আবেগের লাগাম হাতে নিতে শিখুন, নিজের জীবনের ড্রাইভার হোন!

আবেগের লাগাম হাতে নিতে শিখুন, নিজের জীবনের ড্রাইভার হোন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আবেগ মানুষের জীবনে কোনো দুর্বলতা নয় বরং এটি আমাদের সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা ও টিকে থাকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক শক্তিশালী মানসিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে একটি সমস্যা, দ্বন্দ্ব ও মানসিক অস্থিরতার প্রধান কারণ। তবে আবেগ দমন করা নয় বরং নিয়ন্ত্রণই সুস্থ মানসিক জীবনের মূল চাবিকাঠি। এই আবেগ নিয়ন্ত্রণ কোনো জন্মগত অলৌকিক ক্ষমতা নয়। এটি একটি শেখা যায় এমন মানসিক দক্ষতা, যার পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ, নিউরোকেমিক্যাল পরিবর্তন এবং সচেতন আচরণগত কৌশল।

আজকে আমরা আলোচনা করবো- আবেগ কীভাবে তৈরি হয়, কেন নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং কোন পদ্ধতিগুলো আমাদের আবেগকে স্বাস্থ্যকর পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।

আবেগ কি?

মানবজীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন অনুভূতির খেলা। আমরা কখনো আনন্দে মেতে উঠি, কখনো উত্তেজনায় শিহরিত হই, আবার কখনো বিষণ্নতা বা ক্ষোভে ভেঙে পড়ি। এই যে ভালো লাগা, মন্দ লাগা বা বিদ্বেষ প্রকাশের প্রক্রিয়া,এটিই মূলত আবেগ।

আবেগ কীভাবে তৈরি হয়?

মানুষের আবেগের সূচনা হয় মস্তিষ্কের গভীর অংশে। কোনো ঘটনা, কথা, স্মৃতি বা পরিস্থিতি আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছালে প্রথমেই সক্রিয় হয় অ্যামিগডালা,যা  মস্তিষ্কের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটির কাজ হলো  বিপদ, ভয়, রাগ কিংবা আনন্দের মতো তীব্র আবেগ শনাক্ত করা। অ্যামিগডালা খুবই দ্রুত কাজ করে। আর তাই অনেক সময় আমরা ভাবার আগেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলি। এখানেই শেষ নয়। একই তথ্য পরে পৌঁছে যায় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে,যা মস্তিষ্কের সেই অংশ যা যুক্তি, সিদ্ধান্ত, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল লড়াইটা হয় এই দুই অংশের মধ্যে। যে ব্যক্তি আবেগ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ, তার প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অপেক্ষাকৃত বেশি সক্রিয় থাকে।


কেন আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়?

আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারানোর পেছনে শুধুমাত্র ব্যক্তিত্ব দায়ী নয়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ।

☞ প্রথমত, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। যখন শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তখন প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে যুক্তিবোধ দুর্বল হয়, আবেগ প্রাধান্য পায়।

☞ দ্বিতীয়ত, ঘুমের অভাব। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমহীন অবস্থায় অ্যামিগডালা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উত্তেজিত থাকে।

☞ তৃতীয়ত, অতীতের মানসিক আঘাত বা ট্রমা। পুরনো অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে এমনভাবে গেঁথে যেতে পারে, যা সামান্য উদ্দীপনাতেও অতিরিক্ত আবেগ তৈরি করে।

☞ চতুর্থত, ডিজিটাল অতিরিক্ততা। অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম, নেগেটিভ খবর, সামাজিক তুলনা ইত্যাদি মিলিয়ে মস্তিষ্ক সব সময় উত্তেজিত অবস্থায় থাকে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।


আবেগ দমন আর আবেগ নিয়ন্ত্রণ কিন্তু এক নয়!

