মহাবিশ্বের বিবর্তনে মহাজাগতিক সংঘর্ষের অজানা তথ্য!

মহাবিশ্বের বিবর্তনে মহাজাগতিক সংঘর্ষের অজানা তথ্য!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

রাতে আকাশের দিকে তাকালে আমরা যে অসংখ্য তারা দেখি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বিস্ময়কর এক দৃশ্য আর তা হলো, গ্যালাক্সির মহাযাত্রা। কোটি কোটি তারা, গ্যাস, ধূলিকণা আর অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার নিয়ে গঠিত এই গ্যালাক্সিগুলো স্থির নয়। তারা চলমান এবং পরস্পরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কখনো বা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। শুনতে ধ্বংসের গল্প মনে হলেও, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন পর্যবেক্ষণ বলছে, গ্যালাক্সির সংঘর্ষ আসলে সৃষ্টির, রূপান্তরের এবং মহাবিশ্বের বিবর্তনের এক গভীর শিক্ষণীয় অধ্যায়।

একটি গ্যালাক্সি মানে কিন্তু শুধু তারা না, এটি একটি গতিশীল মহাজাগতিক শহর। আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই আছে প্রায় শত শত বিলিয়ন তারা। এর পাশেই অ্যান্ড্রোমিডা,আরেকটি বিশাল গ্যালাক্সি,যা আবার ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, কয়েক বিলিয়ন বছর পরে হলেও এই দুই গ্যালাক্সির মধ্যে সংঘর্ষ হবে। কিন্তু এই সংঘর্ষ মানে সিনেমার মতো আগুনে বিস্ফোরণ নয়। এটি হবে ধীর, দীর্ঘ, জটিল এক নৃত্য, যেখানে তারা একে অপরকে এড়িয়ে যাবে, কিন্তু গ্যাস ও ধূলির বিশাল মেঘ একত্রিত হয়ে নতুন তারার জন্ম দেবে।

গ্যালাক্সির সংঘর্ষ নিয়ে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো এসেছে অত্যাধুনিক মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা এখন দেখতে পাচ্ছেন, যখন দুটি গ্যালাক্সি একে অপরের ভেতর দিয়ে যায়, তখন তাদের গ্যাসীয় অংশগুলো প্রবলভাবে মিশে যায়। এই সংঘর্ষে গ্যাস সংকুচিত হয়, তাপমাত্রা বাড়ে, এবং সেই সংকোচন থেকেই দ্রুত হারে নতুন তারা জন্ম নেয়। একে স্টারবার্স্ট বলে, অর্থাৎ তারার হঠাৎ বিস্ফোরণময় জন্ম। অবাক করা বিষয় হলো, গ্যালাক্সির অধিকাংশ অংশই থাকে ফাঁকা। তারাগুলোর মধ্যে দূরত্ব এত বেশি যে সরাসরি তারা-তারা সংঘর্ষ প্রায় অসম্ভব। কিন্তু গ্যাস মেঘের সংঘর্ষই আসল পরিবর্তন ঘটায়। এই গ্যাসীয় সংঘর্ষের ফলে শুধু নতুন তারা নয়, নতুন গ্রহমণ্ডলেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়। অর্থাৎ, যে সংঘর্ষকে আমরা ধ্বংস মনে করে থাকি, সেটি ই ভবিষ্যতের সৌরজগতের বীজ বপন করে। গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও বিশাল এক পরিবর্তন ঘটে। প্রায় সব বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই থাকে একটি অতিভারী ব্ল্যাক হোল। যখন দুটি গ্যালাক্সি মিলিত হয়,তখন তাদের ব্ল্যাক হোলও ধীরে ধীরে নিকটে আসে এবং একসময় একীভূত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মহাশক্তিশালী মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরি হয়, যা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা গ্যালাক্সি সংঘর্ষের নতুন প্রমাণ দিচ্ছে।

