স্ট্রেস কমাতে চান? সিজদা বা চাইল্ডস পোজে থাকার উপকারিতা জানুন

স্ট্রেস কমাতে চান? সিজদা বা চাইল্ডস পোজে থাকার উপকারিতা জানুন
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

আমরা যখন যোগব্যায়ামের চাইল্ডস পোজ(Child’s Pose) বা বালাসনার উপকারিতা নিয়ে আধুনিক নিউরোসায়েন্সের ব্যাখ্যা শুনি, তখন একেবারে মুগ্ধ হয়ে যাই। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে প্রতিদিন অত্যন্ত ৫ বারের নামাযে আমরা যে সিজদা দিই, তার শারীরিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রভাব কি আমরা তলিয়ে দেখেছি কখনো? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, সিজদা কেবল একটি আধ্যাত্মিক সমর্পণই নয়, এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করার (Nervous System Regulation) এক অভাবনীয় প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এটি শরীরকে অস্থিরতা থেকে বের করে মুহূর্তেই প্রশান্তির ছায়ায় নিয়ে আসে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সিজদায় যখন কপাল মাটির সংস্পর্শে আসে, তখন এটি আমাদের শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে (Parasympathetic Nervous System) সরাসরি সক্রিয় করে। একে বলা হয় শরীরের “Rest and Digest” মোড। চাইল্ডস পোজের তুলনায় সিজদায় শরীরের মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র এবং হৃদপিণ্ডের অবস্থান এমনভাবে থাকে যা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনকে (Cerebral Blood Flow) আরও সুশৃঙ্খল করে।

সিজদার শারীরিক বৈজ্ঞানিক দিকসমূহ:
☞ সিজদার সময় মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এ সময় মাথা হৃদয়ের নিচে থাকে। এতে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘক্ষণ এই অবস্থায় থাকলে Prefrontal Cortex-এ রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যা মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, একাগ্রতা এবং মনোযোগ বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাথার নিচু অবস্থায় থাকা মানুষের মস্তিষ্কের অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়, যার ফলে নিউরোন কার্যক্রম আরও কার্যকর হয়।

☞ নার্ভাস সিস্টেম প্রশান্তি দেয়। সিজদার সময় ঘাড় ও মেরুদণ্ড ভাঁজ হয়। এতে Vagus Nerve সক্রিয় হয়, যা স্বাভাবিকভাবে শরীরকে ‘Rest and Digest’ মোডে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে যায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং অটোনোমাস নার্ভাস সিস্টেমের বিপরীত (parasympathetic) অংশ সক্রিয় হয়।

☞ স্ট্রেস হ্রাস ও মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়। Vagus Nerve সক্রিয় হলে শরীরে কোর্টিসল হ্রাস পায়, যা হলো স্ট্রেস হরমোন। একই সময়ে সেরোটোনিন এবং GABA হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, ফলে মানসিক শান্তি এবং স্থিরতা আসে।

☞ মেরুদণ্ড ও শরীরের নমনীয়তা আসে।সিজদার সময় মেরুদণ্ড, কাঁধ এবং কোমরকে ভাঁজ করতে হয়। এই অবস্থায় মেরুদণ্ডের পেশি ও লিগামেন্ট রিল্যাক্সড হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পিঠের ব্যথা কমায় এবং শরীরের ফ্লেক্সিবিলিটিও বৃদ্ধি করে।

☞ সিজদার সময়  মনোযোগ ও ফোকাস বৃদ্ধি পায়। এ সময় মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীভূত হয়। এটি ব্রেনের নেটওয়ার্ককে সংহত করে, বিশেষ করে Default Mode Network (DMN) এবং Prefrontal Cortex। এই অঞ্চলে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়, চিন্তাশক্তি তীক্ষ্ণ হয়, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা উন্নত হয়।

ধর্ম পালনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এই বৈজ্ঞানিক বিস্ময়গুলো আজ বিশ্বজুড়ে গবেষকদের নজর কাড়ছে।

অনেকে মনে করেন, সিজদা কয়েক সেকেন্ডের জন্য করা হয়, আর যোগব্যায়ামে ১-২ মিনিট ধরে ধরে রাখতে হয়। তবে ইসলাম আমাদের শেখায় নামায ধীরে ধীরে ও মনোযোগসহ পড়তে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘ সময় সিজদা করতেন। এই দীর্ঘ সিজদা:

⇨ Vagus Nerve স্টিমুলেশন বাড়ায়।

⇨ হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

⇨ দেহ ও মনকে গভীর প্রশান্তি দেয়।

⇨ ধ্যানের মতো মনোযোগ বৃদ্ধি করে।

মানসিক ও আধ্যাত্মিক দিক:
সিজদা কেবল শারীরিক প্রক্রিয়া নয়। এটি আধ্যাত্মিক যোগাযোগের মাধ্যম। আল্লাহর সামনে মাথা নিচু করা, আত্মাকে ত্যাগ ও ভক্তিতে পূর্ণ করার অনন্য উপায়।

বিজ্ঞান ও ইসলাম একসঙ্গে:
আজকাল যা নিউরোসায়েন্স বা যোগব্যায়ামের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে- মাথা নিচু রাখা, শরীর ভাঁজ করা, ধীরে শ্বাস নেওয়া, Vagus Nerve স্টিমুলেশন, rest and digest মোড ইত্যাদি আমরা ১৪০০ বছর আগে থেকেই সিজদার মাধ্যমে পেয়ে আসছি।

সিজদা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আধ্যাত্মিকতা ও শারীরিক স্বাস্থ্য একসাথে অর্জন সম্ভব। এর দ্বারা স্ট্রেস কমানো এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি করা যায় এবং শরীরের স্নায়ুবিজ্ঞান অনুযায়ী সঠিকভাবে রিল্যাক্স করা সম্ভব। প্রাচীন ধর্মীয় অভ্যাস ও আধুনিক বিজ্ঞান একসাথে প্রমাণ করছে, সিজদা সত্যিই মানুষের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখে। সুবহান’আল্লাহ।


সম্পর্কিত নিউজ