শীত এলেই চিরুনিতে গোছা গোছা চুল? সাধারণ সমস্যা নাকি বড় কোনো রোগ!

শীত এলেই চিরুনিতে গোছা গোছা চুল? সাধারণ সমস্যা নাকি বড় কোনো রোগ!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শীত এলেই অনেকের একটাই অভিযোগ- চুল পড়া হঠাৎ করে বেড়ে গেছে! গোসলের সময় ড্রেন ভরে ওঠে, চিরুনি টানলেই হাতে জমে থাকে চুল, বালিশে কিংবা কাপড়ে পড়ে থাকা চুল দেখে দুশ্চিন্তা বাড়ে। অনেকেই ভাবেন হয়তো শীত গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কেউ কেউ আবার ভয় পান,ভাবতে থাকেন,এটি কি স্থায়ী কোনো রোগের লক্ষণ? আসলে শীতকালীন চুল পড়া বিষয়টি পুরোপুরি একপাক্ষিক নয়। এর পেছনে যেমন আছে স্বাভাবিক মৌসুমি প্রভাব, তেমনি লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরের ভেতরের কিছু অসামঞ্জস্য বা অভ্যাসগত ভুল।

মানুষের মাথার প্রতিটি চুল একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্রের মধ্যে দিয়ে যায়। সাধারণভাবে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। চুলের জীবনচক্র মূলত তিন ধাপে বিভক্ত। বৃদ্ধি, স্থিতি ও ঝরে পড়া। এই প্রক্রিয়া বছরজুড়েই চলতে থাকে। তবে পরিবেশ, আবহাওয়া, হরমোন, পুষ্টি ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চুল পড়ার হার কখনো কমে, কখনো বা বাড়ে। শীতকালে এই স্বাভাবিক চুল পড়ার হার অনেকের ক্ষেত্রেই চোখে পড়ার মতো বেড়ে যায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এটিকে রোগ বলা যাবে না। জনতে হবে কোনটি মৌসুমি, আর কোনটি সতর্ক হওয়ার মতো।

শীতকালে সাধারণত বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়। এই শুষ্ক পরিবেশ সরাসরি মাথার ত্বকে প্রভাব ফেলে। স্ক্যাল্প যখন শুষ্ক হয়ে পড়ে, তখন চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া শীতের সময় ঠান্ডা বাতাসে রক্তনালিগুলো সামান্য সংকুচিত হয়। ফলে মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন কিছুটা কমে যেতে পারে। চুলের গোড়ায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছাতে দেরি হলে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঝরে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শীতকালে পানি পানের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়। শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে ত্বক ও চুলে। শুষ্ক স্ক্যাল্প, খুশকি এবং চুল ভাঙার প্রবণতা তখন বৃদ্ধি পায়।

শীতে অনেকেই গরম পানিতে বেশি সময় ধরে গোসল করেন। অতিরিক্ত গরম পানি মাথার প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে নিয়ে যায়, যা চুলের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই তেল কমে গেলে চুল শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। 

তাছাড়া শীতের সময় হিটার, গরম বাতাস বা ভারী টুপি ব্যবহারের অভ্যাসও চুল পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় মাথা ঢাকা থাকলে স্ক্যাল্পে ঘাম জমে, বাতাস চলাচল কমে যায়, যা চুলের গোড়ার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

শীতের সঙ্গে খুশকির সম্পর্ক বেশ গভীর। ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় স্ক্যাল্পে মৃত কোষ জমে খুশকি বাড়ে। এই খুশকি শুধু বিরক্তিকর নয়, বরং চুলের গোড়ায় প্রদাহ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন খুশকি অবহেলা করলে চুল পড়া ত্বরান্বিত হতে পারে।


তবে কি এটি সব সময় মৌসুমি?

