মানুষের স্মৃতিশক্তি: ভুলে যাওয়ার প্রয়োজন, আর ভুল স্মৃতির বিস্ময়

মানুষের স্মৃতিশক্তি: ভুলে যাওয়ার প্রয়োজন, আর ভুল স্মৃতির বিস্ময়
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমরা মনে করি,আমরা যা দেখেছি বা শুনেছি, তা মস্তিষ্কে ঠিক সেভাবেই জমা হয়ে থাকে। কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মানুষের স্মৃতি কোনো ভিডিও রেকর্ডার নয়। এটি একটি সক্রিয় নির্মাণপ্রক্রিয়া। আমরা যখন কোনো ঘটনা মনে করি, তখন মস্তিষ্ক অতীতের তথ্য, বর্তমান অনুভূতি, বিশ্বাস, প্রত্যাশা এবং কল্পনা, সব মিলিয়ে সেই স্মৃতিকে নতুন করে গড়ে তোলে। ফলে স্মৃতির সঙ্গে ভুল-ভ্রান্তি থাকা অস্বাভাবিক কিছুই নয়, বরং স্বাভাবিক।

স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়াকে সাধারণত তিন ধাপে বোঝানো হয়।
১। সংগ্রহ

২। সংরক্ষণ এবং

৩। পুনরুদ্ধার।

কোনো দৃশ্য, শব্দ বা অনুভূতি প্রথমে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছে। মনোযোগ থাকলে সেটি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিতে আসে। সেখান থেকে ঘুম, পুনরাবৃত্তি ও অর্থপূর্ণ সংযোগের মাধ্যমে তা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপ নেয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় হিপোক্যাম্পাস নতুন স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর দীর্ঘদিন ধরে রাখতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে সেই স্মৃতি ছড়িয়ে যায়। এই ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই তৈরি হয় বদলে যাওয়ার সুযোগ।

আমাদের স্মৃতি আসলে স্থির কিছুই নয়। প্রতিবার মনে করার সময় সেটি আবার রেকনসোলিডেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। অর্থাৎ, সামান্য বদলে আবার জমা হয়। তাই একই ঘটনার স্মৃতি বছর ঘুরে বদলে যেতে পারে। আমরা ভাবি, আমরা একই ঘটনাকে মনে করছি। তবে বাস্তবে আমরা প্রতিবার একটু ভিন্ন সংস্করণ মনে করছি।

স্মৃতির বড় একটি সীমাবদ্ধতা হলো “false memory” বা ভুল স্মৃতি। কখনো আমরা এমন কিছু মনে রাখি, যা বাস্তবে ঘটেইনি। বারবার শোনা গল্প, অন্যের বর্ণনা, ছবি, কিংবা নিজের কল্পনা-এসবকিছু মিলিয়ে মস্তিষ্ক একটি কৃত্রিম স্মৃতি বানাতে পারে, যা আমাদের কাছে সত্যের মতো মনে হয়।

আরেকটি সাধারণ বিষয় হলো “memory distortion” বস স্মৃতি বিকৃতি। ঘটনার মূল অংশ ঠিক থাকলেও খুঁটিনাটি বদলে যায়। যেমন, কারও পোশাকের রং, ঘটনার সময়, কে কোথায় দাঁড়িয়েছিল ইত্যাদি ভুল হতে পারে। কারণ মস্তিষ্ক সব তথ্য সমানভাবে ধরে রাখে না। আবেগপূর্ণ অংশ বেশি ধরে রাখে, নিরপেক্ষ অংশ দ্রুত মুছে যায়।আবেগ স্মৃতিকে শক্তিশালীও করে, আবার বিকৃতও করে।

ভয়, আনন্দ, দুঃখ- এসব আবেগযুক্ত ঘটনা বেশি মনে থাকে। কিন্তু সেই আবেগ সময়ের সঙ্গে স্মৃতিকে রঙিন করে তোলে। সুখের স্মৃতি আরও সুন্দর, দুঃখের স্মৃতি আরও তীব্র মনে হতে পারে, যদিও বাস্তব ঘটনা ততটা ছিল না।

চাপ ও উদ্বেগ স্মৃতিতে বড় প্রভাব ফেলে। মাঝারি মাত্রার চাপ মনোযোগ বাড়িয়ে স্মৃতি শক্ত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস হিপোক্যাম্পাসের কার্যকারিতা কমিয়ে ফেলে। এতে করে নতুন স্মৃতি তৈরি দুর্বল হয়। ঘুমের অভাব স্মৃতি সংরক্ষণে বড় বাধা, কারণ গভীর ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক দিনের তথ্যগুলো সাজিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে পাঠায়।

ভুলে যাওয়া মস্তিষ্কের দুর্বলতা নয়। এটি একটি প্রয়োজনীয় ক্ষমতা। যদি আমরা জীবনের প্রতিটি

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা মনে রাখতাম, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য জায়গা থাকত না। তাই মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে দেয়। একে বলা হয় adaptive forgetting বা উপকারী ভুলে যাওয়া।

মনোযোগ স্মৃতির মূল চাবিকাঠি। মনোযোগ ছাড়া কোনো তথ্য সঠিকভাবে জমা হয় না। তাই মনোযোগহীনভাবে শোনা বা দেখা বিষয় দ্রুত ভুলে যাই আমরা। একই কারণে একসঙ্গে বহু কাজ করলেও স্মৃতি দুর্বল হতে শুরু করে।

স্মৃতির সঙ্গে আমাদের ভাষা ও অর্থের সম্পর্কও বেশ গভীর। যে তথ্যের অর্থ আমরা বুঝি, সেটি বেশি দিন মনে থাকে। শুধুই মুখস্থ করা তথ্য দ্রুত হারিয়ে যায়, কিন্তু অর্থপূর্ণভাবে শেখা তথ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে স্মৃতির কিছু পরিবর্তন হওয়াটাও স্বাভাবিক। নিয়মিত মানসিক চর্চা, পড়াশোনা, নতুন কিছু শেখা স্নায়ুসংযোগকে সক্রিয় রাখে এবং স্মৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার, সামাজিক যোগাযোগ, মানসিক চর্চা ইত্যাদি  কার্যকর। বিশেষ করে নতুন ভাষা শেখা, ধাঁধা সমাধান  মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।

মানুষের সাক্ষ্য বা বর্ণনায় স্মৃতির সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তার বর্ণনায় ভুল থাকতে পারে, কারণ স্মৃতি হুবহু নয়, পুনর্গঠিত।

মানুষের স্মৃতি আশ্চর্য হলেও নিখুঁত নয়। এটি অতীতকে ধরে রাখে, আবার সময়ের সঙ্গে বদলে দেয়। ভুলে যাওয়া, বদলে যাওয়া, নতুন করে মনে করা এসবকিছু মিলিয়েই স্মৃতি মানবিক। স্মৃতির এই অসম্পূর্ণতাই আমাদের শেখার, বদলানোর এবং নতুন করে বোঝার সুযোগ করে দেয়।


সম্পর্কিত নিউজ