পছন্দের গাছটি বাঁচাতে সতর্ক হন এখনই, শীতকালীন এফিড নিয়ন্ত্রণের সমাধান!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
শীত মানেই প্রকৃতির একটু স্বস্তির সময়। ফসলের মাঠে সবুজের বিস্তার, বাগানে নতুন কুঁড়ির আনাগোনা। কিন্তু এই শান্ত দৃশ্যের আড়ালেই সক্রিয় থাকে এক ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়ংকর শত্রু, নাম তার এফিড পোকা। আকারে ছোট, প্রায় চোখে না পড়ার মতো হলেও শীতকাল এলেই এই পোকা কৃষক ও উদ্যানপ্রেমীদের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। কারণ শীতের পরিবেশ এফিডের বংশবিস্তার ও আক্রমণের জন্য অস্বাভাবিকভাবে অনুকূল। এফিডের শীতকালীন আক্রমণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি একটি নিয়মিত ও বিস্তৃত কৃষি সমস্যা, যা ফসলের উৎপাদন, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির জীববৈচিত্র্যকেও প্রভাবিত করে চলেছে ।
এফিড কী?
এফিড হল রস-চোষক ক্ষুদ্র এক প্রকার পোকা। এটি উদ্ভিদের উকুন, গ্রীনফ্লাইস, ব্ল্যাকফ্লাইস, বা হোয়াইটফ্লাইজ হিসেবেও পরিচিত। গাছের কচি ডাল, পাতা ও কুঁড়ি থেকে সরাসরি রস শোষণ করেই এরা বেঁচে থাকে। শীতকালে গাছের বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর হলেও কচি পাতা ও নতুন ডাল তৈরি হয়, যা এফিডের জন্য আদর্শ খাদ্য। শীতের মাঝারি তাপমাত্রাই এফিডের জন্য সুবিধাজনম। অতিরিক্ত গরমে যেমন এদের দেহে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, তেমনি আবার অতিরিক্ত ঠান্ডায় এদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হয়। শীতকালের নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ এফিডের বেঁচে থাকা ও দ্রুত বংশবিস্তারে সহায়ক হয়।
প্রাণিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই সফল একদল প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষতি সাধনকারী হিসেবে বিশ্বজুড়ে কৃষক ও বাগানপ্রেমীদের কাছে এরা একটা আতঙ্ক। পৃথিবীজুড়ে এসব পোকা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলেই এদেরকে সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়।
কেন শীতে বংশবিস্তার দ্রুত হয়?
এফিডের প্রজনন কৌশল এদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। শীতকালে অনেক এফিড স্ত্রী পোকা পুরুষ ছাড়াই বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি ছোট কলোনি বিশাল আকার ধারণ করে ফেলে। একটি গাছে শুরুতে হয়তো কয়েকটি এফিড চোখে পড়ে না। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো পাতার নিচের অংশ কালো বা সবুজ স্তরে ঢেকে যেতে পারে। এই দ্রুত বিস্তারের পেছনে শীতের স্থিতিশীল আবহাওয়া প্রভাব রাখে।
যেসব গাছ ও ফসল বেশি ঝুঁকিতে থাকে:
শীতকালীন সবজি, ডালজাতীয় ফসল, সরিষা, শাকসবজি, ফুলগাছ এবং ফলের চারা ইত্যাদি সবই এফিডের আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যেসব গাছের কচি পাতা নরম ও রসালো হয়, সেগুলো এফিডের পছন্দের তালিকাতে প্রথমে। শীতকালীন ফুলের ক্ষেত্রে এফিড শুধু গাছের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় না, বরং ফুলের সৌন্দর্যও নষ্ট করে। কুঁড়ি বিকৃত হয়ে যায়, পাতা কুঁকড়ে যায় এবং অনেক সময় পুরো গাছই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এফিডের আক্রমণে গাছের ভেতরে কী ঘটে?
এফিড যখন গাছের রস শোষণ করে, তখন গাছের স্বাভাবিক পুষ্টি পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে পাতার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়, বৃদ্ধি থেমে যায় এবং নতুন ডাল বের হওয়া কমে যায়। এর পাশাপাশি এফিড এক ধরনের আঠালো তরল নিঃসরণ করে, যা পাতার ওপর জমে থাকে। এই আঠালো স্তরের ওপর পরে ছত্রাক জন্মাতে পারে, যা পাতার সালোকসংস্লেষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ এফিডের আক্রমণ শুধু সরাসরি ক্ষতিই করে না, পরোক্ষভাবে গাছের পুরো শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকেই দুর্বল করে তোলে।
এফিড বিভিন্ন উদ্ভিদ ভাইরাস বহন করতে পারে। আর এটি এফিডকে আরও বিপজ্জনক করে। একটি আক্রান্ত গাছ থেকে রস শোষণ করে অন্য গাছে গেলে সেই ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। শীতকালে যখন গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে এমনিতেও একটু কম থাকে, তখন এই ভাইরাস সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। উপসর্গ ধীরে ধীরে প্রকাশ পাওয়ায়, অনেক সময় গাছের ক্ষতি বুঝতেও দেরি হয়।
শীতকালীন আবহাওয়ার সঙ্গে এফিডের সম্পর্ক!
