চাপের মুখেও যারা সফল হন, তারা ঠিক এই কৌশলগুলোই মেনে চলেন!

চাপের মুখেও যারা সফল হন, তারা ঠিক এই কৌশলগুলোই মেনে চলেন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আধুনিক জীবনের গতি যত বেড়েছে, চাপ ততটাই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। কাজের সময়সীমা, আর্থিক দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক প্রত্যাশা সবকিছু মিলিয়ে মানুষের মানসিক ভার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু চাপই সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। আসল সমস্যাটি হলো, এই চাপের সময় আমরা কীভাবে নিজেকে সামলাই! এখানেই সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, কোপিং মেকানিজম, অর্থাৎ চাপের মুখে মানসিক শক্তি ধরে রাখার কৌশল।

মানসিক শক্তি কোনো জন্মগত উপহার নয়, আবার কোনো একদিনে অর্জন করার বিষয়ও নয়। এটি গড়ে ওঠে অভ্যাস, উপলব্ধি ও বাস্তবভিত্তিক কৌশলের সমন্বয়ে। চাপ যখন জীবনের স্বাভাবিক অংশ, তখন তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা নয় বরং চাপের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করাই হয়ে ওঠে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।

চাপ কোনো বিমূর্ত অনুভূতি নয়। এটি শরীর ও মস্তিষ্কে বাস্তব পরিবর্তন ঘটায়। চাপের মুহূর্তে মস্তিষ্ক বিপদের সংকেত হিসেবে বিষয়টিকে চিহ্নিত করে এবং শরীরে সতর্কতামূলক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। হৃদস্পন্দন বাড়ে, শ্বাস দ্রুত হয়, পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। স্বল্প সময়ের জন্য এই প্রতিক্রিয়া উপকারী, এটি আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। তখন মস্তিষ্ক আর স্বাভাবিক বিশ্রামের অবস্থায় ফিরতে পারে না। মনোযোগ কমে যায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়, এমনকি স্মৃতিশক্তিও দুর্বল হতে পারে। এই অবস্থায় মানসিক শক্তি ধরে রাখার কৌশল না থাকলে মানুষ দ্রুত ভেঙে পড়ে

কোপিং মেকানিজম মানে কী?

চাপ, ভয় বা অনিশ্চয়তার মুখে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে আমরা যে চিন্তা ও আচরণগত পদ্ধতি ব্যবহার করি,তা ই মূলত কোপিং মেকানিজম। এগুলো হতে পারে সচেতন বা অচেতন। কেউ চাপের সময় কথা বলে হালকা হয়, কেউ বা আবার নিজেকে গুটিয়ে নেয়, আবার কেউ কাজে ডুবে গিয়ে সব ভুলে থাকতে চায়। সব কোপিং মেকানিজম সমান কার্যকর নয়। কিছু পদ্ধতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি ডেকে আনে। আবার কিছু কৌশল ধীরে ধীরে মানসিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

সমস্যা-কেন্দ্রিক মোকাবিলা: 

এক ধরনের কার্যকর কোপিং হলো সমস্যা-কেন্দ্রিক মোকাবিলা। এখানে মানুষ সমস্যাকে সরাসরি চিহ্নিত করে এবং সমাধানের পথে হাঁটে। চাপের উৎস যদি কাজের চাপ হয়, তাহলে সময় ব্যবস্থাপনা, কাজ ভাগ করে নেওয়া বা অগ্রাধিকার ঠিক করা, এসব পদক্ষেপ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতির মূল শক্তি হলো নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে পরিস্থিতির ওপর তার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ আছে, তখন মানসিক শক্তি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

আবেগ-কেন্দ্রিক মোকাবিলা: 

সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। অনেক সময় পরিস্থিতি বদলানো আমাদের হাতে থাকে না। তখন আবেগ-কেন্দ্রিক কোপিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মানে হলো নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে গ্রহণ করে নেয়া। চাপের সময় দুঃখ, রাগ বা ভয় অনুভব করা স্বাভাবিক। এই আবেগগুলো চেপে রাখলে তা আরও জটিল আকার নিতে পারে। বরং নিরাপদভাবে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা, যেমন- কারও সঙ্গে কথা বলা, নিজের অনুভূতি লিখে রাখা ইত্যাদি মানসিক ভার হালকা করতে সাহায্য করে।

সামাজিক সম্পর্কের ভুমিকা: 

মানসিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্কের ভূমিকা অনেক গভীর। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। চাপের সময় একা থাকার প্রবণতা দেখা গেলেও, বাস্তবে বিশ্বাসযোগ্য কারও উপস্থিতি মানসিক চাপ কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। বন্ধু, পরিবার বা সহকর্মীর সঙ্গে কথা বললে সমস্যা ছোট হয়ে যায় এমনটা নয় ঠিকই, কিন্তু বোঝার অনুভূতি মানুষকে মানসিকভাবে শক্ত করে তোলে। এটি মস্তিষ্ককে নিরাপত্তার সংকেত দেয়, যা চাপের প্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে।

