অস্থির মনে শান্তি চান? জাপানের এই প্রাচীন শিল্প হতে পারে সেরা থেরাপি!

অস্থির মনে শান্তি চান? জাপানের এই প্রাচীন শিল্প হতে পারে সেরা থেরাপি!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

জাপানের একটি শান্ত ঘরে, মেঝেতে বসে কেউ একজন নিঃশব্দে তুলি ডুবিয়ে নিচ্ছেন কালিতে! চারপাশে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই কোনো শব্দের কোলাহল। কাগজের ওপর প্রথম আঁচড় দেওয়ার আগেই তিনি একবার গভীর শ্বাস নেন। কারণ এখানে শুধু অক্ষর লেখা হচ্ছে না, এখানে অনুশীলন হচ্ছে মনোযোগ, ধৈর্য ও বর্তমান মুহূর্তে সম্পূর্ণ উপস্থিত থাকার। এই শিল্পের নাম শোদো, অর্থাৎ জাপানি ক্যালিগ্রাফি। জাপানে এটি কেবল সৌন্দর্যের চর্চা নয়, বরং এক ধরনের মানসিক সাধনা, যা আধুনিক ভাষায় বলা যায় মাইন্ডফুলনেসের এক প্রাচীন রূপ।

জাপানি ক্যালিগ্রাফি বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি নিছক সুন্দর করে অক্ষর লেখার কৌশল। কিন্তু জাপানি সংস্কৃতিতে এর অর্থ অনেক গভীর। এখানে প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ফাঁক, এমনকি শূন্য স্থানও অর্থ বহন করে। একটি অক্ষর কতটা নিখুঁত হলো, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো লেখার সময় লেখকের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল।এই কারণেই জাপানে বলা হয়, ক্যালিগ্রাফি হলো মনের আয়না। আপনি যদি অস্থির হন, তাড়াহুড়ো করেন, তাহলে সেটি সরাসরি ফুটে উঠবে তুলির আঁচড়ে। আবার মন শান্ত, মনোযোগ গভীর হলে অক্ষরও হবে স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ।

আধুনিক জীবনে আমরা দ্রুততার মধ্যে অভ্যস্ত। দ্রুত লিখি, দ্রুত পড়ি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিই। জাপানি ক্যালিগ্রাফি এই অভ্যাসের ঠিক উল্টো পথে হাঁটতে শেখায়। এখানে কোনো তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই। একটি ভুল রেখা মানেই পুরো কাজ নতুন করে শুরু করা। এই প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে শিখে যান অপেক্ষা করতে, সময় দিতে, এবং প্রতিটি মুহূর্তকে সম্মান করতে। কালি শুকানোর জন্য অপেক্ষা করা, তুলি ঠিকভাবে ধরার জন্য সময় নেওয়া এসব ছোট ছোট ধৈর্যের চর্চাই দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সহনশীলতা বাড়ায়।

ক্যালিগ্রাফির সময় এক মুহূর্তের জন্যও মন অন্যদিকে গেলে আঁচড় বেঁকে যেতে পারে। তাই এখানে একাগ্রতা কোনো উপদেশ নয়, এটি একটি বাস্তব প্রয়োজন। তুলি কাগজে ছোঁয়ানোর মুহূর্তে লেখককে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে হয় শ্বাস-প্রশ্বাস, হাতের চাপ, তুলির গতি ইত্যাদি সবকিছুর প্রতি। এই একাগ্রতার চর্চাই ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে। যারা নিয়মিত ক্যালিগ্রাফি অনুশীলন করেন, তাদের অনেকেই বলেনএক্সকাজের সময় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়, অস্থিরতা কমে, চিন্তা পরিষ্কার হয়।

পশ্চিমা বিশ্বে মাইন্ডফুলনেস বলতে অনেক সময় ধ্যান বা নিঃশ্বাসের অনুশীলনকে বোঝানো হয়। কিন্তু জাপানি সংস্কৃতিতে মাইন্ডফুলনেস অনেক বেশি কর্মমুখী। চা বানানো, বাগান পরিচর্যা, রান্না এমনকি পরিষ্কার করাও এখানে এক ধরনের মনোযোগের সাধনা।

