হাতের নখ দ্রুত বাড়ে, পায়ের নখ পিছিয়ে থাকে কেন?রহস্য জানুন বিস্তারিত!

হাতের নখ দ্রুত বাড়ে, পায়ের নখ পিছিয়ে থাকে কেন?রহস্য জানুন বিস্তারিত!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমরা প্রায় সবাই একটি বিষয় খেয়াল করি, কিন্তু তার কারণ নিয়ে খুব কমই চিন্তা করি। আমাদের হাতের নখ কয়েক দিন পরপরই কাটতে হয়, অথচ পায়ের নখ অনেক সময় এক–দুই মাসেও তেমন বড় হয় না। বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক মনে হয় যে আমরা এটিকে প্রশ্নহীনভাবেই মেনে নিই। কিন্তু মানবদেহে কিছুই অকারণে ঘটে না। হাত ও পায়ের নখের বৃদ্ধির এই পার্থক্য আসলে আমাদের শরীরের ভেতরে চলমান সূক্ষ্ম এবং বুদ্ধিদীপ্ত জৈবিক ব্যবস্থারই একটি প্রকাশ।

নখ কীভাবে বড় হয়, কোথা থেকে তার বৃদ্ধি শুরু হয় এবং কেন শরীরের এক জায়গার নখ আরেক জায়গার নখের চেয়ে দ্রুত বাড়ে! এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু ভেতরের দিকে তাকাতে হবে, কোষের কাজকর্ম আর রক্তপ্রবাহের গতিপথ বুঝতে হবে। নখ মূলত কেরাটিন নামের শক্ত এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। চুলের মতো আমাদের নখও মৃত কোষ দিয়ে গঠিত, কিন্তু নখের গোড়ার ভেতরে, ত্বকের নিচে থাকে একটি জীবন্ত অংশ, যাকে বলা হয় নখের ম্যাট্রিক্স। এই ম্যাট্রিক্সেই তৈরি হয় নতুন কোষ। কোষগুলো তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঠেলে আসে, শক্ত হয় এবং দৃশ্যমান নখের আকার নেয়। অর্থাৎ নখ যত দ্রুত বড় হবে, এর মানে, ম্যাট্রিক্সে কোষ বিভাজনের হার তত বেশি।

এখানেই আসে হাত ও পায়ের নখের প্রথম বড় পার্থক্য। হাতের নখের ম্যাট্রিক্সে কোষ বিভাজন সাধারণত পায়ের নখের তুলনায় অনেক দ্রুত ঘটে। পরিসংখ্যানগতভাবে দেখা যায়, হাতের নখ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩ মিলি.মিটার পর্যন্ত বাড়ে, যেখানে পায়ের নখ বাড়ে মাত্র ১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমনটা হয়?

নখের বৃদ্ধি মূলত নখের গোড়ায় চামড়ার এপিডার্মিসের নিচে থাকা জীবিত ও সংবেদনশীল অংশ থেকে শুরু হয়। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে আঙুলের শেষ হাড়ের দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে নখের বৃদ্ধির হার নির্ধারিত হয়। আর এজন্যই মানুষের হাতের নখ পায়ের নখের তুলনায় প্রায় চার গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গড়ে হাতের নখ মাসে ৩.৫ মি.মি. বাড়লেও পায়ের নখ বাড়ে মাত্র ১.৬ মি.মি.।ফলে হাতের নখ সম্পূর্ণ নতুনভাবে গজাতে ৩-৬ মাস এবং পায়ের ক্ষেত্রে ১২-১৮ মাস সময় লাগে। যদিও বয়স, লিঙ্গ, ঋতু বা বংশগতির প্রভাবে এই বৃদ্ধির তারতম্য ঘটে। কি মৃত্যুর পরও নখ বৃদ্ধি পাওয়ার যে একটি ধারণা প্রচলিত আছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। 

আরেকটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রক্তসঞ্চালন। আমাদের শরীরের যেসব অংশে রক্তপ্রবাহ বেশি, সেসব অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান দ্রুত পৌঁছে যায়। হাত শরীরের উপরের দিকে থাকায়, এটি হৃদয়ের তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থান করে। উপরন্তু হাত আমরা সারাক্ষণ  সারাক্ষণ ব্যবহার করি। নিয়মিত নড়াচড়া হাতের পেশি ও রক্তনালিকে সক্রিয় রাখে। ফলে হাতের নখের গোড়ায় রক্তপ্রবাহ ভালো থাকে এবং কোষ তৈরির গতি বেড়ে যায়। পা এই দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে। পা শরীরের নিচের দিকে অবস্থান করে, ফলে সেখানে রক্ত পৌঁছাতে হৃদয়কে মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় বসে থাকেন, কম হাঁটাচলা করেন বা দিনের বেশির ভাগ সময় জুতা পরে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে পায়ের রক্তসঞ্চালন তুলনামূলকভাবে ধীর হয়ে যায়। রক্তপ্রবাহ ধীর হলে নখের ম্যাট্রিক্সে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টির সরবরাহ কমে যায়, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে নখের বৃদ্ধির গতিতে। দৈনন্দিন ব্যবহারের পার্থক্যও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। হাত আমাদের কাজের প্রধান মাধ্যম। ফলে হাতের নখ বেশি ঘর্ষণের মুখে পড়ে, সহজেই ভেঙে যায় বা ক্ষয়ে যায়। শরীর এই ক্ষয়কে এক ধরনের সংকেত হিসেবে নেয় এবং সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নখের বৃদ্ধি কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। একে বলা যায় শরীরের স্বাভাবিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। পায়ের নখ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তাই শরীর সেখানে দ্রুত নখ বড় করার প্রয়োজন অনুভব করে না।