চিন্তার ধরন বদলানো: 

চাপের সময় আমরা কীভাবে ভাবি, সেটিই অনেকাংশে নির্ধারণ করে আমরা কতটা ভেঙে পড়ব বা কতটা সামলে উঠব। একই পরিস্থিতিতে কেউ ভেঙে পড়ে, আবার কেউ সেটিকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখে। এই চিন্তার পার্থক্য আসে মানসিক পুনর্গঠন থেকেই অর্থাৎ পরিস্থিতিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার ক্ষমতা। সমস্যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা না ভেবে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা মানসিক শক্তি বাড়ায়। এটি একেবারে সহজ নয়, কিন্তু চর্চার মাধ্যমে সম্ভব।

শারীরিক অভ্যাস ও মানসিক শক্তির সম্পর্ক:

মানসিক শক্তি কেবল মনের বিষয় নয়। শরীরের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক আছে। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাবার এবং সামান্য শারীরিক নড়াচড়া ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলোকে অবহেলা করলে কোনো কোপিং কৌশলই পুরোপুরি কাজ করে না। চাপের সময় অনেকেই ঘুম কমিয়ে দেন বা খাবার এড়িয়ে যান। এতে শরীর আরও দুর্বল হয়, মস্তিষ্ক চাপ সামলানোর ক্ষমতা হারায়। বিপরীতে, নিয়মিত শারীরিক যত্ন মানসিক শক্তির ভিত্তি মজবুত করে।

মনোযোগের চর্চা ও বর্তমান মুহূর্ত!

চাপের বড় অংশ আসে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বা অতীতের আফসোস থেকে। মনোযোগের চর্চা মানুষকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে। এতে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। বর্তমানের ছোট ছোট বিষয়, যেমন- শ্বাসের গতি, শরীরের অনুভূতি, আশপাশের শব্দ ইত্যাদির দিকে মনোযোগ দিলে চাপের তীব্রতা কমে। এটি মানসিক শক্তির একটি নীরব কিন্তু কার্যকর অনুশীলন।

ক্ষতিকর কোপিং: 

সব কোপিং মেকানিজমই কিন্তু  আমাদের জন্য উপকারী নয়। কেউ কেউ চাপ সামলাতে অতিরিক্ত কাজ, অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন বা ক্ষতিকর অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব পদ্ধতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও সমস্যাকে গভীর করে। মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্য প্রথম ধাপই হলো এই ক্ষতিকর প্যাটার্নগুলো চিহ্নিত করা। কারণ এগুলো চাপ কমায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সহনশীলতা কমিয়ে দেয়।

মানসিক শক্তি মানে অনুভূতিহীন হওয়া নয়!

আমাদের মধ্যে অনেকেরই একটি বড় ভুল ধারণা হলো, মানসিকভাবে শক্ত মানে সব সময় দৃঢ় ও নির্ভার থাকা। বাস্তবে মানসিক শক্তি মানে অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয়, বরং তা সামলে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। চাপের সময় কাঁদা, ক্লান্ত হওয়া বা বিরতি নেওয়া দুর্বলতা নয়। বরং নিজের সীমা বোঝা এবং প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নেওয়াই মানসিক শক্তির অংশ।

কোপিং মেকানিজম কোনো প্রস্তুত প্যাকেট নয়। এটি সময়ের সঙ্গে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। আজ যে পরিস্থিতি অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হয়তো আত্মবিশ্বাসের উৎস হয়ে উঠবে। মানসিক শক্তি বাড়ে তখনই, যখন মানুষ বারবার চাপের মুখে পড়ে, ভুল করে, আবার নিজেকে গুছিয়ে নেয়। এই প্রক্রিয়াই মানুষকে ভিতর থেকে দৃঢ় করে তোলে।

চাপমুক্ত জীবন বাস্তবসম্মত কোনো লক্ষ্য নয়। বরং চাপের মাঝেও নিজেকে স্থির রাখাটাই আধুনিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। কোপিং মেকানিজম মানে ছোট ছোট বাস্তবভিত্তিক কৌশলের সমষ্টি, যা মানসিক শক্তিকে ধীরে ধীরে দৃঢ় করে। চাপের সময় মানসিক শক্তি বৃদ্ধি মানে নিজের অনুভূতি বোঝা, সীমা মেনে নেওয়া এবং প্রয়োজনমতো সহায়তা গ্রহণ করা। এই সচেতনতা তৈরি হলে চাপ আর অপ্রতিরোধ্য থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের মানসিক পরিপক্বতার এক মহান শিক্ষক।

সম্পর্কিত নিউজ