শীতে হঠাৎ নাক থেকে রক্ত! চিন্তার কারণ নাকি সাধারণ সমস্যা?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
আমাদের শরীরের অন্যতম একটি পূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে নাক। নাকের প্রধান কাজই হলো শ্বাস গ্রহণ-ত্যাগ করা। শ্বাস প্রশ্বাস সঠিকভাবে চলছে মানেই আপনি জীবিত আছেন। কিন্তু শীত এলেই অনেকের পরিচিত এক অভিজ্ঞতা সামনে আসে, হঠাৎ নাক ঝাড়তে গিয়ে বা সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যায় নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। কারও ক্ষেত্রে কয়েক ফোঁটা, কারও ক্ষেত্রে আবার তুলনামূলক বেশি। বেশির ভাগ মানুষই এটিকে হালকাভাবে নিয়ে থাকেন, ভাবেন শীতের জন্যই হয়েছে, তেমন জটিল হয়তো কিছুই না। কিন্তু শীতে নাক দিয়ে রক্ত পড়া কি সত্যিই সব সময় স্বাভাবিক? নাকি কখনো কখনো এটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার নীরব সংকেত?
এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। কারণ শীতকালীন নাক থেকে রক্ত পড়ার পেছনে যেমন আছে সাধারণ পরিবেশগত কারণ, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুত্ব দিয়ে দেখার মতো স্বাস্থ্যগত ইঙ্গিতও হতে পারে।
নাক কেন রক্তপাতের জন্য সংবেদনশীল?
মানব নাকের ভেতরের অংশ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। নাসারন্ধ্রের ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট রক্তনালি থাকে, যেগুলো বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র করতে সাহায্য করে। এই রক্তনালিগুলো খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় সামান্য আঘাত, শুষ্কতা বা চাপেও সহজেই ফেটে যেতে পারে। বিশেষ করে নাকের সামনের অংশে থাকা রক্তনালিগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি নাজুক হয়ে থাকে।আর শীতকালে এই অংশই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শীতকালে কেন নাক দিয়ে রক্ত পড়ার প্রবণতা বাড়ে?
শীতের বাতাস সাধারণত শুষ্ক হয়। এই শুষ্ক বাতাস নাকের ভেতরের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে নাসার ভেতরের ত্বক শুকিয়ে ফেটে যেতে পারে। সেই ফাটল দিয়েই রক্তপাত শুরু হয়। এছাড়া শীতে ঘরের ভেতরে হিটার বা অতিরিক্ত উষ্ণ পরিবেশ থাকলে বাতাস আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় এমন পরিবেশে থাকলে নাকের ভেতরের পর্দা আরও দুর্বল হয়ে যায়। অনেকেই শীতে সর্দি-কাশিতে ভোগেন। বারবার নাক ঝাড়া, জোরে শ্বাস নেওয়া বা নাক চুলকানোর অভ্যাসও রক্তনালিতে চাপ সৃষ্টি করে, যা রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
সাধারণ ও অস্বাভাবিক রক্তপাতের পার্থক্য:
শীতে নাক দিয়ে রক্ত পড়া সব সময় উদ্বেগের কারণ নয়। কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলে এটিকে সাধারণ হিসেবে ধরা যায়।যেমন -
⇨ রক্তপাত অল্প পরিমাণে হয়।
⇨ কয়েক মিনিটের মধ্যে নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যায়।
⇨ ব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ থাকে না।
⇨ নির্দিষ্ট কোনো আঘাত বা নাক ঝাড়ার পর ঘটে।
কিন্তু কিছু লক্ষণ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সেগুলো হলো -
⇨ বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়া।
⇨ অল্প চাপেও রক্তপাত শুরু হওয়া।
⇨ দীর্ঘ সময় ধরে রক্ত বন্ধ না হওয়া।
⇨ একসঙ্গে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট।
⇨ নাক ছাড়াও শরীরের অন্য জায়গা থেকে রক্তপাত।
এই লক্ষণগুলো ইঙ্গিত দিতে পারে যে সমস্যাটি কেবল শুষ্কতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
রক্তচাপ ও নাক থেকে রক্তপাতের সম্পর্ক:
শীতে অনেকেরই রক্তচাপ বেড়ে যায়। ঠান্ডায় রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়, ফলে রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নাকের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো সহজেই ফেটে যেতে পারে। অনেক সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়াই হতে পারে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রথম লক্ষণ। বিশেষ করে যাদের আগে থেকে রক্তচাপের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে শীতকালীন নাক থেকে রক্তপাতকে অবহেলা করা উচিত নয়।
রক্ত পাতলা হওয়ার সমস্যাও হতে পারে কারণ!
