ইউতান পোলুও, ৩,০০০ বছরে একবার ফোটা সেই রহস্যময় ফুলের সত্যতা উন্মোচন!

ইউতান পোলুও, ৩,০০০ বছরে একবার ফোটা সেই রহস্যময় ফুলের সত্যতা উন্মোচন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ইন্টারনেটে প্রায়ই কিছু অতিপ্রাকৃত ছবি আমাদের নজর কেড়ে নেয়! জানালার কাঁচ, স্টিলের রড কিংবা গাছের পাতায় ঝুলে আছে সাদা সুতোর মতো সরু কিছু বস্তু, যার মাথায় আবার ভোরের শিশিরের মতো বিন্দু। দাবি করা হয় যে, এটিই সেই অতি দুর্লভ ইউতান পোলুও (Youtan Poluo) ফুল, যা বৌদ্ধ পুরাণ অনুসারে প্রতি তিন হাজার বছরে একবারই ফোটে। এই ফুলের দেখা পাওয়া মানেই নাকি কোনো মহান ব্যক্তির আগমন বা পরম সৌভাগ্যের লক্ষণ। কিন্তু বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে যখন এই অলৌকিক ফুলকে আনা হলো, তখন বেরিয়ে এলো এক অবিশ্বাস্য সত্য!

আসলেই কি কোনো ফুল মাটি ছাড়া ধাতব বস্তুর ওপর ফুটতে পারে? 
চীনা ভাষায় ইউতান পোলুও (Udumbara/ Youtan Poluo) শব্দটির উৎস প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থে। সেখানে বলা আছে, এক পবিত্র সময়ের আগমনী বার্তা দিতে আকাশ থেকে নেমে আসে এক বিরল ফুল, যা হাজার হাজার বছরে একবার ফুটে। এই বর্ণনার প্রতীকী হলো, আধ্যাত্মিক জাগরণ ও শুভ সময়ের ইঙ্গিত। তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা! যে ক্ষুদ্র সাদা গঠনগুলোকে ইউতান পোলুও ফুল বলা হচ্ছে, সেগুলোর আকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রতিটি একটি লম্বা, চুলের মতো সূক্ষ্ম ডাঁটার মাথায় বসানো ডিমের মতো বিন্দু। এগুলো সাধারণত পাতার কিনারা, দেয়াল, ধাতব জিনিস, এমনকি প্লাস্টিকের ওপরও দেখা যায়। অর্থাৎ, এগুলো মাটিতে জন্মানো কোনো উদ্ভিদ নয়। এগুলোর শিকড় নেই, পাতা নেই, ফুলের স্বাভাবিক গঠনও নেই। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা যাকে রহস্যময় ফুল ভেবে ভুল করছেন, তা নাকি আসলে কোনো উদ্ভিদই নয়

তাহলে এগুলো কি?
কীটতত্ত্ববিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এগুলো আসলে গ্রিন লেসউইং নামক এক ধরনের পোকামাকড়ের ডিম। লেসউইং একটি উপকারী পোকা, যা এফিড বা ক্ষতিকর ছোট পোকা খেয়ে বাগানের উপকার করে। এই পোকা তার ডিমগুলোকে অত্যন্ত কৌশলী উপায়ে প্রতিটি ডিমকে একটি সূক্ষ্ম ডাঁটার মাথায় ঝুলিয়ে রাখে, যাতে অন্য পোকা বা শিকারি সহজে ডিম খেতে না পারে। দূর থেকে সেগুলোকে অনেকটা ছোট ছোট সাদা ফুলের মতোই দেখতে লাগে।

এই ডিমগুলোর রং সাদা বা হালকা ক্রিম, আকারও খুব ছোট হয়।খালি চোখে দেখলে অনেকটা ফুলের কুঁড়ির মতো মনে হতে পারে। আর ঠিক এই ভ্রম থেকেই জন্ম নিয়েছে রহস্যময় ফুলের ধারণাটি।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এই ডিমগুলো খুব অল্প সময় থাকে। কয়েক দিনের মধ্যে এগুলো ফুটে লার্ভা বের হয়ে যায়। তাই হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায়, আবার অল্প সময়েই হারিয়েও যায়। আর এই ক্ষণস্থায়ীত্বই মানুষের মনে অলৌকিক অনুভূতি তৈরি করেছে।

আরেকটি বিষয় এই বিভ্রান্তিকে বাড়িয়েছে, এই ডিমগুলো যে কোনো পৃষ্ঠে দেখা যেতে পারে। দেয়াল, লোহা, প্লাস্টিক, কাঁচ ইত্যাদি যেখানে সেখানেই। ফুল হলে তা মাটি, ডাল বা গাছের সঙ্গে যুক্ত থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এই গঠনগুলোর, কোনো শিকড় বা উদ্ভিদগত সংযোগ নেই।

তাহলে “৩,০০০ বছরে একবার ফোটা ফুল” কথাটি এলো কোথা থেকে?
এটি মূলত প্রাচীন ধর্মীয় রূপক। বৌদ্ধ সাহিত্য Udumbara-কে ব্যবহার করেছে বিরল ও পবিত্র ঘটনার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু ইন্টারনেট যুগে সেই প্রতীকী বর্ণনাকে বাস্তব ছবি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে, যা ভুল ধারণা তৈরি করেছে।

বিজ্ঞানীরা যখন এই ছবিগুলো পরীক্ষা করেন, তখন তারা স্পষ্টভাবে লেসউইং ডিমের গঠন শনাক্ত করতে পারেন। মাইক্রোস্কোপে দেখলে ডিমের খোলস, ভেতরের ভ্রূণীয় গঠন,সবই কীটের ডিমের বৈশিষ্ট্যই বহন করে।

মজার বিষয় হলো, এই লেসউইং পোকা পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই রয়েছে। তাই ইউতান পোলুও নামে প্রচারিত এই বস্তু শুধু চীনেই নয়, পৃথিবীর নানান দেশের মানুষই খুঁজে পেয়েছেন।

এই ঘটনার শিক্ষা হলো, সব অদ্ভুত জিনিসই অলৌকিক নয়। অনেক সময় প্রকৃতির সূক্ষ্ম কোনো প্রক্রিয়া আমাদের চোখে অজানা বলে রহস্যময় মনে হয়। ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়ার গতি এত দ্রুত যে, একটি ভুল ব্যাখ্যাই মুহূর্তে কিংবদন্তি হয়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞান সেই কৌতূহলকে বিশ্লেষণ করে বাস্তব ব্যাখ্যা তুলে ধরে।

এখানে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক দিক কাজ করে। মানুষ বিরল ও রহস্যময় বিষয় বিশ্বাস করতে পছন্দ করে। “৩,০০০ বছরে একবার”,এই বাক্যটি কল্পনাকে নাড়া দেয়। ফলে যাচাই না করেই অনেকেই বিশ্বাস করে ফেলেন।

তবে এও সত্য, এই ঘটনার পেছনে থাকা লেসউইং পোকাটি পরিবেশের জন্য বেশ উপকারী। আর যাকে আমরা রহস্যময় ফুল ভাবছি, সেটি আসলে প্রকৃতির একটি সুরক্ষা কৌশল মাত্র।


সম্পর্কিত নিউজ