জুতা পরার অভ্যাসও পায়ের নখের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। আঁটসাঁট বা শক্ত জুতা পরলে পায়ের আঙুলের ওপর চাপ পড়ে, নখের গোড়ায় ক্ষুদ্র আঘাত তৈরি হতে পারে। অনেক সময় এই চাপ নখের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। আবার দীর্ঘ সময় জুতা পরার কারণে পায়ের ত্বক ও নখ পর্যাপ্ত বাতাস পায় না, যা নখের স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। হাতের নখ সাধারণত এ ধরনের স্থায়ী চাপের মধ্যে থাকে না।

শরীরের বিপাকক্রিয়াও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। বিপাকক্রিয়া যত সক্রিয় হবে, কোষ তৈরির হার তত বেশি হবে। হাত যেহেতু সব সময় নড়াচড়ার মধ্যে থাকে, সেখানে বিপাকক্রিয়াও তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে। পা অনেক সময় স্থির থাকে, বিশেষ করে আধুনিক জীবনযাপনে। এর ফলে পায়ের নখের কোষ বিভাজনও ধীর হয়। বয়সের প্রভাবও নখের বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্পষ্ট। শিশু ও তরুণ বয়সে শরীরের সব কোষ দ্রুত কাজ করে, ফলে হাত ও পায়ের নখ, দুটোই দ্রুত বাড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তসঞ্চালন ধীর হয়, হরমোনের কার্যকারিতা কমে এবং বিপাকক্রিয়াও মন্থর হয়ে পড়ে। এর প্রভাব প্রথমেই পড়ে পায়ের নখে, কারণ শরীরের অগ্রাধিকার তালিকায় পায়ের নখ শীর্ষে থাকে না।

ঋতুভেদেও নখের বৃদ্ধির তারতম্য দেখা যায়। গরমকালে রক্তনালি প্রসারিত থাকে, শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তপ্রবাহ বাড়ে। ফলে নখ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শীতকালে ঠান্ডার কারণে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায়, বিশেষ করে পায়ের ক্ষেত্রে। তাই শীতকালে অনেকেই লক্ষ্য করেন, পায়ের নখ কাটার প্রয়োজন খুব কমই হয়। এটি আসলে তাপমাত্রা ও রক্তসঞ্চালনের সরাসরি প্রভাব ফেলে।পুষ্টির বিষয়টিও একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। নখের সুস্থ বৃদ্ধি নির্ভর করে প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও বিভিন্ন ভিটামিনের ওপর। শরীরে এসব উপাদানের ঘাটতি হলে নখ দুর্বল হয় এবং ধীরে বাড়ে। শরীর প্রথমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে। নখ, বিশেষ করে পায়ের নখ, এই তালিকায় অনেক নিচে অবস্থান করে। ফলে পুষ্টির অভাব হলে তার প্রভাব আগে পায়ের নখেই দেখা যায়। কিছু শারীরিক সমস্যাও পায়ের নখের বৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যা, স্নায়বিক জটিলতা বা ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে পায়ের নখ ধীরে বাড়া একটি পরিচিত লক্ষণ। তবে কোনো রোগ না থাকলেও সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও হাত ও পায়ের নখের বৃদ্ধির এই পার্থক্য একটি খুবই স্বাভাবিক জৈবিক বাস্তবতা।

সব দিক মিলিয়ে দেখা যায়, হাতের নখের তুলনায় পায়ের নখ ধীরে বড় হওয়া কোনো ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা নয়। এটি মানবদেহের এক ধরনের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থাপনা। শরীর যেখানে বেশি কাজ, বেশি ক্ষয় ও বেশি প্রয়োজন, সেখানে বেশি শক্তি ও পুষ্টি বিনিয়োগ করে। হাত সেই তালিকায় এগিয়ে এবং পা কিছুটা পিছিয়ে। 

এই ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবদেহের জটিল কিন্তু সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার এক চমৎকার উদাহরণ। পরেরবার পায়ের নখ ধীরে বাড়তে দেখে অবাম হওয়ার আগে মনে রাখা যেতে পারে, এটি আসলে আমাদেত শরীরের স্বাভাবিক, সুস্থ ও যুক্তিসংগত কাজের অংশ মাত্র।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