{{ news.section.title }}
জেমস ওয়েব কি তবে ভিনগ্রহের প্রাণের সুবাস পেয়েছে?
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছে, আমরা কি এই মহাবিশ্বে একা? আমাদের মতো নীল আকাশ, অক্সিজেন আর মেঘের আনাগোনা কি অন্য কোনো গ্রহেও আছে? এতদিন এই প্রশ্ন কেবল কল্পবিজ্ঞানের পাতায় ছিল। কিন্তু জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) মহাকাশ বিজ্ঞানের সেই চেনা সমীকরণকে বদলে দিয়েছে। কয়েক আলোকবর্ষ দূরে থাকা কোনো এক এক্সোপ্ল্যানেট বা ভিনগ্রহের বায়ুমণ্ডলে ঠিক কী কী গ্যাস মিশে আছে, তা জেমস ওয়েবের সৌজন্যে এখন একেবারে আমাদের হাতের মুঠোয়।
কীভাবে দূর গ্রহের বায়ুমণ্ডল দেখা সম্ভব?
এক্সোপ্ল্যানেট সরাসরি দেখা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কারণ, তারা নিজে আলো দেয় না। নক্ষত্রের আলোয় আড়াল হয়ে থাকে। জেমস ওয়েব শুধু ছবি তোলে না, এটি আসলে মহাজাগতিক এক কেমিস্ট। বিজ্ঞানীরা ট্রানজিট স্পেকট্রোস্কপি নামক এক কৌশল ব্যবহার করেন। যখন কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো সেই গ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আমাদের কাছে আসে। জেমস ওয়েবের অতি-সংবেদনশীল ইনফ্রারেড চোখ সেই আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে সেখানে পানি, মিথেন নাকি কার্বন-ডাই-অক্সাইড আছে, যা আগের টেলিস্কোপগুলোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। একে বায়ো-সিগনেচার বা প্রাণের রাসায়নিক স্বাক্ষর খোঁজার লড়াই বলা হচ্ছে।
ওয়েব টেলিস্কোপ WASP-39b নামের একটি গ্যাসীয় বৃহৎ গ্রহের বায়ুমণ্ডলে স্পষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) শনাক্ত করেছে। এটি ছিল প্রথমবার, যখন কোনো এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডলে এত পরিষ্কারভাবে CO₂ ধরা পড়ে। এর মানে হলো এখন আমরা দূর গ্রহের কার্বন রসায়ন বোঝার পথে প্রবেশ করেছি। গ্রহের জন্ম, গঠন, এবং উপাদানগত ইতিহাস সম্পর্কে এই তথ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
আরও কয়েকটি গ্রহের ক্ষেত্রে ওয়েব জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি দেখিয়েছে। এমনকি বায়ুমণ্ডলে মেঘ ও কুয়াশার ইঙ্গিতও দেখিয়েছে। আগে ধারণা করা হতো, এসব সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য এত দূর থেকে ধরা যাবে না। কিন্তু ওয়েব দেখিয়েছে, গ্রহের আকাশও, তার স্তর, মেঘের ঘনত্ব, কণার প্রকৃতি পর্যন্ত অনুমান করা সম্ভব।
কেন ইনফ্রারেড এত গুরুত্বপূর্ণ?
বেশিরভাগ গ্যাস ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যে স্বতন্ত্র শোষণচিহ্ন রেখে যায়। ওয়েবের বিশাল আয়না ও শীতল অবস্থা তাকে ইনফ্রারেডে অত্যন্ত সংবেদনশীল করেছে। ফলে ক্ষীণ সিগন্যালও ধরা পড়ে। এই প্রযুক্তিগত সুবিধাই এক্সোপ্ল্যানেট বায়ুমণ্ডল গবেষণায় বিপ্লব এনেছে।
বায়ুমণ্ডলের উপাদান দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, গ্রহটির অবস্থান কোথায় ও কীভাবে তৈরি হয়েছে। কার্বন, অক্সিজেন, সালফারের অনুপাত, মেঘের প্রকৃতি ইত্যাদি থেকে গ্রহের গঠন ইতিহাস, এমনকি তার কক্ষপথের বিবর্তন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
যদি এখনো পর্যন্ত যেসব গ্রহে এসব গ্যাস ধরা পড়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই হট জুপিটার। অর্থাৎ অত্যন্ত উত্তপ্ত, জীবনের অনুপযোগী। তবু এই সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে যে,এই পদ্ধতিটি কাজ করে।ভবিষ্যতে ছোট, পাথুরে, তুলনামূলক শীতল গ্রহ, যাদের হ্যাবিটেবল জোন-এ পাওয়া যায়, সেগুলোর বায়ুমণ্ডলও একইভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। তখন অক্সিজেন, মিথেন, ওজোনের মতো সম্ভাব্য জৈব-ইঙ্গিত খোঁজা বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে।
ওয়েবের ডেটায় গ্যাস এর সাথে সাথে, বায়ুমণ্ডলের মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতিরও ইঙ্গিত মিলেছে। এর মানে, আমরা এখন গ্রহের আবহাওয়া নিয়েও প্রাথমিক ধারণা পাচ্ছি। দূর আকাশে আবহাওয়ার পাঠ, এক নতুন অধ্যায়।
প্রযুক্তি থেকে দর্শন!
এই আবিষ্কার কেবল প্রযুক্তিগত নয়, দার্শনিকও। কারণ, প্রথমবারের মতো মানুষ এমন গ্রহের আকাশের রাসায়নিক চিহ্ন পড়ছে, যা আলোকবর্ষ দূরে। অর্থাৎ, আমাদের অনুসন্ধান আর শুধু গ্রহের সংখ্যা গোনা নয়, তাদের পরিবেশ বোঝার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
জেমস ওয়েব এখনো তার মিশনের প্রাথমিক পর্যায়ে। সামনে আরও ছোট, শীতল, পাথুরে এক্সোপ্ল্যানেটের দিকে নজর দেওয়া হবে। একই পদ্ধতিতে তাদের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করা হলে, পৃথিবীর মতো গ্রহের সম্ভাবনা সম্পর্কে বাস্তব তথ্য মিলতে পারে।