ক্যালিগ্রাফি এই দর্শনেরই একটি অংশ। এখানে মনকে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা নেই। বরং কাজের ভেতর দিয়েই মন স্বাভাবিকভাবে স্থির হয়ে আসে। তুলির প্রতিটি গতি লেখককে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে।

ক্যালিগ্রাফিতে ভুল হতেই পারে, আর সেটি স্বাভাবিক। জাপানি শিক্ষায় ভুলকে লজ্জার বিষয় হিসেবে নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখা হয়। একটি অক্ষর হয়তো পুরোপুরি নিখুঁত হলো না, কিন্তু সেটিও লেখকের সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার সাক্ষ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে নিজের প্রতি একটু সহনশীল হতে শেখায়। জীবনের সবকিছু নিখুঁত হতে হবে, সেই চাপ থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি পাওয়া যায়। ভুলকে গ্রহণ করার এই মানসিকতা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানি ক্যালিগ্রাফিতে বসার ভঙ্গি, তুলির ধরন, এমনকি কাগজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সচেতনতাও তৈরি করে। এই শরীর-মন সংযোগ আধুনিক জীবনের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার ফলে অনেকেই শরীরের ভঙ্গি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল রাখেন না। ক্যালিগ্রাফির অনুশীলন এই অবচেতন অভ্যাসগুলো বদলাতে সাহায্য করে।

জাপানে শিশুদের স্কুলজীবনেই ক্যালিগ্রাফি শেখানো হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু সুন্দর হাতের লেখা নয়।শিশুদের ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও মনোযোগ তৈরি করাই মূল লক্ষ্য। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও ক্যালিগ্রাফি এখন নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে। কর্মব্যস্ত, চাপপূর্ণ জীবনে এটি অনেকের জন্য এক ধরনের মানসিক আশ্রয় হয়ে উঠেছে।

বর্তমান বিশ্বে স্ট্রেস, উদ্বেগ ও মনোযোগের সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল নোটিফিকেশন, দ্রুতগতির জীবনধারা মানুষকে সবসময় বিচ্ছিন্ন ও অস্থির করে রাখছে। এই প্রেক্ষাপটে জাপানি ক্যালিগ্রাফির মতো ধীর, মননশীল চর্চা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। বরং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানসিক স্থিতি তৈরি করে। দিনে কয়েক মিনিট তুলি হাতে নেওয়াই অনেকের জন্য হয়ে ওঠে মানসিক বিশ্রামের সময়।

জাপানের সীমা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বের নানা দেশে ক্যালিগ্রাফি ও জাপানি মাইন্ডফুলনেস চর্চা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। এর মূল আকর্ষণ হলো এটি জটিল নয়, কিন্তু গভীর। কোনো বড় আয়োজন বা বিশেষ সরঞ্জাম ছাড়াই কেবল মনোযোগ ও ধৈর্য দিয়ে শুরু করা যায়। এখানে কোনো তাত্ত্বিক ভাষণ নেই, নেই কঠোর নিয়মের তালিকা। আছে শুধু একটি তুলি, কিছু কালি, আর নিজের সঙ্গে নিজের নিরব কথোপকথন।

যারা ক্যালিগ্রাফি চর্চা করেন, তারা অনেকেই বলেন এই অভ্যাস তাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজে মনোযোগ বাড়িয়েছে। কথা বলার সময় অন্যের কথা শোনা, কাজের সময় তাড়াহুড়ো কমানো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এক মুহূর্ত থামা ইত্যাদি সবই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এটি দেখায়, ধৈর্য ও মনোযোগ কোনো আলাদা দক্ষতা নয়। এগুলো চর্চার ফল।

সম্পর্কিত নিউজ