দ্বীপ যা দিনে থাকে কিন্তু রাতে থাকে না-মন সাঁ-মিশেলের আদ্যোপান্ত

দ্বীপ যা দিনে থাকে কিন্তু রাতে থাকে না-মন সাঁ-মিশেলের আদ্যোপান্ত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ফ্রান্স কল্পকাহিনী বা রূপকথার বইয়ে আমরা এমন সব দুর্গের কথা পড়ি যা মেঘের ওপরে বা সমুদ্রের গহ্বর থেকে হঠাৎ জেগে ওঠে। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে অবস্থিত মন সাঁ-মিশেল (Mont Saint-Michel) ঠিক সেরকমই এক বাস্তব রূপকথা। উত্তর আটলান্টিকের উত্তাল জলরাশির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মধ্যযুগীয় মঠ আর দুর্গটি কেবল এক স্থাপত্যশৈলী নয়, বরং এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক বিস্ময়ও। যেখানে প্রতিদিন সমুদ্র নিজেই নির্ধারণ করে দেয়, কখন এটি একটি দ্বীপ হবে আর কখন হবে মূল ভূখণ্ডের অংশ।

মন সাঁ-মিশেলের আশপাশের উপসাগর ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী জোয়ার-ভাটার জন্য পরিচিত। জোয়ার-ভাটার খেলাতেই এই দুর্গের আসল চমক লুকিয়ে আছে। চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় টানের প্রভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর সমুদ্রের পানি দ্রুত বাড়ে ও কমে। এখানে পানির উচ্চতা পার্থক্য এতটাই বেশি যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিস্তীর্ণ বালুচর ডুবে যায় বা ভেসে ওঠে। ভাটার সময় পথ শুকনো বালিতে উন্মুক্ত থাকে। জোয়ার এলে সেটিই আবার পানিতে ঢাকা পরে, তখন দিগন্তজোড়া জলরাশির মাঝে মন সাঁ-মিশেলকে মনে হয় সমুদ্রের ওপর ভাসমান নিঃসঙ্গ এক রূপালি মিনার।

স্থানীয় আবহ, আলো আর জোয়ারের সময়সূচি মিললে এমন দৃশ্য তৈরি হয়, যেন দিনের একাংশে স্থলপথ আছে, আর রাতের দিকে সেটি হয়ে পরে অদৃশ্য। প্রকৃত অর্থে দ্বীপটি হারিয়ে যায় না, বদলে যায় তার চারপাশের জলরেখা। পানির এই দ্রুত অগ্রযাত্রা অনেক সময় দূর থেকে দেখলে মনে হয় সমুদ্র ছুটে এসে ভূমিকে গ্রাস করছে।

ইতিহাস ও স্থাপত্যের মেলবন্ধন:
মন সাঁ-মিশেলের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় অ্যাবি (ধর্মীয় স্থাপনা), নিচে ঘিরে ছোট্ট বসতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ছিল তীর্থস্থান ও দুর্গ, জোয়ারের পানিই ছিল প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। ভাটার সময় মানুষ পায়ে হেঁটে পৌঁছাত, জোয়ারে জায়গাটি হয়ে উঠত দুর্গম দ্বীপ।

নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক ছন্দ:
এ অঞ্চলে জোয়ার দ্রুত আসে। তাই বালুচরে হাঁটার সময় সময়জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ স্থায়ী সেতু-সদৃশ উঁচু পথ থাকায় যোগাযোগ সহজ, কিন্তু জোয়ার-ভাটার নাটকীয়তা এখনো বেশ অটুট।

আলো, সময় ও প্রকৃতির নাট্যশালা!
সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময়, যখন আলো নরম হয় এবং জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে,তখন মন সাঁ-মিশেল এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করে। দূর থেকে মনে হয়, যেন একটি পাথুরে শহর পানির উপর ভেসে আছে। ভাটায় আবার দেখা দেয় বিস্তীর্ণ বালুচর, দ্বীপ যেন স্থলেরই অংশ।

মন সাঁ-মিশেল জোয়ার-ভাটার শক্তি, ভূপ্রকৃতি ও সময়ের নিখুঁত এক সমন্বয়। তবু চোখে দেখলে মনে হয়, দিনে যে পথ আছে, রাতে তা নেই, প্রকৃতির ঘড়িতে বদলে যাওয়া এক জীবন্ত দৃশ্যপট।


সম্পর্কিত নিউজ