মেক্সিকোর রহস্যময় জলজ প্রাণী অ্যাক্সোলটল!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় প্রায় প্রতিদিনই আমাদেরকে চমকে দিচ্ছে , তবে জীবজগতে কিছু প্রাণী আছে যাদের দিকে তাকালে মনে হয়, বিজ্ঞান হয়তো এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তরই খুঁজে পায়নি। এমনই এক ব্যতিক্রমী প্রাণী হলো অ্যাক্সোলটল। এটি দেখতে বেশ শান্ত। এর মুখভঙ্গি প্রায় শিশুসুলভ। এর বাহিরে ছড়ানো পালকের মতো গিলস, আর নরম দেহ মিলিয়ে এটি যেন কল্পকাহিনির কোনো এক চরিত্র। কিন্তু এর আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে তার শরীরের ভেতরে। অ্যাক্সোলটল এমন এক প্রাণী, যে নিজের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গই নতুন করে তৈরি করতে পারে। শুধু পা বা লেজ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর হৃৎপিণ্ডের অংশ, স্নায়ু, এমনকি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশও আবার গড়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুনর্গঠন একবার নয়, একই অঙ্গ বারবার নষ্ট হলেও তা পুনরায় তৈরি করার ক্ষমতা রাখে এই প্রাণী।
'অ্যাক্সোলটল' শব্দটি প্রাচীন নাহুয়াতল ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ 'জলের কুকুর' বা 'জলের দানব'। এটি মূলত অ্যাজটেক দেবতা 'জোলোটল'-এর (Xolotl) নামানুসারে রাখা হয়েছে, যিনি আগুন ও পুনর্জন্মের দেবতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে পপ কালচার, গেম এবং মিডিয়াতেও এই প্রাণীটি বেশ জনপ্রিয়।
অ্যাক্সোলটল (Ambystoma mexicanum) মূলত এক প্রকার বিরল প্রজাতির স্যালামান্ডার, যারা তাদের পেডোমরফিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। এরা আকারে সাধারণত ৯ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। এদের মাথার দুই পাশে তিন জোড়া রক্তিম বহিরাগত ফুলকা থাকে যা সরাসরি পানি থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এদের চোখ ঢাকনাবিহীন এবং মুখমণ্ডল চওড়া, যা দেখতে অনেকটা হাস্যোজ্জ্বল মনে হয়।
সাধারণত উভয়চর প্রাণী বয়সের সাথে সাথে শারীরিক রূপান্তরের মাধ্যমে জল থেকে ডাঙ্গায় উঠে আসলেও, অ্যাক্সোলটলরা আজীবন জলজ লার্ভা দশার বৈশিষ্ট্য (যেমন: মাথার বাইরের ফুলকা) ধরে রেখেই পূর্ণবয়স্ক হয়। এই বৈশিষ্ট্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘নিওটেনি’। অর্থাৎ যৌনভাবে পূর্ণবয়স্ক হলেও এটি তার শৈশবকালীন গঠন বজায় রাখে। এই বিশেষ শারীরিক অবস্থা অ্যাক্সোলটলের পুনর্জন্মক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত বলে মনে করেন গবেষকেরা।
অ্যাক্সোলটলের অঙ্গ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াটি সাধারণ কোনো ক্ষত সেরে ওঠার মতো নয়। মানুষের ক্ষেত্রে কোনো অঙ্গ কেটে গেলে সেখানে দাগ পড়ে, কোষগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু অ্যাক্সোলটলের শরীরে ক্ষত তৈরি হলে সেখানে দাগ তৈরি হয় না। বরং ক্ষতস্থানে এক ধরনের কোষীয় কর্মকাণ্ড শুরু হয়। ক্ষতপ্রাপ্ত জায়গার কোষগুলো আবার অপরিণত অবস্থায় ফিরে যায় এবং সেখান থেকে নতুন টিস্যু, নতুন পেশি, নতুন হাড় ও নতুন স্নায়ু গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় পুরোনো নকশা ঠিক রেখে, আকার, গঠন ও কার্যকারিতায় প্রায় নিখুঁতভাবে অঙ্গটি আগের মতোই তৈরি হয়।এই পুনর্গঠন শুধু বাহ্যিক অঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাক্সোলটলের হৃদ্যন্ত্রে আঘাত লাগলে বা কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সেটিও নিজেকে মেরামত করতে পারে। এমনকি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ক্ষতি হলেও স্নায়ু কোষ নতুন করে তৈরি হয়। মানুষের ক্ষেত্রে যেখানে স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা প্রায় স্থায়ী ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়, সেখানে অ্যাক্সোলটল সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছে বহু আগেই। এই কারণেই আধুনিক জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় অ্যাক্সোলটল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মডেল প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এই