সৌরজগতে এলো নতুন অতিথি, মহাজাগতিক বস্তুর গল্প শুনুন!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
মহাকাশ নিয়ে মানুষের কৌতুহল সবসময়ই সীমা ছাড়িয়ে। আমরা গ্রহ দেখেছি, ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করেছি, উল্কাপিণ্ডের গতিপথ হিসাব করেছি। কিন্তু এক সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, আমরা যা কিছু দেখি, সবই সূর্যজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেই ধারণা বদলে যায় যখন প্রথমবারের মতো মানুষের যন্ত্র মহাকাশে এমন একটি বস্তুকে শনাক্ত করে, যা সূর্যের নয়, এসেছে অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশ থেকে। এই ঘটনাই পরিচিত হয়ে ওঠে প্রথম আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুর ট্র্যাকিং হিসেবে,মহাজাগতিক এক অতিথির গল্প।
মহাবিশ্বে কোটি কোটি নক্ষত্র, আর প্রতিটি নক্ষত্রের চারপাশে গড়ে উঠতে পারে নিজস্ব গ্রহমণ্ডল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই ধারণা করতেন, এসব গ্রহমণ্ডলের ভেতরে সংঘর্ষ, বিস্ফোরণ বা গঠনগত অস্থিরতায় অসংখ্য শিলাখণ্ড ও বরফাচ্ছন্ন বস্তু ছিটকে পড়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে। কিন্তু ধারণা আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। সেই প্রমাণ প্রথম হাতে আসে যখন একটি অচেনা বস্তুর গতিপথ সূর্যজগতের পরিচিত নিয়ম ভেঙে দেয়।
এই বস্তুটির গতি ছিল অস্বাভাবিক। এটি সূর্যের দিকে আসছিল এমন এক বক্র পথে, যা সাধারণ গ্রহাণু বা ধূমকেতুর মতো সূর্যের মহাকর্ষে বাঁধা নয়। হিসাব করে দেখা যায়, এটি সূর্যের চারপাশে ঘুরে আবার ফিরে যাবে না। বরং সূর্যের আকর্ষণকে ব্যবহার করে আরও দূরে ছুটে যাবে মহাশূন্যে। এই একটিমাত্র বৈশিষ্ট্যই বিজ্ঞানীদের সতর্ক করে তোলে। এটি আমাদের সৌরপরিবারের সদস্য নয়।
এরপর শুরু হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও ট্র্যাকিং। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে এর অবস্থান নথিবদ্ধ করতে থাকেন। কক্ষপথের সমীকরণে প্রতিটি নতুন ডেটা যোগ হয়। বস্তুটির আগমনপথ সূর্যজগতের বাইরে থেকে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। এটি কোনো গ্রহের চারপাশে জন্ম নেওয়া টুকরো নয়। বরং অন্য কোনো নক্ষত্রের সন্তান, যে লক্ষ-কোটি বছর ধরে মহাশূন্যে ভেসে বেড়িয়েছে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, একটি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু সৌরজগতের দিকে এগিয়ে এসেছে তীব্র গতিতে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন, এটি একটি ধূমকেতু। নাসা, নতুন বস্তুকে 3I/ATLAS নামে চিহ্নিত করেছে। একে অ্যাস্টেরয়েড টেরেস্ট্রিয়াল ইমপ্যাক্ট লাস্ট অ্যালার্ট সিস্টেম বা অ্যাটলাসের সংগৃহীত তথ্যের সাহায্যে প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল, যা নাসার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এই আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুর উপস্থিতি সম্পর্কে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৫ সালের জুলাই মাসে।
স্পেনের বার্সেলোনার ইনস্টিটিউট অব স্পেস জানিয়েছেন, 3I/ATLAS নামে পরিচিত এ বস্তুটি প্রায় আকারে ২৫ মাইল হতে পারে। নাসা জানিয়েছে, এই বস্তু প্রথম শনাক্ত করার পর থেকে অসংখ্য টেলিস্কোপ একে পর্যবেক্ষণ করছে। নাসার সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, পৃথিবীর তিনটি ভিন্ন অ্যাটলাস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ ও সান দিয়েগো কাউন্টির পালোমার অবজারভেটরি থেকে জানা যায়, প্রাপ্ত সকল তথ্য ও প্রমাণ বস্তুটির ধূমকেতু হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করেছে। এর উৎপত্তিস্থল ইন্টারস্টেলার স্পেস। মহাকাশের ধনু রাশি বা স্যাজিটেরিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জের দিক থেকে এটি ধেয়ে আসছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে এটি আমাদের থেকে প্রায় ৪২০ মিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থান করছে।
