হীরাঝিল ও হারিয়ে যাওয়া সিরাজউদ্দৌলার প্রাসাদ!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
মুর্শিদাবাদ মানেই আজ অধিকাংশ মানুষের চোখে ভেসে ওঠে হাজারদুয়ারী এক প্রাসাদ। ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুবিশাল স্থাপত্য যেন সময়কে থামিয়ে রেখেছে নবাবি আমলের গৌরবময় অতীতের সামনে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী সেখানে ভিড় করেন। কেউ ইতিহাস জানতে, কেউ স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখতে, কেউবা শুধু ছবি তুলতে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই একটি মৌন প্রশ্ন প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা কোথায়? বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের নিজের প্রাসাদই বা কোথায়?
অনেকের ধারণায়, হাজারদুয়ারীই নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাসভবন। ইতিহাস কিন্তু সবার সেই ধারণাকে সরাসরি অস্বীকার করে। কারণ হাজারদুয়ারী প্রাসাদ নির্মিত হয় ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে, নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর প্রায় আট দশক পরে। অর্থাৎ যে প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নবাব সিরাজকে কল্পনা করি, সেখানে তিনি কোনোদিন পা ও রাখেননি। এই বাস্তবতা জানার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে তাঁর আসল প্রাসাদ কোথায় গেল? ইতিহাসের কোন অন্ধকারে তা হারিয়ে গেল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চোখ ফেরাতে হয় ভাগীরথীর অন্য পারে, নদীর পশ্চিম তীরে। হাজারদুয়ারী থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু মানসিক দূরত্ব যেন কয়েক শতাব্দীর। সেখানেই একদিন দাঁড়িয়ে ছিল মনসুরগঞ্জ প্যালেস, যা ইতিহাসে হীরাঝিল প্রাসাদ নামে পরিচিত। আজ সেই প্রাসাদ আর দৃশ্যমান নয়। নেই উঁচু মিনার, নেই অলংকৃত দেওয়াল, নেই রাজকীয় প্রবেশপথ। আছে শুধু জঙ্গল, বাঁশঝাড়, খোলা মাঠ আর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এক ইতিহাস।
হীরাঝিল প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল সেই সময়ে, যখন সিরাজউদ্দৌলা এখনও বাংলার নবাব হননি। তিনি তখন যুবরাজ। রাজনৈতিক দায়িত্বের চাপে নয়, বরং সৌন্দর্যবোধ ও রুচির টানেই এই প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, সিরাজউদ্দৌলার রুচিতে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রভাব বেশ স্পষ্ট ছিল। স্থাপত্য, জলাধার, প্রকৃতি সবকিছুকে মিলিয়ে একটি পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের জগৎ গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা যায় হীরাঝিল প্রাসাদে। এই প্রাসাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি বিশাল কৃত্রিম ঝিল। সেই ঝিলই হীরাঝিল নামে পরিচিত হয়। ধারণা করা হয়, ঝিলের নাম থেকেই প্রাসাদের নামকরণ। ঝিলের দু’পাশ পাথর দিয়ে বাঁধানো ছিল, যা তৎকালীন নির্মাণশৈলীর উচ্চমানের পরিচয় দেয়। গৌড়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে আনা নানা ধরনের পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এই প্রাসাদ নির্মাণে, যা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং শক্তি ও স্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত ছিল।
প্রাসাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল,নাম ‘এমতাজ মহল’। বর্তমানে সেই অংশের কিছু ধ্বংসাবশেষ পানির নিচে অবস্থান করছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। প্রাসাদের বিস্তৃতি সম্পর্কে নানা অনুমান রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এতটাই বিশাল ছিল হীরাঝিল যে একসঙ্গে তিনজন ইউরোপীয় রাজাও সেখানে অবস্থান করতে পারতেন। এই কথাটি হয়তো অতিরঞ্জিত শোনাতে পারে, কিন্তু এতে প্রাসাদের ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক গভীর বিভাজনরেখা টেনে দেয়। ১৭৫৭ সালের সেই যুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে। এরপর ক্ষমতায় আসেন মীরজাফর। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, নবাব হওয়ার পর প্রথমদিকে মীরজাফরও হীরাঝিল প্রাসাদেই অবস্থান করতেন। কিন্তু পরে তিনি ভাগীরথীর পূর্ব তীরে নবাব আলীবর্দি খাঁর পুরনো প্রাসাদে চলে যান। এই স্থানান্তর শুধু বসবাসের পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্র সরে যাওয়ার ইঙ্গিত।
সিরাজউদ্দৌলার বিপুল ধনরত্নের পরিণতিও ছিল করুণ। বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতিতে সেই সম্পদ ছড়িয়ে পড়ে নানা হাতে, ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যায় তার সঠিক হিসাব। হীরাঝিল প্রাসাদও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে। সময়, অবহেলা আর প্রকৃতির আঘাতে সেই প্রাসাদ একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
