{{ news.section.title }}
সরলতার জয়: ফরেস্ট গাম্পের দৌড় থেকে শেখার চিরন্তন পাঠ!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
কিছু গল্প সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের ভেতরে স্থায়ী আসন গড়ে নেয়। ভাষা, সংস্কৃতি বা প্রজন্মের সীমা ভেঙে সেই গল্প বারবার নতুনভাবে ধরা দেয়। ‘ফরেস্ট গাম্প’ ঠিক তেমনই একটি চলচ্চিত্র, যেখানে বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে সরলতা, আর কৌশলের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায় নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়।
চলচ্চিত্রটি দেখায় জীবন সবচেয়ে বুদ্ধিমান বা সবচেয়ে শক্তিশালীদের হাতেই সব সময় ধরা দেয় না। অনেক সময় জীবন এগিয়ে যায় তাদের হাত ধরে, যারা থেমে না গিয়ে শুধু সামনে চলতে জানে। ফরেস্ট গাম্প কোনো আদর্শ নায়ক নয়। তার নেই উচ্চ বুদ্ধিমত্তার দাবি, নেই আত্মবিশ্বাসী বক্তৃতা কিংবা কোনো জটিল পরিকল্পনা। শৈশব থেকেই তাকে দেখা হয় ভিন্ন হিসেবে। সমাজের চোখে সে দুর্বল, অক্ষম, সীমাবদ্ধ। কিন্তু গল্প যত এগোয়, তত স্পষ্ট হয়, এই সীমাবদ্ধতাই একসময় তার সবচেয়ে বড় শক্তিতে রূপ নেয়। কারণ ফরেস্ট জটিলভাবে ভাবতে জানে না, কিন্তু সে জানে মন দিয়ে কাজ করতে। সে জানে বিশ্বাস রাখতে, আর জানে থেমে যাওয়া ছাড়া শুধু দৌড়াতে ।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গভীর দিকটি হলো, এটি সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞার দিকে প্রশ্ন তোলে। আমরা সাধারণত সাফল্য বলতে বুঝি প্রতিযোগিতায় জেতা, অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়া বা নিজেকে প্রমাণ করা। কিন্তু ফরেস্ট গাম্পের সাফল্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল নয়। সে সফল হয় কারণ সে নিজের পথ থেকে সরে যায় না। কখনো কোনো প্রশ্ন না করেই, কোনো অভিযোগ না তুলেই, তার জীবনে যা কিছু আসে, তা সে গ্রহণ করে নেয়।
ফরেস্টের শৈশবেই এই দর্শনের বীজ রোপিত করা হয়। শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে বেড়ে ওঠা একটি শিশুকে সমাজ প্রায়ই করুণার চোখে দেখা হয়। কিন্তু ফরেস্টের জীবনে একটি সাধারণ বাক্য গভীর প্রভাব ফেলে আর তা হলো - দৌড়াও। এই দৌড়ানো কেবল শারীরিক নয়, এটি মানসিকও। দৌড়ানোর অর্থ হলো থেমে না যাওয়া। ভয়কে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। এই দৌড়ই একসময় তাকে খেলাধুলা, শিক্ষা, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত নিয়ে যায়। চলচ্চিত্রটি আমাদের দেখায়, অধ্যবসায় কোনো নাটকীয় গুণ নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সমষ্টি।
ফরেস্ট কোনো কাজ শুরু করলে সেটি শেষ না করা পর্যন্ত থামে না। সে দৌড়ায় কারণ তাকে বলা হয়েছে দৌড়াতে। সে টেবিল টেনিস খেলে কারণ সেটিই তার সামনে এসেছে। সে ব্যবসা করে কারণ সে বিশ্বাস করেছে। এই বিশ্বাস অন্ধ মনে হতে পারে, কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে চলচ্চিত্রের গভীর মানবিক বার্তা, কখনো কখনো অতিরিক্ত হিসাব না করে কাজ করাই জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ফরেস্ট গাম্পের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার সম্পর্কগুলো। সে মানুষকে বিচার করে না। তাদের অতীত, ভুল বা দুর্বলতা নিয়ে সে প্রশ্ন তোলে না। বিশেষ করে তার ভালোবাসা, যেটি কোনো নাটকীয় ঘোষণা বা দাবি দিয়ে গড়া নয়। এটি ধৈর্যের ভালোবাসা, অপেক্ষার ভালোবাসা। এখানে ভালোবাসা মানে পাওয়া নয়, বরং পাশে থাকা। এই ধারণা আধুনিক জীবনের দ্রুতগতির সম্পর্কে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ।