বস্তুটির গঠন নিয়েও উঠে আসে বেশ বিস্ময়কর তথ্য। এর উজ্জ্বলতার ওঠানামা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানান, এর আকৃতি আমাদের পরিচিত গোলাকার গ্রহাণুর মতো নয়। এটি দীর্ঘ বা অস্বাভাবিক আকৃতির হতে পারে,যা সূর্যজগতের বস্তুর মধ্যে বিরল। এই পার্থক্য ইঙ্গিত দেয়, ভিন্ন নক্ষত্রের চারপাশে বস্তু গঠনের প্রক্রিয়া আমাদের সৌরজগতের চেয়ে আলাদা হতে পারে।
আরও কৌতূহল জাগায় এর আচরণ। সূর্যের কাছাকাছি এলে অনেক ধূমকেতুর মতো এরও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, কিন্তু প্রত্যাশিত গ্যাস বা ধূলিকণার লেজ খুব স্পষ্ট ছিল না। ফলে প্রশ্ন জাগে, এটি কি ধূমকেতু, না কি একেবারে ভিন্ন ধরনের কোনো মহাজাগতিক বস্তু? এই অনিশ্চয়তাই বিজ্ঞানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়, কারণ প্রশ্ন যত বাড়ে, গবেষণার দিগন্ত তত প্রসারিত হতে থাকে! এই ট্র্যাকিং প্রক্রিয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও পরীক্ষা ছিল। পৃথিবীর ঘূর্ণন, আবহাওয়া, দিনের আলো সবই পর্যবেক্ষণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও অল্প সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করা হয়, কারণ এমন অতিথি খুব দ্রুত চলে যায়। একবার সূর্যজগত ছেড়ে বেরিয়ে গেলে, আর কখনো তাকে ধরা সম্ভব নয়।
প্রথম আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু শনাক্ত হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন ভবিষ্যৎ নিয়ে। যদি একটির সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে আরও অনেক থাকতে পারে।
এই ধরনের বস্তু আমাদের সামনে এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসে। এগুলো অন্য নক্ষত্রের আশপাশের উপাদান বহন করে আনে। অর্থাৎ, আমরা যদি এগুলোর বৈশিষ্ট্য ভালোভাবে বুঝতে পারি, তাহলে সরাসরি না গিয়েও অন্য গ্রহমণ্ডলের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবো। এটি একপ্রকার মহাজাগতিক নমুনা সংগ্রহ, যেখানে মহাশূন্য নিজেই
হল ডাকপিয়ন।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াও এই আবিষ্কারের একটি দার্শনিক দিক আছে। এটি আমাদের এই সত্যের মুখোমুখি করে যে, আমরা এক অসীম ও চঞ্চল মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম সদস্য। আমাদের সৌরজগৎ কোনো নির্জন দ্বীপের মতো আলাদা নয়। এটি এক বিশাল মহাজাগতিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, যেখানে মহাজাগতিক পদার্থগুলো এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে বিরামহীন যাতায়াত করে।
প্রথমবারের মতো আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু শনাক্ত হওয়া শুধু একটি আবিষ্কার নয়, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনও বটে। এতদিন সৌরজগতকে আমরা তুলনামূলকভাবে একটি বন্ধ সিস্টেম হিসেবে মনে করতাম। কিন্তু সৌরজগত আসলে এক ধরনের মহাজাগতিক সড়কের পাশে দাঁড়ানো একটি বাড়ির মতো।
মহাজাগতিক এই অতিথির আগমন ও প্রস্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মহাবিশ্ব কতটা খোলা ও সীমাহীন। প্রথম আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুকে শনাক্ত ও ট্র্যাক করা মানব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা ভবিষ্যৎ জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।