তবে ইতিহাস পুরোপুরি মুছে যায়নি। প্রায় সাত বছর আগের একটি অনুসন্ধান নতুন করে আলো ফেলে দেয় হীরাঝিলের ওপর। পুরনো মানচিত্র, ইতিহাসের বই আর স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে চলে আসা স্মৃতির সূত্র ধরে নির্দিষ্ট করা হয় প্রাসাদের আসল অবস্থান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চোখে পড়ার মতো কোনো রাজপ্রাসাদ নেই, কিন্তু মাটির স্তরে স্তরে চাপা পড়ে আছে ইট, পাথর, ভাঙা দেওয়ালের চিহ্ন। নিঃশব্দে তারা বলে চলে এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের কথা। এই অনুসন্ধানের পরপরই সামনে আসে আরেকটি মানবিক গল্প। এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নীরবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার কবর জিয়ারত করে আসছেন। কোনো প্রচার নেই, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, শুধু গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর জীবনকথা শুনে মনে হয়, যেন ইতিহাসের পাতার লুৎফুন্নিসা আজকের দিনে নতুন রূপে ফিরে এসেছেন। এই অনুভূতিই তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘আজকের লুৎফুন্নিসা’ নামে পরিচিত করে তোলে ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে। এই ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধই ধীরে ধীরে রূপ নেয় বৃহত্তর আন্দোলনে। হীরাঝিল প্রাসাদকে মানুষের সামনে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন থেকে শুরু হয় সংগঠিত প্রচেষ্টা। বর্তমান জমির মালিকদের খোঁজ করা হয়, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নেওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এই উদ্যোগ আর ব্যক্তিগত থাকে না, এটি হয়ে ওঠে গণআন্দোলন। গঠিত হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্ট।
এই আন্দোলনের ফলে হীরাঝিল আবার আলোচনায় আসে। ইতিহাসপ্রেমীসহ গবেষক, সাধারণ মানুষ সবাই নতুন করে জানতে শুরু করেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের এই হারিয়ে যাওয়া প্রাসাদের কথা। হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন সেই এলাকায়, যেখানে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল রাজপ্রাসাদ। সেখানে পলাশীর যুদ্ধের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগে সমাজের নানা স্তরের মানুষ অংশ নেন। এমনকি মীরজাফরের বর্তমান বংশধর হিসেবে যিনি পরিচিত, ‘ছোট নবাব’। তার উপস্থিতিও ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে এক নতুন মাত্রা দেয়। এই আন্দোলনের প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বাংলাদেশেও। খুলনায় বসবাসকারী নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধরদের সন্ধান মেলে। দেশ–বিদেশের মানুষ এই উদ্যোগে যুক্ত হতে থাকেন। শুরু হয় স্বাক্ষর সংগ্রহ, বিভিন্ন দপ্তরে পিটিশন জমা পড়ে। হীরাঝিল প্রাসাদের সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির দাবিতে জনস্বার্থ মামলা পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি।
এই সব প্রচেষ্টার মাঝেও কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত, সরকারি স্তরে হীরাঝিল প্রাসাদ কতটা গুরুত্ব পাবে?
ইতিহাসবিদদের মতে, হীরাঝিল একটি প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং এটি বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতার শেষ অধ্যায়ের নীরব দলিল। এর সংরক্ষণ মানে শুধু ইট-পাথর রক্ষা করা নয়, বরং একটি জাতির স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করা। এই দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবেই প্রতি বছর পালিত হয় হীরাঝিল উৎসব।
ইতিহাসচর্চা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা, এই উৎসবটি নতুন প্রজন্মের কাছে সিরাজউদ্দৌলার নাম ও অবদান তুলে ধরার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। খুব শিগগিরই আয়োজিত হতে চলেছে হীরাঝিল উৎসব ২০২৬। আয়োজকদের আশা, এই উৎসব শুধু স্মরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি হীরাঝিল সংরক্ষণের দাবিকে আরও জোরালো করবে।
মুর্শিদাবাদবাসীদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে হীরাঝিল প্রাসাদই হয়ে উঠতে পারে জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। হাজারদুয়ারীর পাশাপাশি যদি হীরাঝিলও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়, তাহলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আরও পূর্ণতা পাবে। ভাগীরথীর দুই তীর জুড়ে তখন দাঁড়িয়ে থাকবে বাংলার উত্থান-পতনের দুটি ভিন্ন অধ্যায়।হাজারদুয়ারী আমাদের মনে করিয়ে দেয় নবাবি শাসনের শেষ পর্বের আড়ম্বরকে। আর হীরাঝিল নীরবে বলে যায় হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার গল্প। এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়। যদি আমরা সেই দায় স্বীকার করে নেই, তবে হয়তো একদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হীরাঝিল আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।