সব চুল পড়াকে মৌসুমি বলে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে শীতকাল কেবল একটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, মূল সমস্যাটি থাকে অভ্যন্তরে।

যদি এই লক্ষণগুলো দেখা যায় -

⇨ চুল পড়া কয়েক মাস ধরে ক্রমাগত বাড়ছে।

⇨ চুলের ঘনত্ব দৃশ্যমানভাবে কমে যাচ্ছে।

⇨ মাথার কোনো নির্দিষ্ট অংশে টাক পড়ার মতো ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে।

⇨ চুল পড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন পরিবর্তন, ত্বকের শুষ্কতা বা অনিয়মিত মাসিকের মতো উপসর্গ আছে।

তাহলে সেটি শুধুই মৌসুমি সমস্যা নাও হতে পারে।

শীতকালে ধরা পড়া অনেক চুল পড়ার পেছনে থাকতে পারে আয়রনের ঘাটতি, ভিটামিন ডি বা বি১২-এর অভাব। সূর্যালোক কম পাওয়ার কারণে শীতে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা অনেকের শরীরেই কমে যায়, যা চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। এছাড়াও হরমোনজনিত সমস্যা, বিশেষ করে থাইরয়েডের অসামঞ্জস্য, চুল পড়ার একটি বড় কারণ। স্ট্রেসও অনেকসময় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শীতকালে দিনের আলো কমে যাওয়া, কর্মচাপ ও মানসিক অবসাদ অনেকের মধ্যে স্ট্রেস বাড়িয়ে দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে চুলে।

চুল পড়া আর মানসিক চাপ এই দুটির সম্পর্ক অনেকটা দ্বিমুখী। স্ট্রেস চুল পড়া বাড়ায়, আবার চুল পড়া বাড়লে স্ট্রেস আরও বেড়ে যায়। শীতকালে এই চক্রটি অনেকের ক্ষেত্রেই তীব্র হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্র ব্যাহত করতে পারে।

শীতকালীন চুল পড়া কমাতে করণীয়:

চুল পড়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও সঠিক যত্নে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শীতে মাথার ত্বক আর্দ্র রাখা খুব জরুরি। মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত, যাতে স্ক্যাল্পের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট না হয়। অতিরিক্ত গরম পানির বদলে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করাই ভালো। খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হয়। পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার চুলের জন্য অপরিহার্য। শীতের আলসেমিতে পানি কম খাওয়া যাবে না। শরীর হাইড্রেটেড রাখা চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় জরুরী। মাথায় নিয়মিত তেল ম্যাসাজ রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে। তবে খুব জোরে ঘষাঘষি করা ঠিক নয়। খুশকি থাকলে সেটিকে অবহেলা না করে, নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।


কখন সতর্ক হওয়া জরুরি?

যদি শীত শেষ হওয়ার পরও চুল পড়া কমে না, বা চুলের গোড়া ব্যথা, ত্বকে লালচে ভাব, চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এটি তখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং শরীরের ভেতরের কোনো সংকেত হতে পারে।

মৌসুমি হলেও অবহেলা নয়!

শীতকালীন চুল পড়া অনেক সময় স্বাভাবিক ও সাময়িক হলেও এটি শরীরের যত্ন নেওয়ার একটি বার্তা দেয়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চুল ও ত্বকের যত্নেও পরিবর্তন আনতে হয়। সমস্যাকে ছোট করে দেখা যেমন অনুচিত, তেমনি অযথা আতঙ্কিত হওয়াও কোনো সমাধান নয়।

শীতে চুল পড়া একদিকে যেমন প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে তেমনি এটি হতে পারে শরীরের ভেতরের ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত। মৌসুমি ভেবে উপেক্ষা করলে লুকিয়ে থাকা সমস্যাগুলো অজানাই থেকে যায়। আবার সচেতন যত্ন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তনেই অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। শীতকাল তাই শুধু চুল পড়ার মৌসুম নয়।এটি নিজের শরীর ও স্বাস্থ্যের দিকে নতুন করে তাকানোরও একটি আহ্বান।

সম্পর্কিত নিউজ