শীতে বাতাস তুলনামূলক শান্ত থাকে, বৃষ্টি কম হয়। এই আবহাওয়া এফিডের জন্য খুবই সুবিধাজনক। ভারী বৃষ্টি এফিডকে গাছ থেকে ঝরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু শীতে এমন প্রাকৃতিক বাধা কম থাকে। এছাড়া ঠান্ডায় অনেক উপকারী পোকা, যারা এফিড খেয়ে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সক্রিয়তাও কমে যায়। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে এফিড সহজেই আধিপত্য বিস্তার করে ফেলতে পারে ।
আগাম লক্ষণ চিনে নেওয়া কেন জরুরি?
এফিড আক্রমণের শুরুতেই কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমন- পাতার নিচে ছোট ছোট পোকা, পাতার কিনারা ভাঁজ হয়ে যাওয়া, কচি ডাল বাঁকিয়ে যাওয়া।অনেক সময় পিঁপড়ার আনাগোনাও এফিডের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, কারণ পিঁপড়া এফিডের নিঃসৃত আঠালো তরলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো অবহেলা করলে অল্প সময়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ:
এফিড নিয়ন্ত্রণে নানা ধরনের কীটনাশক রয়েছে।
শুধু রাসায়নিক ব্যবহারের ওপর নির্ভর করলে শীতকালীন এফিড সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ এফিড দ্রুত প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। তাই বাস্তবসম্মত কৌশল হলো সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত গাছ পর্যবেক্ষণ, এসবই এফিড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক শত্রুদের টিকে থাকার পরিবেশ বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদে উপকারী।
তাছাড়া -
⇨ রাসায়নিক কীটনাশকের পাশাপাশি উদ্ভিদের নির্যাস ও উদ্ভিদজাত বস্তুও পরিবেশ-বান্ধবভাবে এফিডের বিনাশ করতে পারে।
⇨ নিম ও লান্টানা উদ্ভিদজাত দ্রব্য দিয়ে গাছকে রক্ষা করা যায়।
⇨ বাড়ির উঠোনের বাগানে সাধারণ আক্রমণের ক্ষেত্রে ওয়াটারজেট দিয়ে ভালোভাবে কয়েকদিন পানিপ্রবাহ দিলে গোলাপ ও অন্যান্য গাছকে এসব পোকা থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়।
⇨ কীটনাশক সাবানের দ্রবণ দিয়ে বাসাবাড়িতে এফিড অথবা অন্যান্য নরম দেহবিশিষ্ট কীটের প্রতিকার করা যায়। তবে বেশি মাত্রায় বা ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার উপরের অবস্থায় ব্যবহার করলে সাবানের স্প্রে গাছের নানা রকম ক্ষতি করতে পারে।
⇨ কয়েক ধরনের ছত্রাক প্রজাতি, যেমন লেকানিচিলিয়ুম লেকানি বা বিউভেরিয়া বাসসিয়ানা বা পিচিলোমিচেস ফুমোসোরোসেউস, জৈবিক কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে এফিডপোকা ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।
এফিডের শীতকালীন আক্রমণ শুধু ব্যক্তিগত বাগানের সমস্যাই না। এটি সরাসরি ফসল উৎপাদন কমিয়ে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিরুপ প্রভাব ফেলে। উৎপাদন খরচ বাড়ে, কৃষকের লাভ কমে, আর বাজারে সবজির দাম অস্থির হয়ে ওঠে। এই কারণেই এফিডকে ছোট পোকা ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি কৃষি ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
শীতের নরম আলো ও ঠান্ডা বাতাসের আড়ালে এফিড পোকার চুপচাপ আক্রমণ,পছন্দের বাগানের বা গাছের গভীর ক্ষতি করে চলেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য আসলেই খুব সূক্ষ্ম। সামান্য অসতর্কতা বা একটু দেরি মানেই পুরো ফসল মৌসুমকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়া হতে পারে
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।