আপনি কি ডিজিটাল আসক্তিতে ভুগছেন? স্ক্রিন টাইম কমানোর সহজ কৌশল

আপনি কি ডিজিটাল আসক্তিতে ভুগছেন? স্ক্রিন টাইম কমানোর সহজ কৌশল
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

রাত বাড়ে কিন্তু ঘুম আসে না। চোখ আটকে থাকে স্ক্রিনে, আঙুল থামে না কন্ট্রোলারে। আরেকটা লেভেল, আরেকটা ম্যাচ এরকম প্রতিশ্রুতির ফাঁদে সময় গলে যায়। ভোর হয়ে যায় অজান্তেই। সকালে ক্লাস, অফিস, পড়াশোনা সবই ক্লান্তির কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। আধুনিক জীবনের এই দৃশ্য এখন অনেক পরিবারের পরিচিত বাস্তবতা। গেমিং ও প্রযুক্তি-নির্ভরতা নিছক কোনো বিনোদন নয়। এটি ধীরে ধীরে আচরণ, মনোযোগ, ঘুম, আবেগ ও সম্পর্ককে বদলে দিচ্ছে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে, এবং  এর সাথে সাথে যোগাযোগ, শিক্ষা, কাজ, তথ্যপ্রাপ্তি সবকিছুই দ্রুততর হয়েছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা পরিণত হয় আসক্তিতে। বিশেষ করে অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও অসীম স্ক্রল এসবের নকশাই এমন যে, ব্যবহারকারীকে যতক্ষণ সম্ভব ধরে রাখে। পুরস্কার, নোটিফিকেশন, নতুন কনটেন্ট, লিডারবোর্ড সবকিছু মিলে তৈরি হয় এক অদৃশ্য টান, যা মস্তিষ্কের পুরস্কার-কেন্দ্রকে বারবার সক্রিয় করে।

গেমিং অ্যাডিকশনের বৈশিষ্ট্যগুলো সূক্ষ্ম কিন্তু বেশ স্পষ্ট। সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা, প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে রাখা, ঘুম কমে যাওয়া, বিরক্তি ও অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া, পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া এসব লক্ষণ একসাথে দেখা দিতে থাকে। অনেকেই মনে করেন, এসব তো চাইলেই বন্ধ করতে পারি। কিন্তু বন্ধ করতে গেলেই একধরনের অস্বস্তি, খিটখিটে ভাব এবং মন খারাপের ইঙ্গিত দেয়। ফলে তখন নিয়ন্ত্রণ আর পুরোপুরি নিজের হাতে থাকে না।

বিজ্ঞান বলছে, গেমিং বা দীর্ঘ স্ক্রিন-ব্যবহার মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমকে বারবার উত্তেজিত করে। ডোপামিন হলো সেই রাসায়নিক বার্তাবাহক, যা আনন্দ ও প্রেরণার অনুভূতি জাগায়। দ্রুত পুরস্কারের অভ্যাস গড়ে উঠলে, ধীর ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ। যেমন: পড়াশোনা, বই পড়া, দীর্ঘ মনোযোগের কাজগু,  আর আগের মতো আকর্ষণীয় লাগে না। ফলে মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যায়, একাগ্রতা ভেঙে যায়।

ঘুমের উপর এর প্রভাব অনেক গভীর। রাতের বেলা স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, যা ঘুমের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। দেরি করে ঘুমানো, ভোরে ওঠার কষ্ট, সারাদিন ক্লান্তি এগুলো দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, হতাশা এসবে সমস্যা বাড়তে থাকে।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। তাদের মস্তিষ্ক এখনো বিকাশমান। এসময় তাদের মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দক্ষতা ইত্যাদি  গড়ে ওঠার পর্যায়। অতিরিক্ত গেমিং এই স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, বাস্তব খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়া, একাকিত্ব বাড়া ইত্যাদি  লক্ষণগুলো  পরিবারকে সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়।

গেম বা প্রযুক্তি ব্যবহারই ক্ষতিকর নয়। ক্ষতিকর হয়ে উঠে তখনি, যখন ব্যবহার অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। সীমিত সময়ের গেমিং মনোযোগ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, হাত-চোখের সমন্বয় বাড়াতে পারে। এছাড়া  অনলাইন শিক্ষা, যোগাযোগের সুফল অস্বীকার করার কোনো সুযোগই নেই। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নিষেধ নয়,বরং সুষম ব্যবহার।

পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি সংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি। নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা, শোবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখা, পড়াশোনা বা কাজের সময় ফোন দূরে রাখা ইত্যাদি। এই ছোট নিয়মগুলো বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আচরণই বড় উদাহরণ। বড়রা যদি সারাক্ষণ ফোনে থাকেন, শিশুদের কাছে সেটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। নিজের জন্য ডিজিটাল বিরতি নেওয়া কার্যকর হতে পারে। দিনে কয়েকবার স্ক্রিন থেকে চোখ সরানো, বাইরে হাঁটা, বই পড়া, বাস্তব আড্ডা, মস্তিষ্ককে নতুন করে ভারসাম্য দেয়। নোটিফিকেশন কমিয়ে রাখা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ সরিয়ে দেওয়া, গেমিং সময় নির্দিষ্ট করা- এগুলো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করে।

কেউ যদি দেখেন, গেমিং বা স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক বা ঘুম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিৎ নয়। আচরণগত আসক্তি থেকেও বেরিয়ে আসা সম্ভব, তবে সচেতনতা ও ধারাবাহিক চর্চা দরকার। পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

দিন শেষে প্রশ্নটা যদি হয়- আমরা কি স্ক্রিনের বাইরে জীবনকে সময় দিচ্ছি? আর উত্তরটা যদি ‘না’ হয়, তবে সেটি আমাদের জন্য  একটি সতর্ক সংকেত।


সম্পর্কিত নিউজ