অংকের ভয় আর নয়, সিঙ্গাপুরের ম্যাথ পাজল জেনে মস্তিষ্ককে করুন টার্বোচার্জ!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
শুধু সূত্র মুখস্থ নয়, শুধু হিসাব কষাও নয়, অঙ্ক যদি হয় চিন্তার খেলা, তবে সেই খেলায় সিঙ্গাপুর অনেক আগেই বিশ্বকে হার মানিয়েছে।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে শীর্ষে থাকলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি বিশেষ দর্শন আর তা হলো - Math Puzzles বা গণিতভিত্তিক ধাঁধার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান দক্ষতা গড়ে তোলা। কিন্তু জানেন কি তারা কীভাবে এই ধাঁধাগুলো শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ককে বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করে?
অনেক শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত মানেই কঠিন, রহস্যহীন ও ভয়ের বিষয়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের গণিত শিক্ষায় অঙ্ককে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ম্যাথ পাজলে সঠিক উত্তর বের করার অনুশীলনের পাশাপাশি, কীভাবে ভাবতে হবে, কোন পথে এগোতে হবে এবং কোথায় ভুল হতে পারে, এই পুরো প্রক্রিয়াটাই শেখানো হয়।
একটি ধাঁধা সমাধান করতে গিয়ে শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে হয়, অনুমান করতে হয়, বিকল্প পথ ভাবতে হয়, চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় বিশ্লেষণী ক্ষমতা। আর এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা কেবল অঙ্কেই নয়, জীবনের নানা সমস্যায় কাজে লাগে।
সিঙ্গাপুর ম্যাথ পাজলের মূল দর্শন:
সিঙ্গাপুরের ম্যাথ পাজল পদ্ধতির ভিত্তি হলো “কম কিন্তু গভীর” ধারণা। অর্থাৎ, অল্প সংখ্যক বিষয় পড়ানো হলেও সেগুলো এতটাই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয় যে শিক্ষার্থী একদম ধারণার শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পাজলগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীকে একাধিক ধাপে চিন্তা করতে হয়। উত্তর পাওয়াটাই এখানে মূল কথা নয়। বরং প্রশ্ন থাকে, এই সমাধান কি অন্যভাবে করা যায় কি না! এই যুক্তি কি সব ক্ষেত্রেই কাজ করবে কি না! যদি শর্ত বদলায়, তাহলে ফল কী হতে পারে! এই প্রশ্নগুলোই ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর মধ্যে যুক্তিভিত্তিক চিন্তার অভ্যাস তৈরি করে।
সমস্যা সমাধান দক্ষতা কীভাবে বাড়ে?
সমস্যা সমাধান দক্ষতা মানে কেবল বুদ্ধিমত্তা নয়, এটি শেখা যায় এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া। সিঙ্গাপুরের ম্যাথ পাজল সেই প্রক্রিয়াটিকেই সক্রিয় করে।
প্রথমেই সমস্যা বোঝতে হয়। ধাঁধার ভাষা অনেক সময় সরাসরি সমাধান দেখায় না। ফলে শিক্ষার্থীকে তথ্য আলাদা করতে হয়, প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক অংশ চিহ্নিত করতে হয়।
দ্বিতীয়ত আসে পরিকল্পনা! কোন সূত্র ব্যবহার করা হবে, আগে কোন অংশ সমাধান করা দরকার! এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাগত চিন্তা গড়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, পরীক্ষা ও সংশোধন পর্ব। যদি প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, শিক্ষার্থী আবার নতুন পথে চেষ্টা করে। এই ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে শেখার অংশ হিসেবে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।
সিঙ্গাপুরের গণিত সংস্কৃতিতে ভুল করাটা লজ্জার কিছু না। উল্টো, কোথায় যুক্তির বিচ্যুতি ঘটেছে, কোন ধারণাটি স্পষ্ট ছিল না- একটি ভুল সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং ভয়ের পরিবেশ দূর করে দেয় অনেকাংশেই। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুলের ভয় কমলে মস্তিষ্ক নতুন চিন্তা করতে বেশি স্বাধীনতা পায়। আর নতুন চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় সৃজনশীল সমস্যা সমাধান।
সিঙ্গাপুরের ম্যাথ পাজলগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনা। অনেক ধাঁধাই দৈনন্দিন জীবনের পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত থাকে। যেমন- সময় ব্যবস্থাপনা, অর্থ বণ্টন, দূরত্ব ও গতি, সম্ভাবনা ইত্যাদি। ফলে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে, অঙ্ক শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, এটি বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভাষা।এই সংযোগ শিক্ষার্থীর মধ্যে এক ধরনের মানসিক পরিপক্বতা আনে। তারা সমস্যা দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে সেটিকে বিশ্লেষণযোগ্য পরিস্থিতি হিসেবে দেখতে শেখে।
গবেষণালব্ধ মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, ধাঁধা সমাধান মস্তিষ্কের একাধিক অংশকে একসঙ্গে সক্রিয় করে। যুক্তি, স্মৃতি, মনোযোগ ও কল্পনা সবকিছু একসাথে কাজ করে। সিঙ্গাপুরের ম্যাথ পাজল এই সমন্বিত কার্যক্রমকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শক্তিশালী করে। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু অঙ্কের দক্ষতা নয়, ধৈর্য, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
আজকাল অনেক দেশেই তাদের গণিত শিক্ষায় সিঙ্গাপুর মডেল থেকে ধারণা নিচ্ছে। কারণ এই পদ্ধতির ফলাফল শুধু পরীক্ষার স্কোরে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠে যুক্তিবাদী, বিশ্লেষণী ও আত্মনির্ভরশীল চিন্তক। এই দক্ষতাগুলো আধুনিক বিশ্বের চাকরি, গবেষণা, প্রযুক্তি বা দৈনন্দিন জীবন সব ক্ষেত্রেই অনেক বেশি প্রয়োজনীয়।
অঙ্ক মানে কেবল সংখ্যা নয়,অঙ্ক মূলত ভাবনার শৃঙ্খলা। যখন শিক্ষার্থী একটি ধাঁধার মুখোমুখি হয়, তখন সে শুধু উত্তর খোঁজে না, সে শেখে কীভাবে সমস্যা ভাঙতে হয়, কীভাবে ধাপে ধাপে সমাধানের পথে এগোতে হয়। এই অভ্যাসই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ আমাদের জীবনটা নিজেই এক বিশাল ধাঁধা
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।