অসাধারণ ক্ষমতার মাঝেও একটি বাস্তব সত্য রয়েছে, তা হলো অ্যাক্সোলটল অমর নয়। অনেকের মনে ভুল ধারণা আছে যে, যেহেতু এটি নিজের অঙ্গ পুনর্গঠন করতে পারে, তাই এটি হয়তো সারাজীবন বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়না। অ্যাক্সোলটলেরও একটি নির্দিষ্ট জীবনকাল আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর দুর্বল হয়, রোগে আক্রান্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তারও মৃত্যু ঘটে। পুনর্গঠন ক্ষমতা তাকে আঘাত বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, কিন্তু বার্ধক্য বা প্রাকৃতিক মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না কোনোভাবেই। প্রাকৃতিক পরিবেশে অ্যাক্সোলটলের জীবনযাপনও বেশ সীমিত এলাকায় আবদ্ধ। এটি মূলত স্বাদুপানির জলাশয়ে বাস করে। পানির তলদেশে ধীরে চলাফেরা, ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী খাওয়া, আর অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশে জীবন কাটানোই তার দৈনন্দিন রুটিন।
অ্যাক্সোলটলের পুনর্গঠন ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা শুধু বিস্মিতই নন, একই সঙ্গে বেশ আশাবাদীও। কারণ, এই প্রাণীর শরীর কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে আবার নতুন করে গড়ে তোলে, সেই রহস্য যদি ভালোভাবে বোঝা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে মানব চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটতে পারে। স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, হার্ট অ্যাটাকের পর হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি, কিংবা মস্তিষ্কের আঘাত, এমন বহু জটিল সমস্যার সমাধানে অ্যাক্সোলটলের কোষীয় আচরণ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। যদিও মানুষের শরীর ও অ্যাক্সোলটলের শরীর এক নয়, তবুও প্রকৃতি যে পথে সমাধান তৈরি করেছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে, এই প্রাণীগুলো মেক্সিকোর উচ্চভূমির জোকিমিলকো (Xochimilco) এবং চালকো (Chalco) হ্রদে বাস করত। তবে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক যুগে জলপথ নিষ্কাশন এবং আধুনিক মেক্সিকো সিটির নগরায়নের ফলে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।পরিবেশ দূষণ, জলাশয় সংকোচন এবং মানুষের কার্যকলাপের কারণে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অ্যাক্সোলটলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে একদিকে এটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও, অন্যদিকে প্রকৃতিতে এটি এখন এক ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকা প্রাণী।
এই প্রাণীর আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, এটি একই অঙ্গ বারবার পুনর্গঠন করলেও তার ক্ষমতা কমে যায় না। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রেই পুনর্জন্ম সীমিত।কয়েকবারের বেশি হলে গঠন দুর্বল হতে শুরু করে। কিন্তু অ্যাক্সোলটলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একাধিকবার অঙ্গ কেটে গেলেও প্রতিবারই প্রায় সমান দক্ষতায় তা ফিরে আসে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এর কোষগুলোতে এমন কোনো স্মৃতি বা নকশা সংরক্ষিত থাকে, যা প্রতিবার নতুন করে গঠন তৈরি করতে সাহায্য করে।
অ্যাক্সোলটলের জীবনচক্র আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, প্রকৃতির শক্তি শুধু টিকে থাকার মধ্যেই নয়, বরং নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার মধ্যেও লুকিয়ে আছে। এই প্রাণী কোনো আঘাতকে চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মেনে নেয় না, বরং সেই ক্ষত থেকেই নতুন সূচনা তৈরি করে। যদিও শেষ পর্যন্ত তার জীবনও শেষ হয়, তবুও তার প্রতিটি পুনর্গঠন যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে একটি নীরব বার্তা।
আজকের পৃথিবীতে, যেখানে মানবসভ্যতা রোগ, দুর্ঘটনা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং নানা সংকটে জর্জরিত, সেখানে অ্যাক্সোলটল শুধু একটি অদ্ভুত প্রাণী নয়, বরং গবেষণা ও ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।