টয়লেটে ২ মিনিটের বেশি সময় লাগলে কি পিত্তথলিতে পাথর হয়? ভাইরাল দাবির সত্যতা!

টয়লেটে ২ মিনিটের বেশি সময় লাগলে কি পিত্তথলিতে পাথর হয়? ভাইরাল দাবির সত্যতা!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্ক্রল করলেই ইদানীং একটি ভয় জাগানো স্বাস্থ্য পরামর্শ চোখের সামনে পড়ে। আর তা হলো টয়লেটে বা মলত্যাগে ২ থেকে ৩ মিনিটের বেশি সময় লাগা মানেই নাকি পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে! সেকেন্ডের মধ্যে কয়েক হাজার বার শেয়ার হওয়া এই তথ্যটি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্কের তৈরি করে। কিন্তু একজন সুস্থ মানুষের টয়লেটে ঠিক কতটা সময় কাটানো উচিত? আর সময় একটু বেশি লাগলেই কি তা পিত্তথলিতে পাথরের সংকেত দিয়ে দেয়?

চিকিৎসাবিজ্ঞান জানিয়েছে, এই দাবির পেছনে নেই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত কোলেস্টেরল, পিত্তরসের ভারসাম্যহীনতা এবং লিভারের কার্যক্রমের সাথে গভীরভাবে জড়িত থাকে। অন্যদিকে আবার মলত্যাগের সময় নির্ভর করে আপনার খাদ্যে ফাইবারের পরিমাণ, পানির ব্যবহার এবং অন্ত্রের পেশির সক্রিয়তার ওপর। কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে সময় বেশি লাগলে তা পাইলস বা এনাল ফিশারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু এর সাথে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার কোনো সরাসরি যোগসূত্র আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণায় মেলেনি।

মানুষভেদে মলত্যাগের সময় ভিন্ন ভিন্ন হয়। কারও ১–২ মিনিটে হয়ে যায়,আবার কারও ৫/৭ মিনিটও লাগে, এটি অনেকটা স্বাভাবিক। মলত্যাগের সময় নির্ভর করে খাদ্যে আঁশের পরিমাণ, পানি পান করার অভ্যাস, শারীরিক চলাফেরা, অন্ত্রের পেশির স্বাভাবিক সংকোচন-প্রসারণ (পারিস্টালসিস), মানসিক চাপ ও অভ্যাস ইত্যাদির উপর।চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোথাও উল্লেখ নেই যে ২–৩ মিনিটের বেশি সময় লাগলেই তা কোনো রোগের লক্ষণ প্রকাশ করে ফেলবে।

কখন সতর্ক হবেন?
সময় নয়, বরং লক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।যেমন-

⇨ শক্ত মল, ব্যথা বা অতিরিক্ত চাপ দিতে হওয়া।

⇨ কয়েকদিন পরপর মলত্যাগ হওয়া।

⇨ রক্তপাত হওয়া।

⇨ পেট ফাঁপা, অস্বস্তি।

⇨ অসম্পূর্ণ মলত্যাগের অনুভূতি।

এসব থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য বা অন্য অন্ত্রজনিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

পিত্তথলির পাথর কীভাবে হয়?
পিত্তথলির পাথর (Gallstones) তৈরি হয় পিত্তরসে কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন বা লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে। এর প্রধান ঝুঁকির কারণগুলো হলো:

⇨ অতিরিক্ত কোলেস্টেরল

⇨ স্থূলতা

⇨ দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা বা অনিয়মিত খাবার

⇨ দ্রুত ওজন কমানো

⇨ হরমোনজনিত প্রভাব

⇨ পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি।

এখানে অন্ত্রের মলত্যাগের সময়ের কোনো সরাসরি ভূমিকা নেই।

ভুল ধারণার উৎস কোথায়!
অনেকেই মনে করেন, শরীরে বর্জ্য জমে থাকলে তা বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করে। কিন্তু মানবদেহে অন্ত্র, লিভার, পিত্তথলি ইত্যাদি প্রত্যেকের কাজই আলাদা আলাদা এবং মলত্যাগে একটু বিলম্ব হলেই যে  পিত্তথলিতে পাথর হবে এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা কেন ভালো নয়?
একটি বিষয় সত্য যে, অতিরিক্ত সময় ধরে টয়লেটে বসে থাকা, বিশেষ করে মোবাইল ব্যবহার করতে করতে পাইলস বা অর্শের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ এতে মলদ্বারের শিরায় অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে। কিন্তু এটিও পিত্তথলির পাথরের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত নয়।

সুস্থ মলত্যাগের জন্য করণীয়:
⇨ প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা।

⇨ আঁশসমৃদ্ধ খাবার, যেমন- শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য  যুক্ত খাবার গ্রহন করা।

⇨ নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম।

⇨ চাপ অনুভব করলে দেরি না করা।

⇨ দীর্ঘসময় টয়লেটে না বসে থাকা।

মলত্যাগে ২-৩ মিনিটের বেশি সময় লাগলেই আপনি অসুস্থ, এমন ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। আর এর সঙ্গে পিত্তথলির পাথরের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতেই পারে। সময় নয়, লক্ষণই আসল নির্দেশক। অযাচিত ভয় নয়, সঠিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতাই হলো সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি।


সম্পর্কিত নিউজ