{{ news.section.title }}
কোনো ট্যাবলেট নয়, মনের ওষুধ একটি শব্দেই! জানুন বিস্তারিত
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
তীব্র ব্যস্ততা, ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলে আধুনিক মানুষের জীবনকে করে তুলেছে বিষাদময়। উদ্বেগ আর খিটখিটে মেজাজ যখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আর এই সময় এসে, এই মানসিক ক্লান্তি দূর করার সবচেয়ে সহজ সমাধান যদি লুকিয়ে থাকে মাত্র একটি শব্দেই, তবে তা কতই না ভালো উপায়। সেই শব্দটি হলো ‘ধন্যবাদ’! শুনতে সাধারণ মনে হলেও, মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিয়মিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা 'গ্র্যাটিটিউড' চর্চা আমাদের মস্তিষ্কের রসায়ন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
কৃতজ্ঞতা বা গ্র্যাটিটিউড মূলত একধরনের মানসিক অনুশীলন। যখন কেউ আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ বলে, তখন সে নিজের মনোযোগ অভাব, ক্ষোভ বা তুলনার জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে, ফোকাস করে প্রাপ্তি, সহায়তা ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার দিকে। এই ফোকাস বদলানোই মূল চাবিকাঠি।।
মস্তিষ্কের ভেতরে এই পরিবর্তনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। কৃতজ্ঞতার অনুভূতি তৈরি হলে ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামের নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয়। ডোপামিন আমাদের আনন্দ ও প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত, আর সেরোটোনিন মেজাজ স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। সহজ কথায় বলতে গেলে ধন্যবাদ বলা মানে মস্তিষ্ককে সুখের একটি সংকেত পাঠানো। এই সংকেত বারবার পাঠালে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ইতিবাচক চিন্তার দিকে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের ওপর। কৃতজ্ঞতা চর্চা কর্টিসলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে, ফলে মানসিক চাপ কমে যায় অনেকাংশে। এতে করে শরীর-মন শিথিল হয়। যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাদের ঘুমের মান উন্নত হয়, উদ্বেগের মাত্রাও কম থাকে। এমন পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
‘ধন্যবাদ’ বলার আরেকটি শক্তি লুকিয়ে আছে আমাদের সম্পর্কেগুলোর ভেতরে। মানুষ যখন স্বীকৃতি পায়, তখন তার ভেতরে আত্মমর্যাদাবোধ বাড়ে। একটি সাধারণ ধন্যবাদ সহকর্মী, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর মনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই পারস্পরিক ইতিবাচকতা সম্পর্ককে উষ্ণ রাখে, ভুল বোঝাবুঝি কমায়, মানসিক নিরাপত্তা বাড়ায়। সামাজিক সংযোগ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অন্যতম এক রক্ষাকবচ।
মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে, ‘নেগেটিভিটি বায়াস’। আমাদের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই একটি খারাপ অভিজ্ঞতা দিনের ভালো মুহূর্তগুলোকে ঢেকে দেয়। কৃতজ্ঞতা চর্চা এই প্রবণতাকে ভেঙে দেয়। যখন কেউ প্রতিদিন অন্তত কয়েকটি বিষয়ে ধন্যবাদ ভাবতে বা বলতে শেখে, তখন মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ভালো দিকগুলো খুঁজে নিতে শুরু করে। কৃতজ্ঞতা কিন্তু শুধু অন্যকে বলা নয়, নিজের প্রতিও বলা যায়। যেমন- দিন শেষে মনে করা, আজ আমি কী কী ভালো পেয়েছি! কে আমাকে সাহায্য করেছে? আমি কী শিখেছি! এই আত্ম-সংলাপ মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন, যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতার তালিকা লেখেন বা ভাবেন, তাদের মধ্যে হতাশার উপসর্গ তুলনামূলক কম দেখা যায়। কারণ তারা জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো সচেতনভাবে উপলব্ধি করেন। এই উপলব্ধি মনকে স্থির রাখে, আশা জাগায়। এখানে একটি সূক্ষ্ম দিকও আছে। কৃতজ্ঞতা মানে সমস্যাকে একেবারে অস্বীকার করা নয়। উল্টো সমস্যার মাঝেও প্রাপ্তির জায়গাগুলো খুঁজে বের করে নেওয়া। এই মানসিকতা মানুষকে দৃঢ় করে এবং প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে সাহায্য করে। মানসিক সহনশীলতা গড়ে তুলতে কৃতজ্ঞতা বড় একটি ভূমিকা রাখে।
শিশুদের মধ্যে এই অভ্যাস গড়ে তুললে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। ছোটবেলা থেকে ধন্যবাদ বলতে শেখা মানে তাদের মধ্যে সহমর্মিতা, সম্মান ও ইতিবাচক চিন্তার বীজ বুনোন করে দেয়া। ফলে বড় হয়ে তারা সম্পর্ক, কাজ, সমাজ সব ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে।
ডিজিটাল যুগে আমরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিই, কিন্তু কমে গেছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। একটি বার্তা! একটি ইমেইল! একটি সাহায্য! সবকিছুকেই যেন খুবই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। অথচ একটি আন্তরিক ধন্যবাদ সেই যান্ত্রিকতার ভেতর মানবিক উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
কৃতজ্ঞতা চর্চা করতে লাগে না আলাদা সময়। দিনের শুরুতে বা শেষে কয়েক সেকেন্ড থেমে ভাবা যায়, আজ কিসের জন্য কৃতজ্ঞ! কার প্রতি কৃতজ্ঞ! এই ভাবনাটুকুনই মনের ভেতরে ইতিবাচক রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষমতা রাখে । সবচেয়ে বড় কথা, ধন্যবাদ বলার অভ্যাস মানুষকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে। অতীতের আফসোস বা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা থেকে সরিয়ে এনে বর্তমানের প্রাপ্তিতে মনোযোগী করে। এই উপস্থিতি মানসিক শান্তির বড় উৎস।।
তাই আমাদের প্রতিদিনের জীবনে যদি এই ছোট্ট একটি অভ্যাসট যুক্ত করা যায়, তবে হয়তো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা কোনো জটিল টনিকের দরকার পড়বে না। একটি শব্দই হয়ে উঠতে পারে মনের নিরব ওষুধ, ‘ধন্যবাদ’।