শীতে খাবার কেন দীর্ঘদিন টিকে থাকে?এর পেছনের কারন জেনে নিন!

শীতে খাবার কেন দীর্ঘদিন টিকে থাকে?এর পেছনের কারন জেনে নিন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শীত এলেই আমাদের অনেকের ঘরে একটি পরিচিত অভিজ্ঞতা সামনে আসে, গরমকালের তুলনায় রান্না করা খাবার বেশ কিছুটা সময় ভালো থাকে, দ্রুত গন্ধ হয় না, সহজে টকও ধরে না। ফ্রিজ ছাড়াও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা খাবার শীতে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে। এই ঘটনাটি কিন্তু কাকতালীয় কিছু নয়, আবার কোনো লোকজ বিশ্বাসও নয়। এর পেছনে রয়েছে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ, যেখানে তাপমাত্রা, অণুজীব, রাসায়নিক বিক্রিয়া ও পরিবেশ সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে।

খাবার নষ্ট হওয়া মানে শুধু স্বাদ বদলে যাওয়া নয়,এর সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যঝুঁকি, খাদ্য অপচয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিও। তাই শীতে খাবার কেন বেশি সময় ভালো থাকে! এই প্রশ্নের উত্তর জানা শুধু কৌতূহলের জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

খাবার নষ্ট হয় কেন?

খাবার নষ্ট হওয়ার মূল কারণ হলো তিনটি।

১। অণুজীবের বৃদ্ধি, 

২। রাসায়নিক পরিবর্তন এবং

৩। প্রাকৃতিক এনজাইমের ক্রিয়া। 

রান্না করা বা কাঁচা খাবারের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ইস্টের মতো অণুজীব ঢুকে পড়ে বা আগে থেকেই থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এরা দ্রুত বংশবিস্তার শুরু করে। এর ফলে খাবারে দুর্গন্ধ, টক স্বাদ, ছাঁচ বা রঙ পরিবর্তন দেখা যায়। এই অণুজীবগুলোর কার্যকলাপের গতি অনেকটাই নির্ভর করে তাপমাত্রার ওপর। উষ্ণ পরিবেশে এদের বিপাকক্রিয়া দ্রুত হয়, আর ঠান্ডা পরিবেশে তা ধীর হয়ে যায়। এখান থেকেই শীতকালের ভূমিকা শুরু হয়।

শীতে পরিবেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা কম থাকে। তাপমাত্রা কমে গেলে অণুজীবের কোষের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ধীর হয়ে যায়। সহজভাবে বললে, ব্যাকটেরিয়া তখন আগের মতো দ্রুত খেতে, বাড়তে বা বংশবিস্তার করতে পারে না। গরমকালে যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রান্না করা খাবার নষ্ট হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, সেখানে শীতে একই খাবার অনেক বেশি সময় নিরাপদ থাকতে পারে। কারণ ঠান্ডায় অণুজীব কার্যত এক ধরনের ধীরগতির অবস্থায় চলে যায়।

তাছাড়া শীতকালে বাতাস সাধারণত শুষ্ক থাকে। এই কম আর্দ্রতাও খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। বেশির ভাগ ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার করতে আর্দ্র পরিবেশ দরকার হয়। বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকলে খাবারের উপরিভাগ দ্রুত শুকনো থাকে, যা অণুজীবের জন্য অনুকূল নয়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খাবারের গায়ে ঘাম জমে, যা অণুজীবের বৃদ্ধিকে আরও সহজ করে তোলে। শীতে এই সুযোগটা তারা কম পায়।

খাবারের ভেতরে শুধু জীবাণুই কাজ করে না, অনেক সময় অক্সিজেনের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে খাবারের মান নষ্ট হয়। তেলচর্বি জাতীয় খাবারে দুর্গন্ধ হওয়া বা রং বদলে যাওয়া তার একটি উদাহরণ। তাপমাত্রা যত বেশি, রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি তত বেশি। শীতে তাপমাত্রা কম থাকায় এসব বিক্রিয়াও ধীরে ঘটে। ফলে খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মান তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকে।

খাবারের নিজস্ব এনজাইমও এক ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। ফল, শাকসবজি বা রান্না করা খাবারের ভেতরে থাকা এনজাইম নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বেশি সক্রিয় থাকে। ঠান্ডা পরিবেশে এদের কার্যকারিতা কমে যায়। এ কারণেই শীতে অনেক সবজি বা ফল গরমকালের তুলনায় ধীরে নরম হয় বা পচে।

রান্না করা খাবার সাধারণত কাঁচা খাবারের তুলনায় দ্রুত নষ্ট হয়, কারণ রান্নার সময় অনেক সময় খাবারের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট হয়ে যায়। তবে শীতকালে রান্না করা খাবারের ক্ষেত্রেও এই নষ্ট হওয়ার গতি কমে আসে। অন্যদিকে কাঁচা শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজ বা রসুন শীতে বেশি দিন ভালো থাকার একটি কারণ হলো ঠান্ডা পরিবেশে এদের ভেতরের শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এতে পচন প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার যে শীতে খাবার বেশি সময় ভালো থাকলেও তা কখনোই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। অনেক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া কম তাপমাত্রাতেও বেঁচে থাকতে পারে, শুধু তাদের বৃদ্ধি ধীর হয়। দেখতে ভালো লাগা খাবারও সব সময় নিরাপদ নাও হতে পারে। বিশেষ করে রান্না করা খাবার অনেকক্ষণ খোলা রেখে দিলে শীতেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক সংরক্ষণ খুবই জরুরি।

কেন প্রাচীন সমাজে শীতকাল সংরক্ষণের সময় ছিল?

আধুনিক ফ্রিজের আগেও মানুষ শীতকালকে খাবার সংরক্ষণের সবচেয়ে ভালো সময় হিসেবে ব্যবহার করত। শীতের ঠান্ডায় শুকনো খাবার, শুঁটকি, আচার বা সংরক্ষিত মাংস অনেক দিন ভালো থাকত। এর পেছনে কোনো প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ বুঝেছিল যে ঠান্ডা পরিবেশ খাবারকে টিকিয়ে রাখে। 

শীতকালে খাবার বেশি সময় ভালো থাকে এই তথ্য জেনে অনেকেই অযত্নশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, শীত শুধু সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে,কোনো বিকল্প নয়। পরিষ্কার হাত, পরিষ্কার পাত্র, ঢেকে রাখা খাবার এসব নিয়ম শীতেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই মৌসুমি সুবিধা কাজে লাগিয়ে খাদ্য অপচয় কিছুটা কমানো সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে রান্না, সঠিক সংরক্ষণ এবং খাবারের মান পর্যবেক্ষণ করলে শীতকাল সত্যিই উপকারী হয়ে উঠতে পারে।

শীতে খাবার বেশি সময় ভালো থাকার পেছনে কোনো রহস্য নেই, আছে প্রকৃতির নিয়ম। কম তাপমাত্রা অণুজীবের গতি কমিয়ে দেয়, রাসায়নিক বিক্রিয়া ধীর করে, আর শুষ্ক বাতাস পচনের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট করে। এই তিনটি কারণ মিলেই শীতকে খাবার সংরক্ষণের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ সময় বানিয়েছে। তবে এই সুবিধা বুঝে দায়িত্বশীল আচরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ খাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্যের প্রশ্ন।

সম্পর্কিত নিউজ