মোবাইলের নীল আলোয় ধীরে ধীরে কমছে দৃষ্টিশক্তি? জেনে নিন নিজেকে রক্ষার কার্যকরী উপায়

মোবাইলের নীল আলোয় ধীরে ধীরে কমছে দৃষ্টিশক্তি? জেনে নিন নিজেকে রক্ষার কার্যকরী উপায়
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

সূর্যের আলোর একটি স্বাভাবিক অংশ হলো নীল আলো, যা দিনের বেলা আমাদের সজাগ রাখে এবং মেজাজ ফুরফুরে রাখে। কিন্তু সূর্যাস্তের পর যখন আমরা কৃত্রিম উৎস, যেমন- স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা এলইডি (LED) লাইটের নীল আলোর সংস্পর্শে থাকি, তখন এটি আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান ছন্দের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

স্মার্টফোন এখন আমাদের হাতের এক্সটেনশন। ঘুম থেকে উঠে নোটিফিকেশন দেখা, কাজের ফাঁকে স্ক্রল, রাতে শুয়ে ভিডিও দেখা ইত্যাদি করে দিনের বড় অংশটাই কেটে যায় স্ক্রিনের সামনে। কিন্তু এই একটি  অভ্যাসের আড়ালেই আছে এক অদৃশ্য আলোকঝড়, ‘ব্লু লাইট’ বা নীল আলো। আমরা চোখে দেখি না তার ক্ষুদ্র তরঙ্গের আক্রমণ। কিন্তু আমাদের চোখের ভেতরের সূক্ষ্ম কোষগুলো ঠিকই টের পায় সেই চাপ। প্রশ্ন হলো এই নীল আলো ঠিক কীভাবে আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে প্রভাবিত করে?

ব্লু লাইট কি?

ব্লু লাইট মূলত দৃশ্যমান আলোর একটি অংশ, যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ৪০০–৫০০ ন্যানোমিটার। এই তরঙ্গ ছোট কিন্তু এর শক্তি অনেক বেশি। সূর্যালোকেও ব্লু লাইট আছে, কিন্তু সূর্যের আলো বিচ্ছুরিত ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যে থাকে। বিপত্তি ঘটে যখন কৃত্রিম LED স্ক্রিন অত্যন্ত কাছ থেকে, দীর্ঘ সময় ধরে এবং সরাসরি দেখা হয়। প্রাকৃতিক আলোর মতো নয়, স্ক্রিনের আলো স্থির, তীব্র, এবং চোখের ঠিক সামনে।

চোখের ভেতরে রয়েছে রেটিনা, একটি সংবেদনশীল স্তর, যেখানে আলো পড়ে ছবি তৈরি হয়। রেটিনার কোষগুলোর মধ্যে আছে ফটোরিসেপ্টর রড ও কন, আর তাদের পেছনে রয়েছে রেটিনাল পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম। এই কোষগুলো আলোর শক্তি শোষণ করে কাজ করে। ব্লু লাইটের উচ্চ-শক্তির ফোটন দীর্ঘ সময় ধরে এই কোষে পড়লে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়। সহজ ভাষায়, কোষের ভেতরে ক্ষতিকর রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিজ (ROS) বাড়ে, যা কোষের গঠন ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এই অক্সিডেটিভ চাপ রেটিনার কোষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নীল আলো RPE কোষে ক্ষয় ডেকে আনতে পারে, যা বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (AMD)-এর মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও শুধুমাত্র মোবাইল স্ক্রিনই AMD-এর একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্ক্রিন এক্সপোজার একটি সহায়ক ঝুঁকির উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে প্রথমেই যে সমস্যা চোখে পড়ে, তা হলো ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম। অনেকেই অভিযোগ করেন- চোখ জ্বালা, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা, চোখে চাপ, পানিশূন্যতা, এমনকি ঘাড়ে ব্যথা হওয়া নিয়ে । এর একটি বড় কারণ হলো স্ক্রিনের ব্লু লাইট ও দীর্ঘক্ষণ না পলক ফেলা। আমরা যখন স্ক্রিনে মনোযোগ দিই, স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় অর্ধেক পলক ফেলি। ফলে চোখের ওপরের অশ্রুস্তর শুকিয়ে যায়, তৈরি হয় ড্রাই আই সিনড্রোম।

