কেন ২৫ মিনিটের বেশি ফোকাস রাখা কঠিন? কারণ ও কার্যকর সমাধান

কেন ২৫ মিনিটের বেশি ফোকাস রাখা কঠিন? কারণ ও কার্যকর সমাধান
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আপনি কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বসার একটু পরই লক্ষ্য করেন যে, আপনার চোখ স্ক্রিনে থাকলেও মন চলে গেছে অন্য কোথাও? হয়তো অকারণে ফোনটা হাতে নিলেন কিংবা জানালার বাইরের তুচ্ছ কোনো শব্দে আপনার মনোযোগ সুতো কাটা ঘুড়ির মতো করেই উড়ে গেল। আমরা অনেকেই একে মনোযোগের অভাব বা অলসতা বলে নিজেকে দোষারোপ করে থাকি। কিন্তু আধুনিক নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা,এই মনোযোগ সরে যাওয়াটা মস্তিষ্কের কোনো ত্রুটি নয়, বরং এটি তার টিকে থাকার এক সহজাত কৌশল।

মনোযোগের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কাঠামো:
গভীর মনোযোগের সময় মস্তিষ্কের সামনের অংশ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত, অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দমন এবং কাজের ধাপ ধরে রাখার দায়িত্ব নেয়। পাশাপাশি সতর্কতা-নিয়ন্ত্রক নেটওয়ার্ক পরিবেশের অপ্রয়োজনীয় উদ্দীপনাকে ছেঁকে ফেলে। এই দমন প্রক্রিয়াটিই সবচেয়ে বেশি শক্তি-ব্যয়ী। অর্থাৎ মনোযোগ মানে শুধু কাজ করা নয়। কাজের বাইরে সবকিছুকে ঠেকিয়ে রাখাও।

শক্তি ও জ্বালানির সীমাবদ্ধতা!
মস্তিষ্ক সাধারণত গ্লুকোজ ও অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল। এক টানা মনোযোগের সময় স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে দ্রুত সংকেত আদান প্রদান হয়, যা বিপুল শক্তি খরচ করে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর এই উচ্চচাপের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বিরতি চাইতে শুরু করে, যা একধরনের সুরক্ষা কৌশল।

স্নায়ু-রাসায়নিক ওঠানামা:
ডোপামিন মনোযোগ ও প্রেরণায়, নরঅ্যাড্রেনালিন সতর্কতায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এদের মাত্রা স্থির থাকে না। টানা কাজের ফলে এদের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে কমে যায়। তখন মস্তিষ্ক নতুন উদ্দীপনা খোঁজে, যাকে আমরা মন ছুটে যাওয়া হিসেবে অনুভব করে থাকি।

মনোযোগ চক্র:
আমাদের মনোযোগ সরলরৈখিক নয়। এটি তরঙ্গের মতো ওঠানামা করে। শুরুতে বাড়ে, মাঝামাঝিতে সর্বোচ্চ থাকে, আর তারপর কমতে শুরু করে। এই চক্র সাধারণত ২০–৩০ মিনিট স্থায়ী হয়। তাই এই সময়সীমা অতিক্রম করলে স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগের পতন লক্ষনীয় হয় ।

ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কের ভূমিকা!
মনোযোগ কমে গেলে মস্তিষ্কের আরেকটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়, যা স্মৃতি গোছানো, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং মানসিক পুনর্গঠনে কাজ করে। অর্থাৎ মনোযোগ সরে যাওয়া মানেই কাজে পিছিয়ে পড়া নয়। এটি ভেতরের প্রক্রিয়াকে কিছুটা সময় দেওয়া।

ডিজিটাল যুগের প্রভাব:
স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও, দ্রুত নোটিফিকেশন, ঘনঘন কনটেন্ট বদল ইত্যাদি আমাদের মস্তিষ্ককে ক্ষণস্থায়ী উদ্দীপনায় অভ্যস্ত করে ফেলে। সে কারণে দীর্ঘসময় একক কাজে মনোযোগ রাখা তুলনামূলক একটু কঠিন লাগে। মস্তিষ্ক দ্রুত পুরস্কারের প্রত্যাশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

২৫ মিনিট কেন কার্যকর সীমা?
এই সময়সীমা মনোযোগের প্রাকৃতিক চক্রের সঙ্গে মিলে যায়। আর তাই ২৫ মিনিট কাজের সাথে ৫ মিনিটের বিরতি মনোযোগের ছন্দের সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মনোযোগ কমে যাওয়ার সাধারণ কারণগুলো :
⇨ ঘুমের ঘাটতি

⇨ পানিশূন্যতা

⇨ ভারী বা অনিয়মিত খাবার

⇨ মানসিক চাপ

⇨একাধিক কাজ একসাথে করা

⇨শব্দ ও ভিজ্যুয়াল বিভ্রান্তি

কার্যকর সমাধান ও কৌশল:
১) সময়ভিত্তিক কাজের কৌশল: ২৫–৩০ মিনিট গভীর কাজ,তারপর ৫ মিনিট বিরতি নেওয়া। এভাবে চার চক্র শেষে বড় বিরতি।

২) বিভ্রান্তি নিয়ন্ত্রণ: কাজের সময় ফোন সাইলেন্ট, অপ্রয়োজনীয় ট্যাব বন্ধ, নিরিবিলি পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া।

৩) শারীরিক সহায়তা: পর্যাপ্ত পানি, হালকা স্ট্রেচিং, সোজা ভঙ্গিতে বসা। এগুলো রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়।

৪) একক কাজের অভ্যাস: মাল্টিটাস্কিং দ্রুত মনোযোগের ক্ষয় করে। এক সময়ে এক কাজ মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক।

৫) ঘুম ও পুষ্টি:ভালো ঘুম ও সুষম খাদ্য স্নায়ু-রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখে।

৬) কাজ ভেঙে নেওয়া: বড় কাজকে ছোট ছোট  ধাপে ভাগ করলে প্রতিটি ধাপে নতুন মনোযোগ চক্র শুরু করা সহজ হয়।

৭) মনোযোগের ‘ওয়ার্ম-আপ’: কাজের আগে ২–৩ মিনিট গভীর শ্বাস বা নীরব বসে থাকা। এটি মনকে প্রস্তুত করে।

টানা দীর্ঘসময় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারাই কোনো দুর্বলতা নয়। এটি মস্তিষ্কেরই প্রাকৃতিক এক সীমা। এই সীমাকে অস্বীকার না করে, বরং তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজের ধরন সাজালে উৎপাদনশীলতা বাড়ে, আর মানসিক ক্লান্তিও কমে।


সম্পর্কিত নিউজ