মানুষের মনে কেন জন্মায় অন্যের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা?

মানুষের মনে কেন জন্মায় অন্যের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

রাস্তার পাশের এক অচেনা মানুষকে হঠাৎ হোঁচট খেতে দেখে আপনিও শিউরে উঠলেন, কিংবা প্রিয় বন্ধুর চোখের পানি দেখে নিজের অজান্তেই আপনার গলা ভারী হয়ে এলো! কেন হয় এমন ? যার সাথে আপনার নেই কোনো রক্তের সম্পর্ক, এমনকি যার নামও হয়তো আপনি জানেন না, তার কষ্ট কেন আপনার স্নায়ুতে তোলে প্রতিধ্বনি? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কেবল নিছক আবেগ নয় বরং এটি আমাদের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অস্ত্র, যার নাম হলো সহানুভূতি।

একা নয়, একসাথে বাঁচার কৌশল!
আদিমকাল থেকেই মানুষ হলো দলবদ্ধ প্রাণী। একা টিকে থাকা কঠিন। দলেই নিরাপত্তা, খাদ্য, সন্তান লালন, বিপদ মোকাবিলাও সহজ। যে দল একে অন্যের খোঁজ নিয়েছে, আহতকে সাহায্য করেছে, শিশুকে সুরক্ষা দিয়েছে, সেই দলই টিকে থেকেছে বেশি। ফলে সহানুভূতি ও দয়া নৈতিক গুণের পাশাপাশি টিকে থাকার কৌশলও। প্রজন্মের পর প্রজন্মে এই প্রবণতা বাছাই হয়ে মানুষের স্বভাবের অংশ হয়ে উঠেছে।

অন্যের কষ্ট নিজের ভেতরে অনুভব করার মানবিক এই ক্ষমতার পেছনে রয়েছে বিবর্তন আর বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর রসায়ন। আমাদের মস্তিষ্কে লুকিয়ে আছে এমনই এক বিশেষ কোষ, যাকে বিজ্ঞানীরা মিরর নিউরন বলে থাকেন। এটি আমাদের মস্তিষ্কের  আয়নাস্বরূপ। যখন আমরা অন্য কাউকে কোনো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে দেখি, এই নিউরনগুলো এমনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে যেন সেই ঘটনাটি আমাদের সাথেই ঘটছে।

এছাড়া অক্সিটোসিনের মতো হরমোন সামাজিক বন্ধন ও আস্থাকে বাড়ায়। ফলে সহানুভূতির অনুভূতি শুধু চিন্তায় নয়, দেহের রাসায়নিক সাড়াতেও গাঁথা।

শিশু জন্মের পর প্রথমে নিজের চাহিদাই বোঝে। ধীরে ধীরে পরিবার, যত্ন, আদর, ভাষা ইত্যাদির মাধ্যমে সে চিনতে শেখে অন্যের অনুভূতিকে। সে কাঁদলে মা যেমন সাড়া দেন, সেই অভিজ্ঞতা শিশুর ভেতরে একটি নকশা তৈরি করে ফেলে, সে ভাবতে শিখে কষ্ট মানেই সাড়া দেওয়া। বড় হতে হতে গল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্মীয়-নৈতিক বোধ ইত্যাদি সব মিলিয়ে অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করা শেখে মানুষ। এই কল্পনার ক্ষমতাই সহানুভূতির মানসিক ভিত্তি!

সহানুভূতিই আমাদের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। পরিবারে, বন্ধুত্বে এমনকি সমাজে, দয়া ও করুণা আমাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। যে সমাজে মানুষ একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, সেখানে সহযোগিতা বাড়ে এবং সংঘাত কমে। দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ছুটে যাওয়া, রক্তদান, অচেনা কাউকে সাহায্য ইত্যাদি  আচরণ সমাজকে স্থিতিশীল করে।

অন্যকে সাহায্য করলে মানুষের ভেতরে এক ধরনের তৃপ্তি জন্ম নেয়। মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থাও এতে সক্রিয় হয়ে উঠে। অর্থাৎ দয়া করা কেবল দায়িত্ববোধই নয়, এক ধরনের মানসিক পুরস্কারও দিয়ে থাকে। তাই সহানুভূতি ও দয়া নৈতিকতার পাশাপাশি আনন্দের উৎসও বটে।

তবে মানুষ সবসময় সমানভাবে সহানুভূতিশীল থাকতে পারে না। ভয়, পক্ষপাত, ক্লান্তি, অতিরিক্ত তথ্যের চাপ ইত্যাদি সহানুভূতির সাড়া কমিয়ে দিতে পারে। কখনও কম্প্যাশন ফ্যাটিগ হয়, অর্থাৎ অতিরিক্ত দুঃখের খবর শুনতে শুনতে মন অসাড় হয়ে যায়। তাই সহানুভূতি টিকিয়ে রাখতে সচেতন চর্চা দরকার, দরকার শোনা, বোঝা এবং সময় দেওয়া।

চর্চায় বাড়ে সহানুভূতি!
গবেষণায় দেখা যায়, ধ্যান, মনোযোগী শ্রবণ, সাহিত্য-পাঠ, বাস্তব অভিজ্ঞতা এসব মানুষের মধ্যে  সহানুভূতির ক্ষমতা বাড়ায়। যখন আমরা মনোযোগ দিয়ে কারও কথা শুনি, বিচার না করে বুঝতে চেষ্টা করি, তখন মস্তিষ্কের সেই অনুরণন আরও বেশিতীক্ষ্ণ হয়।

সহানুভূতি ও দয়া মানুষের কোনো বিলাসিতা নয়,বরং অস্তিত্বের ভিত্তি। বিবর্তন আমাদের শিখিয়েছে একসাথে বাঁচতে, মস্তিষ্ক দিয়েছে অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা, আর সমাজ শিখিয়েছে সেই অনুভূতিকে কাজে রূপ দিতে। তাই অন্যের ব্যথায় কেঁদে ওঠা মন মানেই দুর্বলতা নয়,এটি মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।


সম্পর্কিত নিউজ