ব্লু লাইটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে ঘুমের ওপর। আমাদের শরীরে একটি জৈবঘড়ি আছে সার্কাডিয়ান রিদম। এই ঘড়ি আলোর উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সন্ধ্যার পর অন্ধকার বাড়লে শরীর মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ করে, যা ঘুম আনে। কিন্তু রাতে মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলো চোখে পড়লে মস্তিষ্ক সেটিকে দিনের আলো ভেবে ভুল করে। ফলে মেলাটোনিন কম নিঃসৃত হয়, ঘুম আসতে দেরি হয়, ঘুমের মান খারাপ হয়। দীর্ঘদিন এভাবে চললে চোখের বিশ্রাম কমে যায়, দৃষ্টিশক্তির ক্লান্তি স্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। তাদের চোখের লেন্স স্বচ্ছতর, ফলে ব্লু লাইট সহজেই রেটিনায় পৌঁছে যায়। কিন্তু অনলাইন ক্লাস, গেম, ভিডিও সব মিলিয়ে স্ক্রিন টাইম যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। দীর্ঘমেয়াদে এই অতিরিক্ত এক্সপোজার চোখের বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে মায়োপিয়া বা কাছের জিনিস পরিষ্কার দেখা, দূরের ঝাপসা হওয়ার প্রবণতা বাড়াতে অবদান রাখতে পারে।

অনেকে ভাবেন, ব্লু লাইট মানেই সরাসরি অন্ধত্ব। বাস্তবতা একটু ভিন্ন। ব্লু লাইট তাৎক্ষণিকভাবে চোখ নষ্ট করে দেয় না। এটি ধীরে ধীরে চোখে চাপ সৃষ্টি করে, কোষের ওপর অক্সিডেটিভ প্রভাব ফেলে, ঘুম নষ্ট করে, চোখ শুকিয়ে দেয়, ক্লান্তি বাড়ায়, যা মিলেমিশে দৃষ্টিশক্তির সূক্ষ্ম অবনতি ঘটাতে পারে। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর কৌশল

​নীল আলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দেন। যেমন -

​১. ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলা। প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকা। এটি চোখের পেশিকে স্বস্তি  দেয়।

​২. স্ক্রিন টাইম ও দূরত্ব ঠিক রাখা। ​ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে সব ধরণের ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখুন। ​কম্পিউটার স্ক্রিন চোখের স্তর থেকে ১৫-২০ ডিগ্রি নিচে এবং ২০-২৮ ইঞ্চি দূরে রাখুন।

ফিল্টারিং লেন্স ও চশমা:

নীল আলো নিরোধক চশমা ব্যবহার করলে রেটিনার ওপর চাপের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। বর্তমানে অনেক স্মার্টফোন ও ল্যাপটপে নাইট মোড বা ব্লু-লাইট ফিল্টার অপশন থাকে, যা ব্যবহার করা জরুরি।

সঠিক আলো ও পরিবেশ:

কাজের জায়গায় ওভারহেড লাইট সরাসরি স্ক্রিনে যেন প্রতিফলন বা গ্লেয়ার তৈরি না করে সেদিকে খেয়াল রাখুন। চোখের পলক ঘন ঘন ফেলার অভ্যাস করুন যাতে কর্নিয়া আর্দ্র থাকে।

আমাদের চোখ এমন এক অঙ্গ, যা নীরবে কাজ করে যায়। ব্যথা না থাকলে আমরা বুঝতেই পারি না ভেতরে কী চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্লু লাইট সেই নীরব চাপের একটি বড় অংশ। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস যেমন- অন্ধকারে স্ক্রিন দেখা, দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রল, কম পলক ফেলা ইত্যাদি মিলেই চোখের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করে। প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে, কিন্তু চোখের জন্য তৈরি করেছে নতুন এক চ্যালেঞ্জ। তাই প্রযুক্তি ছাড়াই নয়, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চোখের যত্ন নেওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।


সম্পর্কিত নিউজ