ঋতুর সাথে মনের সম্পর্ক: সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের লক্ষণ ও সমাধান!

ঋতুর সাথে মনের সম্পর্ক: সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের লক্ষণ ও সমাধান!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

প্রকৃতিতে যখন কুয়াশা ঘনায় আর দিনের আলো ফুরিয়ে আসে দ্রুত, অনেকের মনের আকাশেও তখন জমা হয় মেঘ। শীতের এই সময়ে অকারণ মন খারাপ, সারাক্ষণ ক্লান্তি, ঘুম থেকে উঠতে অনীহা কিংবা কোনো কিছুতেই আগ্রহ খুঁজে না পাওয়া, অনেকের কাছেই স্রেফ আলস্য মনে হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর একটি সুনির্দিষ্ট নাম রয়েছে।তা হলো সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD)। এটি কেবল সাধারণ কোনো মুড অফ নয়, একটি বিশেষ ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার কী?
SAD হলো একটি প্রকারের ডিপ্রেশন যা মৌসুম অনুযায়ী আবর্তিত হয়। সাধারণত এটি শীতকালে বেশি দেখা যায়, তবে কম আলো বা বর্ষাকালেও দেখা যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দিনের আলো কমে যাওয়ার ফলে আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম এলোমেলো হয়ে যায়। পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাবে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং মেলাটোনিন হরমোনের আধিক্য দেখা দেয়। সেরোটোনিন আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, আর মেলাটোনিন নিয়ন্ত্রণ করে ঘুমের চক্র। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশেও ঋতু পরিবর্তনের সময় অনেকের মধ্যে এই লক্ষণগুলো প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

লক্ষণ:
⇨ দীর্ঘমেয়াদি মন খারাপ বা হতাশা।

⇨ অতিরিক্ত ঘুম বা অনিদ্রা।

⇨ খাদ্য অভ্যাসের পরিবর্তন, বিশেষ করে। কার্বোহাইড্রেটের প্রতি আকর্ষণ।

⇨ শক্তি হ্রাস, ক্লান্তি।

⇨ মনোযোগ কমে যাওয়া, আগ্রহ হারানো।

⇨ সামাজিকীকরণ কমে যাওয়া।

এই লক্ষণগুলো কিছু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। অফিস বা স্কুলে মনোযোগ কমে যায়, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর ফলে শারীরিক কার্যক্রমও হ্রাস পায়।

কারণ:
SAD-এর মূল কারণ হল আলোর ঘাটতি। তবে অনুরূপ কারণ হিসেবে মানসিক অবস্থা, পূর্ববর্তী ডিপ্রেশনের ইতিহাস, জিনগত প্রবণতা এবং ভিটামিন D-এর অভাবও বেশ প্রভাব ফেলে। মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারগুলো বিশেষ করে সেরোটোনিন যখন পর্যাপ্ত আলো পায় না, তখন মেজাজ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হযতে শুরু করে।


চিকিৎসা ও প্রতিকার:

⇨ লাইট থেরাপি: বিশেষ ধরনের উজ্জ্বল আলো (10,000 লাক্স) প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট ব্যবহার SAD-এর প্রধান চিকিৎসা হিসেবে কার্যকর।

⇨ সাইকোথেরাপি: কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) SAD-এ সহায়ক। মনকে নেতিবাচক চিন্তা থেকে সরিয়ে ইতিবাচক দিকের দিকে ফেরানো হয়।

⇨ ওষুধ: কিছু ক্ষেত্রে সেরোটোনিন পুনঃপ্রাপ্তি ইনহিবিটর (SSRIs) চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারেন।

⇨ লাইফস্টাইল পরিবর্তন: নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, এবং বাইরে সূর্যের আলো নেওয়া SAD হ্রাস করতে সাহায্য করে।

প্রতিরোধমূলক দিক:
⇨ শীতকালে সকালের আলো বা সূর্যের আলোতে বের হওয়া।

⇨ ঘরে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা।

⇨ নিয়মিত ব্যায়াম ও সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা।

⇨ খাদ্যে ভিটামিন D সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা শীতকালীন আলো কমার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৌসুমি বিষণ্ণতা অবহেলা করা উচিত নয়। নিয়মিত ব্যায়াম, আলোতে থাকা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন হলে লাইট থেরাপি SAD-এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