পরাজয়কে সফলতার জ্বালানি বানানোর উপায় জানুন!

পরাজয়কে সফলতার জ্বালানি বানানোর উপায় জানুন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

সমাজ সবসময়ই আমাদেরকে জয়ের গল্প শোনাতে পছন্দ করে। ফলে কোনো কাজে সফল না হওয়াকে আমরা কেবল একটি ফলাফল না ভেবে, নিজের ব্যক্তিত্বের পরাজয় হিসেবে দেখতে শুরু করে দেই। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। ব্যর্থতা মানেই কোনো দেয়ালের শেষ প্রান্ত নয়, বরং এটি আপনার মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ইমোশনাল ওয়ার্কআউট। যারা একবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে দাঁড়াতে পারেন, তাদের মস্তিষ্ক পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলার জন্য অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং রেজিলিয়েন্ট (Resilient) হয়ে ওঠে।

ব্যর্থতায় মস্তিষ্কে কী ঘটে?
আমাদের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাটা আবেগীয় তো বটেই, পাশাপাশি স্নায়ুবৈজ্ঞানিকও। যখন আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পাই না, তখন মস্তিষ্কের পুরস্কারসংক্রান্ত অংশে ডোপামিনের মাত্রা কমে যায়। এই হ্রাস হতাশা ও মনখারাপের অনুভূতি তৈরি করে। একই সঙ্গে অ্যামিগডালা, যা ভয় ও হুমকির প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ব্যর্থতাকে অনেক সময় মস্তিষ্ক ঝুঁকি বা হুমকি হিসেবে ধরব নেয়। ফলে আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়ে, উদ্বেগ তৈরি হয়, আত্মসম্মান কমে যায়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা যুক্তি ও সিদ্ধান্তগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে, সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে এই আবেগীয় প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অর্থাৎ, ব্যর্থতা এড়ানো যায় না কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা শেখা যায়।

আত্মসম্মান বনাম আত্মপরিচয়:
ব্যর্থতার বড় ধাক্কাটি আসে যখন মানুষ নিজের ফলাফলকে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। “আমি ব্যর্থ হয়েছি” এবং “আমি ব্যর্থ মানুষ” এই দুইটি বাক্যের মধ্যে রয়েছে গভীর পার্থক্য। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ফিক্সড মাইন্ডসেট’ বনাম গ্রোথ মাইন্ডসেট। ফিক্সড মানসিকতায় মানুষ মনে করে তার যোগ্যতা স্থির। তাই ব্যর্থতা মানেই অযোগ্যতা। অন্যদিকে গ্রোথ মানসিকতায় ব্যর্থতা শেখার অংশ।যে ব্যক্তি ব্যর্থতাকে,বিচার হিসেবে না নিয়ে, তথ্য হিসেবে গ্রহন করে নেয়, সে দ্রুত মানসিক ভারসাম্যে ফিরতে পারে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল:
ব্যর্থতার পর আবেগকে দমন নয়, বরং বোঝা জরুরি। কিছু কৌশল এখানে কার্যকর রয়েছে। যেমন:

১️. কগনিটিভ রিফ্রেমিং: ঘটনাটিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। উদাহরণস্বরূপ, “আমি পারিনি” থেকে “আমি শিখছি”,এই মানসিক পরিবর্তন স্ট্রেস কমাতে সহায়ক।\

২️. সেলফ-কমপ্যাশন: নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। আত্মসমালোচনার বদলে আত্মসমর্থন মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনে।

৩️. জার্নালিং: অনুভূতি লিখে রাখা মস্তিষ্ককে বিশৃঙ্খলা থেকে গঠনমূলক চিন্তায় আনতে সাহায্য করে।

৪️. সামাজিক সহায়তা: বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করলে কর্টিসল কমে এবং মানসিক চাপ হ্রাস পায়।

মজার বিষয় হলো, আমাদের মস্তিষ্ক ভুল থেকে শেখার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত।
যদি ব্যক্তি চেষ্টা চালিয়ে যায় তবে নিউরোপ্লাস্টিসিটি অর্থাৎ নতুন স্নায়ু সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতা, ব্যর্থতার পর আরও সক্রিয় হয়। অর্থাৎ, ব্যর্থতা  শেখার জৈবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ।

সামাজিক চাপ ও তুলনার ফাঁদ!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্যের প্রদর্শন অনেক সময় ব্যর্থতাকে আরও তীব্র মনে করায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক সফলতার পেছনে বহু অদৃশ্য ব্যর্থতা থাকে। অতিরিক্ত তুলনা আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মানসিক সামঞ্জস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নিজের অগ্রগতি নিজের মানদণ্ডে পরিমাপ করা।

ব্যর্থতা ও স্থিতিস্থাপকতা:
স্থিতিস্থাপকতা হলো প্রতিকূলতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের জীবনে মাঝেমধ্যে চ্যালেঞ্জ এসেছে, তারা ভবিষ্যৎ চাপে তুলনামূলকভাবে স্থির থাকেন।

কীভাবে বাস্তবিক পদক্ষেপ শুরু করবেন?
ব্যর্থতার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না।

ঘটনাকে বিশ্লেষণ করুন। কী নিয়ন্ত্রণে ছিল, কী ছিল না তা নিয়ে ভাবুন। ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে আবার শুরু করুন। শারীরিক যত্ন নিন। ঘুম, পুষ্টি ও ব্যায়াম মানসিক স্থিতিতে প্রভাব ফেলে।

ব্যর্থতা জীবনের অনিবার্য অংশ। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তা আমাদের সংজ্ঞায়িত করবে। বরং ব্যর্থতা আমাদের সীমা, দুর্বলতা ও সম্ভাবনার আয়না দেখায়।

জীবনের পথে হোঁচট খাওয়া কোনো লজ্জার নয়। স্থির হয়ে বসে থাকাই লজ্জাজনক। ব্যর্থতার সঙ্গে সহাবস্থান শেখা মানেই ভাঙনের ভেতর থেকে নিজের নতুন সংস্করণ তৈরি করা।


সম্পর্কিত নিউজ