রজনীগন্ধা কি সত্যিই বাতাস পরিষ্কার করে?- বায়ু বিশুদ্ধের প্রাকৃতিক উপায়!

রজনীগন্ধা কি সত্যিই বাতাস পরিষ্কার করে?- বায়ু বিশুদ্ধের প্রাকৃতিক উপায়!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথেই যে সাদা ফুলগুলো তাদের সুবাসের ডালি মেলে ধরে, সেই রজনীগন্ধা বা নাইট কুইন নিয়ে বাঙালির মুগ্ধতার নেই কোনো শেষ। বহু যুগ ধরেই প্রচলিত আছে যে, ঘরে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা রাখলে তা বাতাসকে শুদ্ধ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি রজনীগন্ধা কোনো বিষাক্ত গ্যাস শুষে নিতে পারে? আধুনিক গবেষণাগারে এই ফুলের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু বিস্ময়কর তথ্য। রজনীগন্ধা যেন প্রকৃতির তৈরি এক প্রাকৃতিক মুড বুস্টার, যা আমাদের চারপাশের বায়ুমণ্ডলের চেয়েও বেশি আমাদের মনের কোণের বিষণ্ণতা দূর করতে সক্ষমতা রাখে। ঐতিহ্যের সুগন্ধ আর বিজ্ঞানের যুক্তির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হলো? চলুন রজনীগন্ধার সেই রহস্যময় ঘ্রাণের ভেতরে প্রবেশের এক রোমাঞ্চকর যাত্রা শুরু হোক আজ।

বিজ্ঞানীদের মতে, রজনীগন্ধার এই তথাকথিত বিশুদ্ধতা কোনো জাদুর চেরাগ তো নয়,কিন্তু এটি ঘ্রাণতত্ত্ব  এবং বায়ো-ফিল্টার প্রক্রিয়ার এক চমৎকার সংমিশ্রণ। বিজ্ঞান অনুযায়ী ঘরের বায়ু বিশুদ্ধ হওয়া মানে, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড (VOC), ধুলিকণা, অ্যালার্জেন, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকের উপস্থিতি কম থাকা। পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও স্বাভাবিক আর্দ্রতা থাকা। এই মানদণ্ডগুলো সাধারণত বায়ু চলাচল, বায়ু পরিশোধন যন্ত্র, সূর্যালোক, পরিচ্ছন্নতা ও গাছপালার উপস্থিতির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুলের সুগন্ধ বাতাসের রাসায়নিক উপাদান পরিবর্তন করে না। অর্থাৎ রজনীগন্ধা ঘরে রাখলে বাতাসে থাকা ক্ষতিকর গ্যাস বা ধুলিকণা সরাসরি কমে যায়, এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। কারণ বায়ুর অনুভূত বিশুদ্ধতা এবং বায়ুর রাসায়নিক বিশুদ্ধতা এক জিনিস নয়। রজনীগন্ধার তীব্র সুবাসে থাকা বিশেষ কিছু জৈব যৌগ কেবল ঘরের গুমোট গন্ধই দূর করে না, আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও এমন এক প্রভাব বিস্তার করে, যা রক্তে অক্সিজেনের শোষণ ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাতাস আসলে কতটা শুদ্ধ হলো তার চেয়েও বড় সত্য হলো,আমাদের শরীর সেই বাতাসকে আরও সতেজভাবে গ্রহণ করতে শুরু করে।

কেন রজনীগন্ধা ঘরকে সতেজ মনে হয়?
রজনীগন্ধার সুগন্ধ অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্থায়ী। এই গন্ধের মূল উৎস হলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্বায়ী জৈব যৌগ, যা বাতাসে মিশে যায় এবং দ্রুত আমাদের নাকের ঘ্রাণগ্রাহীতে পৌঁছে যায়। ঘ্রাণেন্দ্রিয় মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। যা আবার আবেগ, স্মৃতি ও প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে রজনীগন্ধার গন্ধ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং ঘরে এক ধরনের সতেজতার অনুভূতি তৈরি করে। বদ্ধ বা বাসি গন্ধকে আড়াল করে দেয়। মস্তিষ্ককে আরামদায়ক সংকেত পাঠায়। আর এরকারনেই আমরা মনে করি বাতাস পরিষ্কার হয়েছে। যদিও বাস্তবে বাতাসের গ্যাসীয় উপাদান পরিবর্তিত হয়না।

রজনীগন্ধার ডাঁটা সাধারণত পানিভর্তি পাত্রে রাখা হয়ে থাকে। এই পানির ধীর বাষ্পীভবন ঘরের আশেপাশের ক্ষুদ্র পরিবেশে আর্দ্রতা সামান্য বাড়াতে পারে। শুষ্ক ঘরে এই সামান্য আর্দ্রতা শ্বাস নিতে আরাম দেয়, ত্বক কম শুষ্ক লাগে, এবং ঘর কিছুটা নরম অনুভূত হয়। অনেক সময় এই পরিবর্তনও আমাদেরকে মনে করায় যে বাতাসের গুণগত মান উন্নত হয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, সুগন্ধ দূষণ দূর করে না। বরং অনেক সময় দুর্গন্ধকে ঢেকে দেয়। যেমন, বদ্ধ ঘরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে গেলেও রজনীগন্ধার গন্ধ সেই অস্বস্তি আড়াল করতে সক্ষম হয়। তাই শুধু ফুলের গন্ধের উপর নির্ভর করে বায়ু বিশুদ্ধতার ধারণা নেওয়াটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। জানালা খোলা, বাতাস চলাচল, পরিচ্ছন্নতা, এসবের বিকল্প কোনো সুগন্ধ নয়।

তাহলে রজনীগন্ধা রাখার উপকার কী?
রজনীগন্ধা ঘরে রাখার উপকারিতা তিনভাবে উপলব্ধি করা যায়-
১. মানসিক প্রশান্তি ও স্ট্রেস কমে। সুগন্ধ মস্তিষ্কে আরামদায়ক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।আর এটাই দীর্ঘদিন ধরে অ্যারোমাথেরাপিতে ফুলের গন্ধ ব্যবহার হওয়ার একটি কারণ।

২. ঘরের অনুভূত সতেজতা বৃদ্ধি করে। ঘরে প্রবেশ করেই একটি প্রাকৃতিক গন্ধ পাওয়া মানসিকভাবে জায়গাটিকে পরিষ্কার ও যত্নশীল মনে করায়।

৩. বাসি গন্ধ দূরীকরণে সহায়ক। রান্নাঘরের গন্ধ, আর্দ্রতা, বন্ধ ঘরের গুমোট ভাব, এসবকে অনেকটাই আড়াল করে দেয়।

কেন মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই বিশ্বাস ধরে রেখেছে?
গ্রামীণ বা শহুরে ঘরে বহুদিন ধরে সন্ধ্যায় ফুল রাখার একটি সংস্কৃতি চলে আসছে। বিদ্যুৎ না থাকাকালিন সময়, বদ্ধ পরিবেশ, রান্নার ধোঁয়া এসবের মধ্যে রজনীগন্ধার গন্ধ ঘরে এক অন্যরকম সতেজতা আনত। তাই এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুল না হলেও এর ব্যাখ্যা রাসায়নিকের চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত।


সম্পর্কিত নিউজ