অনেকেই মনে করেন আবেগ নিয়ন্ত্রণ মানে অনুভূতি চেপে রাখা। বিজ্ঞান কিন্তু ঠিক উল্টো কথা বলে।আবেগ দমন করলে তা সাময়িকভাবে বাইরে প্রকাশ পায় না, কিন্তু ভেতরে চাপ তৈরি করে। এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, হতাশা এবং শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। অন্যদিকে আবেগ নিয়ন্ত্রণ হলো নিজের অনুভূতিকে চিনে নেওয়া, সেটিকে গ্রহণ করা এবং তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক প্রতিক্রিয়া বেছে নেওয়া। এটি একটি সক্রিয় ও সচেতন প্রক্রিয়া।


 আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল:

১. সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাস (Controlled Breathing), গভীর ও ধীর শ্বাস নেওয়া সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। এটি ভেগাস নার্ভ সক্রিয় করে, যা শরীরকে শান্ত মোডে নিয়ে আসে। কয়েক মিনিটের নিয়ন্ত্রিত শ্বাসই হৃদস্পন্দন কমাতে এবং আবেগের তীব্রতা হ্রাস করতে পারে।


২. আবেগের নামকরণ (Affect Labeling)! বিজ্ঞান বলছে, যখন আমরা নিজের আবেগকে শব্দে প্রকাশ করি, যেমন -“আমি রাগান্বিত” বা “আমি উদ্বিগ্ন”, তখন অ্যামিগডালার কার্যকলাপ কমে যায়। এটিকে বলা হয় নেমিং টু টেমিং অর্থাৎ নাম দিলে আবেগ শান্ত হয়।


৩. কগনিটিভ রি-অ্যাপ্রেইজাল! একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখার ক্ষমতা আবেগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিকে শেখার সুযোগ বা সাময়িক চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে আবেগের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।


৪. মাইন্ডফুলনেস ও ধ্যান। মাইন্ডফুলনেস মানে বর্তমান মুহূর্তে সম্পূর্ণ উপস্থিত থাকা। নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস অনুশীলনে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পুরু হয় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে,এমন তথ্য নিউরোইমেজিং গবেষণায় উঠে এসেছে।


৫. শারীরিক নড়াচড়া ও ব্যায়াম! হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা স্বাভাবিকভাবেই মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করে। নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা আবেগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।


শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শিশু ও কিশোরদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পুরোপুরি বিকশিত হয় না কৈশোরের শেষভাগ পর্যন্ত। তাই তাদের আবেগ বেশি তীব্র ও অপ্রত্যাশিত হতে পারে।এই সময়ে যদি আবেগ চেনা, প্রকাশ এবং নিয়ন্ত্রণ শেখানো যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা মানসিকভাবে বেশি স্থিতিশীল প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হয়। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কর্মক্ষেত্র ও সম্পর্কের ওপর আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রভাব:

আবেগ নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা ভালো হলে সিদ্ধান্ত হয় যুক্তিনির্ভর। দ্বন্দ্ব কমে যায়। সহানুভূতি বাড়ে। নেতৃত্বের গুণ বিকশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী কর্মীরা চাপের মধ্যেও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষেত্রে বেশি সফল হন।

প্রযুক্তির যুগে আবেগ নিয়ন্ত্রণের নতুন চ্যালেঞ্জ-

২৪ ঘণ্টার নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনা, নেতিবাচক খবর, মিলিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক কখনোই পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না। ফলে আবেগ সব সময় উত্তেজিত অবস্থায় থাকে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল বিরতি, সীমিত স্ক্রিনটাইম এবং সচেতন কনটেন্ট গ্রহণ আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য এখন আর বিলাসিতা নয় উল্টো প্রয়োজন।

আবেগ আমাদের শত্রু নয়। বরং এটি আমাদের মানবিকতার অন্যতম ভিত্তি। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আবেগ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা আবেগকে নয়। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নয়। এটি প্রশিক্ষণযোগ্য, অনুশীলনযোগ্য  মানসিক দক্ষতা। আবেগ নিয়ন্ত্রণ সুস্থ জীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন।

 

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