চলচ্চিত্রটিতে তুলে ধরা হয়, অধ্যবসায় কেবল কাজের ক্ষেত্রেই নয়, আবেগের ক্ষেত্রেও সমান জরুরি। ফরেস্ট বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে পারে, কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই। তার এই অপেক্ষা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং এটি তার মানসিক শক্তির পরিচয়। সে জানে না ভবিষ্যতে কী হবে, তবু সে বর্তমান থেকে সরে যায় না। এখানে চলচ্চিত্রটি ভাগ্য ও পরিশ্রমের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অনেক সময় ফরেস্টের জীবনে ঘটনাগুলো এমনভাবে ঘটে, যেন ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, ভাগ্যের দরজা খুললেও ভেতরে ঢোকার কাজটি করেছে ফরেস্ট নিজেই। সুযোগ আসে অনেকের জীবনেই, কিন্তু সবাই তা কাজে লাগাতে পারে না। ফরেস্ট পারে, কারণ সে পিছিয়ে যায় না।
ফরেস্ট গাম্প আমাদের আধুনিক জীবনের আরেকটি বড় অসুখের দিকেও ইঙ্গিত করে, তা হলো অতিরিক্ত জটিলতা। আমরা প্রায়ই সবকিছু বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কাজটাই করতে ভুলে যাই। ফরেস্ট বিশ্লেষণ করে না, কিন্তু সে কাজ করে। এই সরল কর্মনীতিই তাকে এমন সব জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে পৌঁছানোর স্বপ্ন অনেক বুদ্ধিমাননমানুষও দেখতে ভয় পায়।
চলচ্চিত্রটির শক্তিশালী আরেকটি দিক হলো, ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের মেলবন্ধন। ফরেস্টের চোখ দিয়ে আমরা সময়ের নানা বড় ঘটনা দেখি। কিন্তু সে এসব ঘটনার নায়ক হয়ে ওঠে না, সে থাকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু মহান ব্যক্তিদের দ্বারা তৈরি হয় না। অসংখ্য সাধারণ মানুষের নীরব অংশগ্রহণেই ইতিহাস এগিয়ে চলে।
ফরেস্ট গাম্প আসলে আত্মবিশ্বাসের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করে। সে কখনো নিজেকে বড় করে দেখে না, আবার ছোট করেও দেখে না। সে নিজেকে যেমন, তেমনই গ্রহণ করে। এই আত্মগ্রহণই তাকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। আধুনিক সময়ে, যেখানে মানুষ ক্রমাগত নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, সেখানে ফরেস্টের এই মনোভাব নিজের কাছে নিজের এক ধরনের মুক্তির বার্তা দেয়।
চলচ্চিত্রটি দেখার সময় অনেকেই ফরেস্টের সরলতাকে শিশুসুলভ ভাবতে পারেন। কিন্তু এই সরলতা আসলে এক ধরনের সাহস। সমাজের নিয়ম, প্রত্যাশা আর বিচার থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখা সহজ কাজ নয়। ফরেস্ট সেটি পারে, কারণ সে নিজেকে প্রমাণ করতে চায় না। সে কেবল নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে চায়।
এই গল্প আমাদের অধ্যবসায়ের শেখায় ভিন্ন ভাবে। অধ্যবসায় মানেই সব সময় জয় নয়। ফরেস্টের জীবনেও ব্যথা আছে, ক্ষতি আছে, না পাওয়ার কষ্ট আছে। কিন্তু সে সেসবকে জীবনের শেষ কথা বানায় না। সে এগিয়ে যায়, আবার দৌড়ায়। এই এগিয়ে যাওয়াই তাকে জীবিত রাখে, অর্থবহ রাখে।
আজকের দ্রুতগতির, ফলাফল-কেন্দ্রিক সমাজে ‘ফরেস্ট গাম্প’ যেন একটি থামার সংকেত। এটি বলে, সব সময় দ্রুত পৌঁছানোই সাফল্য নয়। কখনো কখনো পথেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে থাকে।
সরলতা মানে বোকামি নয়, আর অধ্যবসায় মানে অন্ধ পরিশ্রম নয়। এই দুটি মিলেই তৈরি হয় এমন এক জীবনদর্শন, যা মানুষকে ভেতর থেকে শক্ত করে।
চলচ্চিত্রটি শেষ হয়, কিন্তু এর বার্তা থেকে যায়। ফরেস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কখনো তা চকলেটের বাক্সের মতো, ভেতরে কী আছে, আগে থেকে জানা যায় না। কিন্তু সেই বাক্স খুলে নেওয়ার সাহস, আর ভেতরের স্বাদ গ্রহণ করার মানসিকতাই জীবনের আসল শিক্ষা।
সবশেষে বলা যায়, ‘ফরেস্ট গাম্প’ কোনো জটিল দর্শনের চলচ্চিত্র নয়, আবার এটি স্রেফ আবেগী গল্পও নয়। এটি একটি আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের ব্যস্ততা, জটিলতা আর অতিরিক্ত হিসাবের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সরল সত্যগুলো দেখতে পাই।