কোলাজেন থেকে রোগপ্রতিরোধে ভিটামিন সি যেভাবে কাজ করে নীরবে!

কোলাজেন থেকে রোগপ্রতিরোধে ভিটামিন সি যেভাবে কাজ করে নীরবে!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমাদের শরীরটা যেন একটি ২৪ ঘণ্টার ব্যস্ত কারখানা। এখানে দূষণ, সূর্যের তেজ আর মানসিক চাপের বিরুদ্ধে কোষগুলোকে লড়তে হয় প্রতি সেকেন্ডে। এই অদৃশ্য যুদ্ধে কোষের প্রধান সেনাপতি হিসেবে কাজ করে যে পুষ্টি উপাদানটি, তার নাম হলো ভিটামিন সি। অনেকেই ভাবেন এটি কেবল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় বা সর্দি-কাশি কমায়, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ভিটামিন সি শরীরের এক অন্যতম আর্কিটেক্ট এবং গার্ডিয়ান। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া কি নিরাপদ? নাকি প্রাকৃতিক উৎসই সেরা? ভিটামিন সি-এর এই জাদুকরী জগত এবং এর সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে আজকের এই প্রতিবেদনটিতে।

ভিটামিন সিএর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি পানিতে দ্রবণীয়। আমাদের শরীর একে স্টোর বা জমিয়ে রাখতে পারে না। অর্থাৎ, আপনি আজ যা খেলেন, তা কালকের জন্য বরাদ্দ থাকবে না। তাই প্রতিদিনের ডায়েট থেকেই একে সংগ্রহ করতে হয়।

কিন্তু কেন এটি এত জরুরি?
এর ভূমিকা শুধুমাত্র ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং ত্বকের উজ্জ্বলতা বা তারুণ্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কোলাজেন তৈরি থেকে শুরু করে, শারীরিক ক্ষত দ্রুত সারানো, হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত রাখা এবং খাবারের আয়রনকে রক্তে শোষণে সাহায্য করাতেও ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ। ​এমনকি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন হৃদরোগ বা ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুরুত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে।

কোষের ভেতরের অদৃশ্য ঢাল!
শরীরে প্রতিনিয়ত দূষণ, মানসিক চাপ, রোদ আর ধূমপানের ফলে তৈরি হয় ক্ষতিকর ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল। এই ফ্রি-র‌্যাডিক্যালগুলো কোষের প্রোটিন এমনকি ডিএন-এরও ক্ষতি সাধন করতে পারে। ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলোকে নিরপেক্ষ করে দেয়, যা কোষের স্বাভাবিক কাজ সচল রাখে।

ত্বকের টানটান ভাব!
কোলাজেন হলো শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যা হাড়, রক্তনালি এবং ত্বককে মজবুত রাখে। ভিটামিন সি ছাড়া কোলাজেন তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই শরীরে এই ভিটামিনের অভাব হলে ত্বক কুঁচকে যায় এবং শুষ্ক হয়ে পড়ে। এছাড়া ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগে। এমনকি মাড়ি থেকে রক্তপাত ও দাঁত দুর্বল হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

উজ্জ্বলতা নয়, কাঠামোগত সৌন্দর্য!

ত্বকে ভিটামিন সি মেলানিন উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে হাইপারপিগমেন্টেশন বা কালো দাগ কমায়। তবে এর আসল শক্তি হলো ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ফিরিয়ে আনা। এটি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সৃষ্ট ক্ষতি আংশিকভাবে কমায় এবং ত্বককে ভেতর থেকে প্রাণবন্ত রাখে।

চুলের গোড়ায় বাড়তি পুষ্টি!
ভিটামিন সি রক্তনালির দেয়াল মজবুত রেখে মাথায় রক্তসঞ্চালন বাড়ায়। এছাড়া এটি আয়রন শোষণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে  চুল পড়া কমে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ চুলকে অকালে পেকে যাওয়া থেকেও রক্ষা করে।

উৎস ও প্রয়োজনীয়তা:
ভিটামিন সি-র জন্য সাপ্লিমেন্টের চেয়ে প্রাকৃতিক উৎস অনেক বেশি কার্যকর।

এর সেরা উৎস হলো - আমলকি, পেয়ারা, লেবু, কমলা, কাঁচা মরিচ, ব্রকলি ও স্ট্রবেরি।

তবে রয়েছে কিছু সতর্কতাও। তাপ লাগলে ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়, তাই ফলমূল কাঁচা বা সবজি অল্প সেদ্ধ করে খাওয়া উত্তম।

গ্রহনের মাত্রার দিকেও নজর রাখা জরুরি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৭৫-৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি প্রয়োজন।

রূপচর্চায় ভিটামিন সি সিরাম!
বর্তমানে ভিটামিন সি সিরাম বেশ জনপ্রিয়। তবে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিত। যেমন-

⇨ ১০-২০% ঘনত্বের সিরাম বেছে নিন।

⇨ এটি আলো ও বাতাসে দ্রুত নষ্ট হয়, তাই গাঢ় রঙের বোতলে রাখা নিশ্চিত করুন।

⇨ সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নিন।

উজ্জ্বলতার মোহে না পড়ে শরীরকে ভেতর থেকে মজবুত রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তত একটি টক জাতীয় ফল রাখার অভ্যাস করা আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত। মনে রাখবেন, বাহ্যিক উজ্জ্বলতার চেয়ে শরীরের ভেতরের কাঠামো মজবুত রাখাই ভিটামিন সি-র আসল শক্তি।


সম্পর্কিত নিউজ