ক্ষত নিরাময় থেকে হরমোন নিয়ন্ত্রণ, কেন ছোট এই খনিজটি আমাদের শরীরের সুপারহিরো?

ক্ষত নিরাময় থেকে হরমোন নিয়ন্ত্রণ, কেন ছোট এই খনিজটি আমাদের শরীরের সুপারহিরো?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শরীর একটু খারাপ লাগলেই আমরা বড় কোনো রোগ বা জটিল ওষুধের কথা চিন্তা করে বসে থাকি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের শরীরের ভেতরে শত শত জৈবপ্রক্রিয়া সচল রাখতে কাজ করে যাচ্ছে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি খনিজ উপাদান? যার নাম হলো জিঙ্ক! পরিমাণে খুব সামান্য প্রয়োজন হলেও, এর অনুপস্থিতিতে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে শুরু করে কোষের বৃদ্ধি, সবই থমকে যেতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে জিঙ্ককে বলা হয় শরীরের সাইলেন্ট সুপারহিরো। আজকাল সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি দূর করতে জিঙ্ক ট্যাবলেটের জনপ্রিয়তা বেশ বেড়েছে। কিন্তু আপনি কি জানেন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জিঙ্ক সেবনও আপনার শরীরের অন্য খনিজের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে? কারা জিঙ্ক খাবেন, কেন খাবেন এবং ঠিক কতটা পরিমাণে খাওয়া নিরাপদ, সেই ব্যাখ্যা ও সাবধানতা নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদন।

জিঙ্ক হলো একটি অত্যাবশ্যক ট্রেস এলিমেন্ট। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের শরীরের ৩০০ এরও বেশি এনজাইম বা পাচক রস সক্রিয় রাখতে জিঙ্ক খুবই অপরিহার্য। ডিএনএ তৈরি, দ্রুত ক্ষত নিরাময়, স্বাদ ও ঘ্রাণশক্তি অটুট রাখা এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এর কোনো বিকল্প নেই। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়টা হলো, আমাদের শরীর এই অতি প্রয়োজনীয় উপাদানটি নিজে নিজে তৈরি করতে পারে না, আবার এটি দীর্ঘ সময় জমাও রাখতে পারে না। তাই প্রতিদিনের খাবার থেকেই আমাদের জিঙ্কের জোগান নিশ্চিত করতে হয়।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় জিঙ্কের ভূমিকা সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয়। শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বজায় রাখতে জিঙ্ক অপরিহার্য। জিঙ্কের ঘাটতি হলে শরীর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই যাদের ঘনঘন সর্দি-কাশি হয়, সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয়, বা সামান্য অসুখও সহজে সারতে চায় না, তাদের ক্ষেত্রে জিঙ্কের ঘাটতি একটি সম্ভাব্য কারণ হতেই পারে। শিশুদের যখন ডায়রিয়া হয়, তখন স্বল্পমেয়াদি জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট, রোগের সময়কাল কমাতে সহায়তা করে থাকে, এটি বহু গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত।

ত্বকের সুস্থতায়ও জিঙ্কের ভূমিকা বেশ গভীর। ব্রণ বা একনে সমস্যায় জিঙ্ক প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং সেবাম বা তেল নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ক্ষত দ্রুত শুকানো, নতুন ত্বক কোষ তৈরি, এমনকি সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষাতেও জিঙ্ক ভূমিকা রাখে। এ কারণেই অনেক ত্বক-চিকিৎসা পণ্যে জিঙ্ক থাকে। দীর্ঘদিন ক্ষত না শুকানো, ত্বক রুক্ষ হয়ে যাওয়া, সহজে সংক্রমণ হওয়া, এসব লক্ষণ জিঙ্ক ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

চুলের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও জিঙ্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। চুলের ফলিকল বা গোড়ার কোষ বিভাজনের জন্য জিঙ্ক দরকার। ঘাটতি হলে চুল পাতলা হয়ে যায়, দ্রুত পড়ে যায়, মাথার ত্বকে প্রদাহ দেখা দেয়। অনেক সময় অকারণে চুল পড়ার পেছনে জিঙ্কের ঘাটতি একটি গোপন কারণ হয়ে থাকে।

শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশের ক্ষেত্রে জিঙ্ক অপরিহার্য একটি  উপাদান। জিঙ্কের অভাবে শিশুদের উচ্চতা বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়,অনেক সময় মনোযোগ কমে যায়। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের কোষ বিভাজন ও অঙ্গ গঠনে জিঙ্কের প্রয়োজন হয়, তাই গর্ভবতী মায়েদের পর্যাপ্ত জিঙ্ক গ্রহণ জরুরি।

স্বাদ ও গন্ধ অনুভূতির সঙ্গেও জিঙ্কের সম্পর্ক রয়েছে। জিঙ্কের অভাব হলে খাবারের স্বাদ কম লাগে, মুখে অরুচি তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এমন থাকলে অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে। পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যেও জিঙ্কের ভূমিকা রয়েছে। টেস্টোস্টেরন হরমোনের ভারসাম্য ও শুক্রাণুর গুণগত মান বজায় রাখতে জিঙ্ক সহায়ক। জিঙ্কের ঘাটতি থাকলে প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।

তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিঙ্ক খেলে উল্টো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত জিঙ্ক বমিভাব, পেটের সমস্যা, মাথা ঘোরা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রায় জিঙ্ক খেলে শরীরে কপার ঘাটতি তৈরি হয়, যা রক্তাল্পতা ও স্নায়বিক জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রায় জিঙ্ক গ্রহণ নিরাপদ নয়।

প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক জিঙ্কের চাহিদা সাধারণত ৮–১১ মিলিগ্রাম হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ৪০ মিলিগ্রামের বেশি গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় মাল্টিভিটামিনেও জিঙ্ক থাকে, তার ওপর আলাদা ট্যাবলেট খেলে মাত্রা অজান্তেই বেড়ে যায়।

আর তাই খাদ্য থেকেই জিঙ্ক পাওয়া সবচেয়ে ভালো উপায়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বাদাম, ডাল, বীজ, পূর্ণ শস্য ইত্যাদি খাবারে জিঙ্ক রয়েছে। তবে শস্য ও ডালে থাকা ফাইটেট জিঙ্ক শোষণে বাধা প্রদান করে, তাই নিরামিষভোজীদের মধ্যে ঘাটতির ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।

কখন জিঙ্ক ট্যাবলেট প্রয়োজন হতে পারে? 
ঘনঘন সংক্রমণ, ক্ষত সারতে দেরি, দীর্ঘদিন অরুচি, শিশুদের বৃদ্ধি কমে যাওয়া, ত্বক বা চুলের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে, পরীক্ষার ভিত্তিতে জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে।

তবে জিঙ্ক ট্যাবলেট কোনো শর্টকাট নয়। এটি এমন একটি পুষ্টি উপাদান, যা সঠিক মাত্রায় থাকলে শরীরের ভেতরের অসংখ্য প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খলভাবে চলতে সাহায্য করে। অভাব যেমন ক্ষতিকর, অতিরিক্তও তেমনি বিপজ্জনক। কারণ জিঙ্কের শক্তি পরিমাণে নয়, সঠিক ভারসাম্যে নির্ধারিত।


সম্পর্কিত নিউজ