সংঘর্ষের ফলে গ্যালাক্সির আকার-আকৃতিও বদলে যায়। সর্পিল গ্যালাক্সি সংঘর্ষের পর অনেক সময় উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিতে রূপ নেয়। অর্থাৎ, গ্যালাক্সির রূপান্তরও এই সংঘর্ষের ফল। মহাবিশ্বে যে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি দেখা যায়, তার বড় একটি কারণ এই সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার ইতিহাস। এই ঘটনাগুলো আমাদের মহাবিশ্বের অতীত বুঝতে সাহায্য করে। আজ যে বিশাল গ্যালাক্সিগুলো আমরা দেখি, তারা একসময় ছোট ছোট গ্যালাক্সির সমষ্টি ছিল। ধীরে ধীরে সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার মাধ্যমে তারা বড় হয়েছে। একে বলা হয় গ্যালাক্টিক ইভোলিউশন বা গ্যালাক্সির বিবর্তন।

মজার বিষয় হলো, আমাদের মিল্কিওয়েও অতীতে অনেক ছোট ছোট গ্যালাক্সিকে গ্রাস করেছে। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে, তারাদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে। কিছু তারা মিল্কিওয়ের সাধারণ গতির সঙ্গে মেলে না, যা ইঙ্গিত দেয় যে  তারা একসময় অন্য গ্যালাক্সির অংশ ছিল।

গ্যালাক্সি সংঘর্ষ আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, তা হলো মহাবিশ্বের পরিবর্তনই একমাত্র স্থায়ী বিষয়। স্থির মনে হলেও, সবকিছুই চলমান, পরিবর্তনশীল, রূপান্তরশীল। ধ্বংস ও সৃষ্টি একই প্রক্রিয়ার অংশ। এই সংঘর্ষের ফলে কখনো কখনো গ্যালাক্সির লম্বা টেইল বা লেজের মতো অংশ তৈরি হয়, যা কোটি আলোকবর্ষ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। এগুলো হলো ছিটকে যাওয়া গ্যাস ও তারা, যা আবার নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে এই সংঘর্ষের ভবিষ্যৎও দেখছেন। মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রোমিডার ভবিষ্যৎ সংঘর্ষের মডেল তৈরি করে দেখা গেছে, কয়েক বিলিয়ন বছর পর তারা মিলিত হয়ে একটি নতুন, বৃহৎ গ্যালাক্সি তৈরি করবে। এই নতুন গ্যালাক্সির আকার হবে ভিন্ন, কিন্তু এর ভেতরে তারার জন্ম অব্যাহত থাকবে।

সংঘর্ষ মানেই শেষ নয়। বরং তা নতুন শুরুর পথ তৈরি করে। মহাজাগতিক স্তরে যা ঘটে, তার প্রতিফলন আমরা প্রকৃতিতেও দেখি। বন আগুনের পরে নতুন গাছ জন্মায়, আগ্নেয়গিরির লাভা ঠান্ডা হয়ে উর্বর মাটি তৈরি করে। গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও একই নীতি কাজ করে।

গ্যালাক্সি সংঘর্ষের গবেষণা আমাদের ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিচ্ছে। সংঘর্ষের সময় গ্যালাক্সির দৃশ্যমান অংশের সঙ্গে অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের আচরণ তুলনা করে বিজ্ঞানীরা এর বৈশিষ্ট্য বোঝার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে বলাই যায় যে, গ্যালাক্সির সংঘর্ষ কোনো বিশৃঙ্খলার কাহিনী নয়, এটি মহাবিশ্বের দীর্ঘ বিবর্তনের খুবই স্বাভাবিক এক অধ্যায়। এখানে ধ্বংস ও সৃষ্টি একসঙ্গে ঘটে, পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরি হয়।রাতের আকাশে যে তারা জ্বলছে, তাদের অনেকেই হয়তো এমনi কোনো গ্যালাক্সি সংঘর্ষের ফল। অর্থাৎ, আমাদের অস্তিত্বের পেছনেও রয়েছে এমনই এক মহাজাগতিক সংঘর্ষের ইতিহাস।


সম্পর্কিত নিউজ