{{ news.section.title }}
আপনার বারবার বকাঝকাই কি শিশুর ভবিষ্যৎ আইকিউ কমিয়ে দিচ্ছে?- গবেষণার ফলাফল
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
প্রতিটি মা বাবাই চান তার সন্তান সুশৃঙ্খল এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠুক। এই চাওয়া থেকেই শাসন, ধমক বা কঠোর নির্দেশগুলো আসে। কিন্তু শাসনের সেই দেয়াল যে কখন পার হয়ে মানসিক আঘাত বা ট্রমায় রূপ নিয়ে নেয়, তা অনেকেই বুঝতে পারে না। আপনি কি জানেন, আপনার দেওয়া একটি কঠোর তিরস্কার, জনসমক্ষে করা অপমান শিশুর কোমল মস্তিষ্কে ঠিক কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন সংশোধন আর ভালোবাসার চেয়েও ভয় আর অপমান বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিশুর মস্তিষ্ক শেখার কাজ বন্ধ করে দেয় দেয় এবং কেবল টিকে থাকার লড়াই শুরু করে।
স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া কিভাবে সক্রিয় হয়?
মানবদেহে বিপদের ইঙ্গিত পেলে একটি সমন্বিত স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া কাজ করে। এতে স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোন ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস ও সতর্কতা বাড়িয়ে দেয়। স্বল্পমেয়াদে এটি উপকারী হলেও একই প্রতিক্রিয়া যদি ঘনঘন সক্রিয় থাকে, তবে সেটি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। একটি শিশু যখন নিয়মিত তিরস্কার শোনে, তার মস্তিষ্ক সেই শব্দ ও ভঙ্গিকে বিপদের সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করে নেয়। এর ফলে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন বারবার নিঃসৃত হয় এবং দেহ-মন দীর্ঘসময় উচ্চ সতর্কতায় থাকে।
মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় প্রভাব:
শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশে মস্তিষ্কের যে অংশ পরিকল্পনা, যুক্তি, মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ সামলায়, সেটি দক্ষভাবে কাজ করে। অন্যদিকে, ভয় ও তীব্র আবেগের কেন্দ্র তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে। কিন্তু ভয়ভিত্তিক পরিবেশে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। আবেগ ও ভয়ের কেন্দ্র অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর যুক্তিনির্ভর অংশ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হয় এবং নতুন বিষয় শেখায় অনীহা কাজ করে। আবার আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, যেমন- হঠাৎ রাগ, কান্না, অস্থিরতা দেখা দেয়।
আচরণগত পরিবর্তনের দ্বিমুখী রূপ:
তিরস্কারের প্রভাবে থাকে শিশু সাধারণত দুই ধরনের আচরণ প্রদর্শন করে।
১। চুপচাপ, সংকুচিত, প্রশ্নহীন হয়ে পড়ে। ভুলের ভয়ে নতুন কিছু চেষ্টা করতে চায় না।
২। অস্থির, জেদী বা আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।
উভয় ক্ষেত্রেই অন্তর্নিহিত কারণ কিন্তু একই আর তা হলো নিরাপত্তাহীনতা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।
আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের ক্ষয়!
প্রতিনিয়ত বা বারবার তিরস্কার শিশুর মনে একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি করে ফেলে যে সে হয়তো যথেষ্ট সক্ষম নয়। ভুল মানেই তিরস্কার, এইরকম বিশ্বাস তার শেখার আগ্রহকে কমিয়ে দেয়। কৌতূহল, যা শেখার প্রধান চালিকাশক্তি, তা ভয়ভিত্তিক পরিবেশে সঙ্কুচিত হয়। ফলে শিশুটি ঝুঁকি নিতে চায় না, প্রশ্ন করতে ভয় পায়, এবং নিজেকে প্রকাশেও অনীহা দেখায়।
ঘুম, শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য ও দৈনন্দিন কার্যকারিতা!
দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা ঘুমের ছন্দ ব্যাহত করে। অস্থির ঘুম, দুঃস্বপ্ন, খাওয়ার অনিয়ম ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শরীর যখন পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না, তখন মনোযোগ, স্মৃতি ও আচরণ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে দৈনন্দিন কাজেও অদক্ষতা দেখা যায়, যা আবার তিরস্কারের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তৈরি হয় একটি নেতিবাচক চক্রের।
ভাষা ও ভঙ্গির গুরুত্ব!
একই ভুল নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দুই ভিন্ন ফল তৈরি করে থাকে।
“তুমি এমন কেন?”,এইরক। প্রশ্নগুলো ব্যক্তিত্বে আঘাত করে।
আর অন্যদিকে, “এটা কীভাবে ঠিক করা যায়?”,এই ধরনের প্রশ্নগুলো সমস্যার সমাধানে ধীরে ধীরে শিশুকে অংশীদার করে তোলে।
প্রথমটি মস্তিষ্কে হুমকির সংকেত প্রেরণ করে আর দ্বিতীয়টি শেখার সংকেত জাগায়। শাসনের প্রয়োজন থাকলেও, শাসনের ভঙ্গি ও ভাষা নির্ধারণ করে সেটি ভয়ের উৎস হবে, না শেখার সহায়ক হবে।
নিরাপত্তাবোধ ও শেখার সম্পর্ক!
যেখানে শিশুকে তার অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়, সেখানে ভুল থেকেও শেখা দ্রুততর হয়। কারণ সে জানে, ভুল করলে তাকে অপমান করা হবে না,বরং বোঝানো হবে। এই নিরাপত্তাবোধ মস্তিষ্ককে স্বাভাবিক ছন্দে কাজ করতে সাহায্য করে, এবং শেখার প্রক্রিয়াও সক্রিয় থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব:
শৈশবের ভয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও বহন হতে পারে। অতিরিক্ত উদ্বেগ, সিদ্ধান্ত নিতে ভয়, সামাজিক পরিস্থিতিতে সংকোচ, ভুলের আতঙ্কে কাজ পিছিয়ে দেওয়া ইত্যাদি আচরণের শিকড় অনেক সময় সেই শৈশবেই গড়ে ওঠে, যখন তিরস্কারই ছিল তার একটি নিয়মিত অভিজ্ঞতা।
করণীয়:
☞ অতিরিক্ত রাগের মুহূর্তে সময় নেওয়া এবং পরে শান্তভাবে কথা বলা।
☞ ব্যক্তিত্ব নয়, আচরণ নিয়ে আলোচনা করা।
☞ ভুলের কারণ বোঝা ও বিকল্প পথ দেখানো।
☞ শিশুর বক্তব্য শোনা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
☞ ছোট অগ্রগতিতেও উৎসাহ দেওয়া।
এই পদ্ধতিগুলো মস্তিষ্কে নিরাপত্তা ও সহযোগিতার সংকেত পাঠায়, যা শেখা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক।
একটি শিশুর কাছে তার পরিবারই সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয় যদি বারবার তিরস্কারের মাধ্যমে ভয়ের উৎসে পরিণত হয়, তবে তার মস্তিষ্ক স্থায়ী সতর্কতায় আটকে যায়। ফলে, শেখা, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাস সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শাসনের উদ্দেশ্য যদি সংশোধন ও শেখানো হয়, তবে তার ভাষা ও ভঙ্গিও হতে হবে সহমর্মিতাপূর্ণ।