যারা নিয়মিত এমন ওষুধ গ্রহণ করেন, যা রক্তকে পাতলা রাখে, তাদের ক্ষেত্রে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। শীতকালে নাকের শুষ্কতার সঙ্গে এই বিষয়টি যুক্ত হলে রক্তপাত সহজেই শুরু হতে পারে। এছাড়া শরীরে কিছু ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকলেও রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমে যেতে পারে, যা রক্তপাতের প্রবণতা বাড়ায়।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে আলাদা সতর্কতা জরুরি!
শিশুদের নাকের ভেতরের পর্দা অত্যন্ত নরম। শীতকালে তারা অজান্তেই নাক খোঁটে বা জোরে নাক ঝাড়ে, ফলে রক্তপাত হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি গুরুতর নয়, তবে বারবার হলে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু বেশি গুরুত্বের। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়। এর সঙ্গে যদি উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যুক্ত থাকে, তাহলে নাক থেকে রক্ত পড়া বড় কোনো জটিলতার ইঙ্গিতও হতে পারে।
শীতে নাক দিয়ে রক্ত পড়লে কী করা উচিত?
রক্তপাত শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে কিছু সাধারণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সোজা হয়ে বসে সামান্য সামনে ঝুঁকতে হয়, যাতে রক্ত গলার ভেতরে না যায়। নাকের নরম অংশে হালকা চাপ দিলে অনেক সময় রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। তবে নাক পেছনের দিকে কাত করা উচিত নয়। এতে রক্ত গিলে ফেলার ঝুঁকি থাকে, যা পরে বমি বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
প্রতিরোধে দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো -
শীতে নাকের ভেতরের আর্দ্রতা বজায় রাখা সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করা, ঘরের বাতাস খুব বেশি শুষ্ক না রাখা এবং নাক ঝাড়ার সময় অতিরিক্ত জোর না দেওয়ার মতো ছোট অভ্যাসগুলো বড় উপকার করতে পারে। নাকের ভেতর বারবার খোঁচাখুঁচি করা বা শুষ্ক অনুভব হলেই ঘষাঘষি করা ক্ষতিকর। এতে রক্তনালি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কখন সতর্কতার সংকেত?
যদি নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথাব্যথা বা দৃষ্টিতে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি আর সাধারণ বলে ধরে নেওয়া যায় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এটি শরীরের ভেতরের কোনো ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত হতে পারে, যা শীতের কারণে প্রকাশ পেয়েছে মাত্র।
শীতে খাদ্যাভ্যাস ও চলাফেরার ধরন বদলে যায়। কম পানি পান, বেশি চা-কফি গ্রহণ, কম ঘাম, এসব কারণে শরীরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যায়। এর প্রভাব নাকের ভেতরেও পড়ে। অনেকেই শীতে ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় কাটান, যেখানে বাতাস চলাচল কম থাকে। এই পরিবেশও নাকের শুষ্কতা বাড়াতে পারে।
শীতে নাক দিয়ে রক্ত পড়া অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক পরিবেশগত পরিবর্তনের ফল। শুষ্ক বাতাস, ঠান্ডা ও দৈনন্দিন অভ্যাস, এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবেই বেশির ভাগ মানুষের এমন অভিজ্ঞতা হয়। তবে এটিকে সব সময় হালকাভাবে নেওয়াও ঠিক নয়।
কারণ শরীর অনেক সময় ছোট সংকেতের মাধ্যমেই বড় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।