিজের সেরা সংস্করণটা তুলে ধরতে পারে।

তৃতীয়ত, তুলনার মনোভাব। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অন্যের সাজানো-গোছানো ছবি দেখে মানুষ অজান্তেই নিজেকে তুলনা করতে শুরু করে। এই তুলনা থেকে জন্ম নেয় আরও ভালো দেখানোর তাগিদ, যা সেলফির সংখ্যা বাড়াতে থাকে।

মনোবিজ্ঞানে জানা যায়, প্রশংসা বা স্বীকৃতি পেলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের এক ধরনের রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ ও তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে। সেলফিতে লাইক পাওয়া ঠিক তেমনই এক ক্ষুদ্র পুরস্কারের মতো কাজ করে। কিন্তু এই আনন্দটা স্থায়ী নয়। ফলে আবার নতুন ছবি, নতুন পোস্ট, নতুন প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। এই চক্র চলতে চলতে একসময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, আর অভ্যাস থেকেই তৈরি হয় আসক্তি। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষণীয়, মানুষ আসলে ক্যামেরার প্রতি আসক্ত নয়, আসক্ত হয়ে পড়ে প্রতিক্রিয়ার প্রতি। ক্যামেরা শুধু সেই প্রতিক্রিয়া পাওয়ার একটি পথ মাত্র।

অনেকেই মনে করে থাকেন, সেলফি মানেই হয়তো  আত্মকেন্দ্রিকতা। তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। সেলফি অনেকের জন্য আত্মপ্রকাশের ভাষা। অনেকের ক্ষেত্রেই এটি  অনুভূতি, সময়, পরিবর্তন বা অর্জনগুলোকে প্রকাশ করার এক ধরনের মাধ্যম। কিন্তু যখন এই আত্মপ্রকাশ অন্যের স্বীকৃতি ছাড়া অর্থহীন মনে হতে শুরু করে, তখনই সৃষ্টি হয় সমস্যার।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুস্থ আত্মপ্রকাশ আর অসুস্থ আত্মকেন্দ্রিকতার পার্থক্য বোঝা যায় নির্ভরতার মাত্রায়। যদি কারও মন ভালো থাকা,মন্দ থাকা নির্ভর করে পোস্টের প্রতিক্রিয়ার ওপর, তবে সেটি মানসিক ভারসাম্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন?

কিশোর বয়স মানেই নিজের আলাদা পরিচয় খোঁজার সময়। এই বয়সেটাই মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার একটি পথ। ফলে সামাজিক স্বীকৃতির প্রভাব এখানে তুলনামূলক বেশি। একটি নেতিবাচক মন্তব্য বা প্রত্যাশার চেয়ে কম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় হতাশা, হীনমন্যতা বা আত্মসংকোচ তৈরি করতে পারে। এছাড়া এই বয়সে মস্তিষ্কের যে অংশটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত, তা পুরোপুরি পরিপক্বও  হয় না। ফলে তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতি ঝোঁক বেশি থাকে, যা সেলফি-নির্ভর অভ্যাসকে আরও শক্ত করে তোলে।

অনেকে সময় চমৎকার ছবির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মানসিক চাপ। প্রতিটি পোস্টের আগে ভাবনা আসে- ছবিটি যথেষ্ট ভালো তো? মানুষ কী বলবে? আগের পোস্টের চেয়ে কম লাইক হলে কী হবে? এই প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে।

অনেকে বাস্তব জীবনের আনন্দ উপভোগ করার বদলে সেটিকে ক্যামেরাবন্দি করার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। ফলে মুহূর্তের স্বাভাবিক সুখ হারিয়ে যায়, থেকে যায় কেবল ডিজিটাল স্মৃতিটা।

আসক্তি আর স্বাভাবিক ব্যবহারের সীমারেখা: সেলফি তোলাই যে একটা সমস্যা, তা কিন্তু নয়। সমস্যা তখনই হয় যখন ছবি না তুললে অস্বস্তি তৈরি হয়। অন্যের প্রতিক্রিয়া মনের অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে অনলাইন উপস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিজের চেহারা বা জীবন নিয়ে অতিরিক্ত অসন্তোষ জন্ম নেয়। এই লক্ষণগুলো থাকলে সেটিকে আর নিছক শখের মধ্যে ফেলা যায় না, তা হয়ে উঠে একটি নেশা। 

সমাধানের পথ কোথায়?

সেলফি আসক্তি মোকাবেলার জন্য কেবল স্ক্রিন টাইম হ্রাসই নয়, বাস্তব জীবনের সাফল্য, আত্ম-মূল্যের  অনুভূতিও গড়ে তোলাটা জরুরি।

আবার মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, সমাধানের শুরুটা সচেতনতা দিয়ে করা যেতে পারে। নিজের আচরণকে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা করতে হয়- আমি কেন এই ছবি তুলছি? নিজের আনন্দের জন্য, নাকি অন্যের প্রতিক্রিয়ার জন্য?

বাস্তব সম্পর্ক, অফলাইন সময়, নিজের দক্ষতা ও অর্জনের ওপর মনোযোগ বাড়ালে আত্মমূল্যবোধ ধীরে ধীরে ভেতর থেকে তৈরি হয়। তখন বাইরের স্বীকৃতির প্রয়োজন কমে আসে।

সেলফি আসলে আধুনিক মানুষের আত্মঅন্বেষণের প্রতিচ্ছবি। এটি যেমন নিজেকে প্রকাশের সুযোগ দেয়, তেমনি অতিরিক্ত হলে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।যেদিন মানুষ ক্যামেরা ছাড়াও নিজের মূল্য অনুভব করতে শিখবে, সেদিন সেলফি থাকবে স্মৃতির অংশ, নেশার নয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