ঘরে বসেই ট্রায়াল! রিটেইল দুনিয়া রাঙাচ্ছে অগমেন্টেড রিয়েলিটির ছোঁয়া

ঘরে বসেই ট্রায়াল! রিটেইল দুনিয়া রাঙাচ্ছে অগমেন্টেড রিয়েলিটির ছোঁয়া
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

কেনাকাটা মানেই একসময় ছিল দোকানে যাওয়া, পণ্য ছুঁয়ে দেখা, মাপজোক করা আর বিক্রেতার সঙ্গে দরদাম। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই অভিজ্ঞতা বদলাতে শুরু করেছিল অনলাইন শপিংয়ের মাধ্যমেই। কিন্তু এখন রিটেইল জগৎ এগিয়ে গেছে আরও এক ধাপ। পর্দার ভেতর থাকা পণ্য যেন বাস্তব দুনিয়ায় হাজির হচ্ছে। ঘরের মেঝেতে ফার্নিচার বসানো যাচ্ছে, মুখে না লাগিয়েই দেখা যাচ্ছে চশমা কেমন মানাবে, এমনকি জামা কাপড় শরীরে না পরেই বোঝা যাচ্ছে ফিট হবে কি না। এই বদলের নাম অগমেন্টেড রিয়েলিটি রিটেইল।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআর শুধু একটি প্রযুক্তি নয়। এটি শেখার, বোঝার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার নতুন পদ্ধতি। রিটেইল খাতে এর ব্যবহার প্রমাণ করে দিয়েছে যে প্রযুক্তি কেবল বিক্রি বাড়ানোর হাতিয়ার নয়, এটি ভোক্তার আচরণ, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা গড়ে তোলার একটি শক্তিশালী মাধ্যমও

অগমেন্টেড রিয়েলিটি এমন একটি প্রযুক্তি, যা বাস্তব পরিবেশের ওপর ডিজিটাল উপাদান যুক্ত করে দেখায়। অর্থাৎ ব্যবহারকারী যা দেখছেন, সেটির সঙ্গে ভার্চুয়াল তথ্য বা 3 অবজেক্ট মিশে যায়। এটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো পুরোপুরি কৃত্রিম জগৎ নয়, আবার সাধারণ স্ক্রিন দেখাও নয়। এটি বাস্তবতার সঙ্গে প্রযুক্তির একটি  সংযোগস্থল। রিটেইলে এআর মানে হলো পণ্যকে শুধু ছবিতে না দেখে বাস্তব পরিবেশে কল্পনা করা নয়, বরং সরাসরি নিজের চারপাশে দেখে নেওয়া। এই অভিজ্ঞতা ক্রেতার শেখার ধরনই বদলে দেয়।

রিটেইল কেন এআর গ্রহণ করছে?

রিটেইল ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোক্তার আস্থা। অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে মানুষ অনেক সময়ই দ্বিধায় থাকে, পণ্যটি  ঠিকমতো মানাবে কি না,  রঙ ছবির মতোই হবে কি না, আকার ঠিক হবে কি না ইত্যাদি। এই অনিশ্চয়তা থেকেই রিটার্ন বাড়ে, অসন্তোষ তৈরি হয়। অগমেন্টেড রিয়েলিটি এই অনিশ্চয়তাটিকে নিশ্চয়তায় রূপান্তরিত করে। ভোক্তা নিজেই দেখে নেয় পণ্যটি তার জীবনের সঙ্গে কতটা মানানসই। ফলে সিদ্ধান্ত কল্পনার উপর না হয়ে, হয়  বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

এআর রিটেইলের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক হলো, এটি মানুষকে পণ্য সম্পর্কে শেখায়। আগে পণ্যের তথ্য জানার জন্য লেখা বিবরণ বা বিক্রেতার কথা শোনা লাগত। এখন ভোক্তা নিজেই ইন্টারঅ্যাক্ট করে শিখছে। একটি ফার্নিচার কিনতে গেলে শুধু দৈর্ঘ্য-প্রস্থ পড়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। এআর ব্যবহার করে ঘরের ভেতরে সেটি বসিয়ে দেখা যায়, আলোতে কেমন দেখাবে, চলাচলে সমস্যা হবে কি না। এই প্রক্রিয়ায় ভোক্তা স্থান, আকার ও নকশা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

পোশাক, চশমা, ঘড়ি বা কসমেটিকস ইত্যাদি  পণ্যগুলো কিনতে সবচেয়ে বেশি দ্বিধা থাকে। কারণ এগুলো ব্যক্তিগত চেহারা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এআর এখানে এক ধরনের আয়নার কাজ করছে। ডিজিটালভাবে মুখে লিপস্টিক বা চশমা পরখ করে দেখা মানে এটি রঙ, আকার ও স্টাইল সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। 

শুধু অনলাইন নয়, ফিজিক্যাল দোকানেও এআর লক্ষনীয় পরিবর্তন আনছে। স্মার্ট স্ক্রিন বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পণ্যের ভেতরের গঠন, ব্যবহারবিধি বা বিকল্প ব্যবহার দেখানো যাচ্ছে। একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র কেনার সময় ক্রেতা দেখতে পাচ্ছেন ভেতরে কোন অংশ কোথায় আছে, কীভাবে এটি কাজ করে। এতে শুধু কেনাকাটা নয়, প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞানও বাড়ছে।

এআর রিটেইল সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও যুক্তিসংগত করে তোলে। অনুমান বা আবেগের বদলে এখানে ভিজ্যুয়াল প্রমাণ কাজ করে। মানুষ যা দেখে, সেটির ওপর বেশি ভরসা করে। এই প্রক্রিয়ায় ভোক্তার শেখার ক্ষমতা বাড়ে। সে বুঝতে ভালোভাবে বুঝতে পারে নিজের প্রয়োজন কী, নিজের জায়গা বা শরীরের সঙ্গে কোন পণ্য মানানসই। এটি এক ধরনের ব্যবহারিক শিক্ষা, যা প্রতিটি কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত।

রিটেইল ব্যবসার জন্যও এআর একটি শেখার মাধ্যম। ভোক্তা কীভাবে পণ্য ব্যবহার করছে, কোন কোণ থেকে বেশি দেখছে, কোথায় থামছে ইত্যাদি  তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পণ্যের নকশা ও উপস্থাপন উন্নত করতে পারে। এতে ব্যবসা শুধু বিক্রি নয়, ভোক্তার আচরণ বোঝার একটি বাস্তব পাঠ পায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর পণ্য তৈরিতে সহায়তা করে।

অনেকে মনে করেন প্রযুক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। কিন্তু এআর রিটেইল দেখাচ্ছে, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রযুক্তি মানুষকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে পারে। একটি পণ্য কেনার সময় নিজের ঘর, নিজের শরীর বা নিজের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সেটির সম্পর্ক দেখানো মানে ভোক্তার বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দেওয়া। এই মানবিক সংযোগই এআর-এর সবচেয়ে বড় শক্তি।

সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ:

এআর রিটেইল এখনও নিখুঁত নয়। উন্নত ডিভাইস, ভালো ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল দক্ষতা প্রয়োজন। সব ভোক্তার জন্য এটি সমানভাবে সহজ নয়। এছাড়া তথ্যের সঠিকতা ও গোপনীয়তার প্রশ্নও রয়েছে। তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলোই ভবিষ্যতের উন্নতির জায়গা। 

অগমেন্টেড রিয়েলিটি রিটেইল প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা মানুষকে বিভ্রান্ত নয়, বরং সচেতন করে তোলে। 

সম্পর্কিত নিউজ