{{ news.section.title }}
বর্তমান ছেলেরা কেন গোপন রাখছে তাদের ‘বডি ইমেজ’ সংকট?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
“ছেলেরা এসব নিয়ে ভাববে কেন?”সমাজের এই একতরফা ধারণাই কি কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুরুষদের জন্য! আমাদের চারপাশে এমন হাজার হাজার তরুণ আছেন যারা জিমের ভারি ওজন তোলার চেয়েও বেশি ভার নিজের মনের ভেতর বইছেন। পেশিহীন শরীর, উচ্চতা বা গায়ের রঙ নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই যে দীর্ঘশ্বাস তারা ফেলছেন, তার নামই হলো বডি ডিসমরফিয়া। এটি একটি নিঃশব্দ লড়াই, যা সমাজ দেখে না, আর ছেলেরাও মুখ ফুটে বলতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টারড জীবনে সিক্স-প্যাক আর সুঠাম দেহের যে মাপকাঠি তৈরি হয়েছে, তা কি আমাদের প্রজন্মকে এক গভীর হীনম্মন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? কেন আজকের কিশোররা নিজের স্বাভাবিক শরীরকে গ্রহণ করতে লজ্জা পাচ্ছে? এই মানসিক সংকটের শিকড় কত গভীরে এবং কেনই বা এই নীরবতা ভাঙা জরুরি?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছেলেদের এই মানসিক লড়াই নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে এখন। পুরুষ মানেই কঠোর বা আবেগহীন নয়। আমাদের সকলের এই ভুল ধারণার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে তাদের শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা। নিজের শরীরকে ভালোবাসার লড়াইটা ছেলেদের জন্য কতটা কঠিন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে এই সংকটকে উসকে দিচ্ছে, তা নিয়েই আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন।
কৈশোরে হরমোনজনিত পরিবর্তনের সময় ছেলেদের শরীরে পরিবর্তন আসে খুব দ্রুত। কারও দ্রুত পেশি গড়ে ওঠে, কারও ধীরে। কারও মুখে ব্রণ, কারও উচ্চতা কম, কারও ওজন বেশি। এই স্বাভাবিক জৈব বৈচিত্র্যকে অনেকেই দেখতে শুরু করে ত্রুটি হিসেবে । বন্ধুদের মন্তব্য, পরিবারের অজান্তে করা তুলনা, স্কুল-কলেজের ঠাট্টা এসব যেন কিশোর মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে হয়তো সে যথেষ্ট ভালো নয়। এই মানসিক চাপ ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ক্ষয় করতে শুরু করে। অনেকেই জিমে অতিরিক্ত সময় কাটাতে শুরু করে, দ্রুত পেশি বানানোর জন্য অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লিমেন্ট বা স্টেরয়েড ব্যবহার করে। কেউ কেউ খাবার কমিয়ে দেয়, আবার কেউ অতিরিক্ত খেয়ে স্থূলতার চক্রে পড়ে যায়। অর্থাৎ, শরীর নিয়ে অস্বস্তি থেকে আচরণগত সমস্যার জন্ম হয়।
বডি ইমেজ ইস্যুর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিজের শরীর নিয়ে অতিরিক্ত অসন্তুষ্ট, তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, এমনকি আত্মহানির চিন্তাও বাড়তে পারে। কিন্তু ছেলেরা সাধারণত অনুভূতি প্রকাশে অনাগ্রহী হওয়ায় সমস্যা দীর্ঘদিন অদৃশ্য থাকে।
গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনও অনেক ক্ষেত্রে এই সংকটকে বাড়িয়ে দেয়। সিনেমা, সিরিজ, বিজ্ঞাপনে আদর্শ পুরুষ হিসেবে যে শরীর দেখানো হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার বাইরে। কিশোর-তরুণরা সেটিকেই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে নিজের শরীরকে ভাবতে শুরু করে অস্বাভাবিক হিসেবে। এ সমস্যা শুধু পেশি বা ওজন নয়। উচ্চতা, ত্বকের রং, চুলের ঘনত্ব, মুখের গঠন ইত্যাদি সবকিছুই এর আওতায় পড়ে। অনেকেই নিজের ত্বকের রং নিয়ে লজ্জা পায়, কেউ টাক পড়া নিয়ে ভোগে, কেউ কম উচ্চতা নিয়ে সামাজিক অস্বস্তিতে থাকে।
সমাধানের শুরু সচেতনতা থেকে। প্রথমত, শরীরের বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়াটা জরুরি। প্রত্যেক মানুষের জেনেটিক গঠন আলাদা হবে এবং এটিই স্বাভাবিক। এটি কোনো প্রতিযোগিতা নয়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক মাধ্যমে দেখা ছবিগুলো যে বাস্তবের পুরো প্রতিচ্ছবি নয়, সেটি বোঝা প্রয়োজন। অনেক ছবিই ফিল্টার, আলো, ভঙ্গি ও সম্পাদনার ফল। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেদের শরীর নিয়ে ঠাট্টা, তুলনা বা মন্তব্য তাদের মনে গভীর দাগ ফেলে। বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য ও মানসিক সুস্থতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যাদের মধ্যে এই সমস্যা তীব্র, তাদের কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া দরকার। কারণ বডি ইমেজ ইস্যু শুধু বাহ্যিক নয়, এটি আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মানের সঙ্গে জড়িত।সবচেয়ে বড় কথা, শক্তিশালী হওয়া মানে শুধু পেশি নয়, নিজেকে গ্রহণ করার সাহসও শক্তির অংশ। ছেলেদের জন্যও দরকার সেই বার্তা-“তুমি যেমন, তেমনটাই যথেষ্ট।”
আয়নায় দেখা শরীরটিই সব নয়। তার ভেতরে থাকা মানুষটিই আসল। আর সেই মানুষকে সম্মান করতে শিখলেই শরীর নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সংকট ধীরে ধীরে ম্লান হতে পারে।