{{ news.section.title }}
লজ্জা নয়, সচেতনতা: যৌন স্বাস্থ্যের নীরব সংকেত চেনার উপায়
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আড়াল আর জড়তা কাজ করে, তা হলো যৌন স্বাস্থ্য। লোকলজ্জার ভয়ে আমরা একে এড়িয়ে চলি ঠিকই, কিন্তু সত্য এই যে, যৌন স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি একজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা, মানসিক ভারসাম্য এবং সুখী দাম্পত্য জীবনের একটি মূল ভিত্তি। সঠিক তথ্যের অভাবে এই নীরবতা অনেক সময় ডেকে আনে বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা ও মানসিক দূরত্ব।
যৌন সচেতনতা মানে হলো নিরাপদ আচরণ, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং নিজের শরীর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা। যখন সঠিক তথ্যের বদলে ভুল ধারণা বা কুসংস্কার প্রাধান্য পায়, তখনই সমাজে যৌনবাহিত রোগ (STD), অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের জন্য এই ‘ট্যাবু’ বা সামাজিক জড়তা ভাঙা এখন সময়ের দাবি। সম্পর্কের স্বচ্ছতা বজায় রাখা থেকে শুরু করে প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সচেতনতা জরুরি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের আলোকে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কেবল ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসই বাড়ায় না, একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনেও অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
যৌন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অসচেতনতা নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেমন- যৌন সংক্রামক রোগ, অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ, মানসিক চাপ, আত্মমর্যাদা হ্রাস, সম্পর্কের ভাঙন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, যৌন স্বাস্থ্য মানে কেবল রোগের অনুপস্থিতি নয়, এটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার একটি সমন্বিত রূপ।
শারীরিক স্বাস্থ্য :
যৌন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রধান শারীরিক দিকগুলোর মধ্যে আছে যৌন সংক্রামক রোগের (STD/STI) প্রতিরোধ। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV), এইডস (HIV), ক্ল্যামিডিয়া, গনোরিয়া ইত্যাদি রোগ প্রাথমিকভাবে লক্ষণহীন হলেও, চিকিৎসার অভাবে দীর্ঘমেয়াদে উর্বরতা, প্রস্রাবজনিত জটিলতা এবং আরও গুরুতর সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ যৌনচর্চা এবং কনডোমের ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজনন স্বাস্থ্যও যৌন স্বাস্থ্যকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ।মেয়েদের ক্ষেত্রে নিয়মিত গাইনোকলজিস্টের পরীক্ষা, মাসিক চক্রের সচেতনতা, হরমোন ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রজনন অঙ্গের সংক্রমণ প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষদের ক্ষেত্রে বীজাণু স্বাস্থ্য, প্রস্টেটের সমস্যা এবং যৌন কার্যক্ষমতা সচেতনভাবে নজর রাখা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্য:
যৌন স্বাস্থ্য মানে কেবল শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, এটি মানসিক ও আবেগগত দিককেও স্পর্শ করে। যৌন জীবনে সন্তুষ্টি, পারস্পরিক সম্মান, সঠিক তথ্য এবং স্বচ্ছ যোগাযোগ মানসিক স্বস্তি এবং সম্পর্কের স্থায়িত্বে ভূমিকা রাখে। যৌন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অজানা বা ভুল তথ্য মানসিক চাপ, গ্লানি এবং অবমূল্যায়নের জন্ম দিতে পারে। তাই প্রয়োজন শিক্ষা ও সচেতনতা।
সচেতনতা:
যৌন সচেতনতার মূল ভিত্তি হলো সঠিক তথ্য। শিশুকাল থেকেই প্রাপ্ত উপযুক্ত যৌন শিক্ষার মাধ্যমে, যেমন- শরীরের প্রাকৃতিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত সীমা, সম্মান ও সম্মতির ধারণা, যৌন সংক্রমণ ও গর্ভনিরোধের সঠিক ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ আত্মনির্ভরশীল ও নিরাপদ হতে পারে। অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্বাস্থ্যকর্মী এই শিক্ষার প্রেরক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
নিরাপদ অভ্যাস:
যৌন স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য নিরাপদ অভ্যাস অপরিহার্য। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কনডোম বা অন্যান্য নিরাপদ গর্ভনিরোধ পদ্ধতি, সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, এবং কোনো অস্বস্তিকর বা জোরপূর্বক পরিস্থিতি থেকে বিরত থাকা ইত্যাদির প্র্যাকটিস যৌন স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে। এছাড়া, অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্য যৌন আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ যৌনচর্চার দিকে পরিচালিত করতে পারে।
যৌন স্বাস্থ্য সচেতনতা মানে লজ্জা বা ভয়ের কারণে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া নয়। সমাজে খোলামেলা আলোচনা এবং স্বাস্থ্যসেবার অ্যাক্সেস বৃদ্ধি করলে মানুষ তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যুবসমাজের ক্ষেত্রে এই শিক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ অনভিজ্ঞতা এবং ভুল তথ্য তাদের ঝুঁকিতে ফেলে।
যৌন স্বাস্থ্য ও সচেতনতা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেয়। ব্যক্তিগতভাবে উর্বরতা রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ, মানসিক স্থিতি, সম্পর্কের শক্তি নিশ্চিত করে এবং সামাজিকভাবে যৌন সংক্রমণ কমানো, স্বাস্থ্যসেবা খরচ কমানো, সমানাধিকার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
যৌন স্বাস্থ্য ও সচেতনতা আমাদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক দিককে স্পর্শ করে। সঠিক শিক্ষা, নিরাপদ অভ্যাস, আলোচনা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাই পারে এক সুস্থ যৌন জীবন গড়ে তুলতে। যারা সচেতন থাকে, তারা কেবল নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করে না, বরং সম্পর্ক ও সমাজের স্বাস্থ্যেও অবদান রাখে। আজ থেকে যৌন স্বাস্থ্যকে লজ্জার নয়, সচেতনতার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করলে, আমরা স্বাস্থ্যবান, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল জীবনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাব।