{{ news.section.title }}
বাঁচছি নাকি অপেক্ষা করছি? জীবনের কঠিন প্রশ্ন-‘The Bucket List'
মনে করুন, আপনাকে একটা সাদা কাগজ আর কলম দেওয়া হলো। কাগজটির উপরে লেখা, ‘মৃত্যুর আগে আমি যা যা করতে চাই’। আপনি কি সেখানে বিসিএস ক্যাডার হওয়া বা দামী একটি গাড়ি কেনার কথা লিখবেন? নাকি লিখবেন, পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার কথা, যা আপনি দশ বছর ধরে এড়িয়ে চলছেন? The Bucket List সিনেমাটি কেবল দুই বৃদ্ধের পাগলামি নয়। এটি আমাদের সমাজের সেই জীবন্ত মৃতদেহ, যারা মরে যাওয়ার আগেই বেঁচে থাকার স্বাদ ভুলে গেছে, তাদের জন্য এক জোরালো চপেটাঘাত। জ্যাক নিকলসন আর মরগান ফ্রিম্যান পর্দার ওপারে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, জীবন আসলে ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, জীবন লুকিয়ে আছে সেই সাহসের ভেতর যা দিয়ে আমরা আমাদের ভয়কে জয় করতে পারি।
চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র দু’জন। এডওয়ার্ড কোল ও কার্টার চেম্বার্স। এডওয়ার্ড ধনী, একরোখা ও আত্মকেন্দ্রিক। আর অন্যদিকে কার্টার শান্ত, জ্ঞানী ও পারিবারিক মানুষ। ভাগ্যের পরিহাসে দু’জন একই হাসপাতালে, একই কক্ষে এবং একই কঠিন রোগের মুখোমুখি। চিকিৎসকের কাছ থেকে তারা জানতে পারে, তাদের জীবনের সময় খুব বেশি নেই। এখান থেকেই শুরু হয় গল্পের মোড়। কার্টার নিজের নোটবুকে লিখে ফেলেন কিছু স্বপ্ন, মরার আগে তিনি যা করতে চান। সেই তালিকাই হয়ে ওঠে “বাকেট লিস্ট”,অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পূরণ করতে চাওয়া ইচ্ছার তালিকা। তালিকায় থাকে স্কাইডাইভিং, পৃথিবীর বিস্ময় দেখা, অচেনা দেশে যাওয়া, এমনকি সত্যিকারের হাসি উপভোগ করা। কিন্তু এর ভেতরে আরও গভীর কিছু থাকে সম্পর্ক ঠিক করা, ক্ষমা চাওয়া, নিজের ভেতরের শূন্যতা পূরণ করা।
চলচ্চিত্রটি কেবল রোমাঞ্চকর ভ্রমণের গল্পই নয়। এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের এক গল্প। যখন কেউ জানে তার সময় সীমিত, তখন অগ্রাধিকারের তালিকাও বদলে যায়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Mortality Salience বা মৃত্যুর সচেতনতা, যা মানুষকে জীবনের মূল্য নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এডওয়ার্ড, যিনি সারা জীবন অর্থ ও প্রভাবকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, সম্পর্কহীন সাফল্য শূন্য। অন্যদিকে কার্টার উপলব্ধি করেন, নিজের স্বপ্নগুলোকে দীর্ঘদিন অবহেলা করেছেন কেবল দায়িত্বের কারণে। এই দুই মানসিক যাত্রা একে অপরকে প্রভাবিত করে। বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে পরিবর্তনের অনুঘটক।
তারা প্যারাস্যুট নিয়ে আকাশে ঝাঁপ দেয়, মিশরের পিরামিড দেখে, দূরদেশে ঘোরে। দৃশ্যগুলো দৃষ্টিনন্দন, কিন্তু এগুলো কেবল বাহ্যিক যাত্রা। আসল ভ্রমণটি ঘটে ভেতরে, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা, অহং ভাঙা, অপরাধবোধ মুছে ফেলার মাধ্যমে। একটি সংলাপ বিশেষভাবে মনে থাকে, জীবন শেষে মানুষকে দু’টি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
১. তুমি কি আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলে?
২. তোমার জীবনে কি অন্যদের আনন্দ এনে দিয়েছিলে?
এই দুটি প্রশ্নই পুরো চলচ্চিত্রের নৈতিক কাঠামো নির্মাণ করে দেয়।
এডওয়ার্ড চরিত্রে Jack Nicholson এবং কার্টার চরিত্রে Morgan Freeman, দু’জন কিংবদন্তি অভিনেতার অভিনয় সিনেমাটিকে অন্য মাত্রা এনে দেয়। নিকলসনের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, রাগ ও ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসা অভিব্যক্তি চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলে। আর ফ্রিম্যানের কণ্ঠস্বর ও সংযত আবেগ এনে দেয় গভীরতা। দু’জনের কেমিস্ট্রি এতটাই স্বাভাবিক যে দর্শক বুঝতে পারে, বন্ধুত্ব কখনও বয়স বা সামাজিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে না।
সাফল্যের পুনঃসংজ্ঞা!
চলচ্চিত্রটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে-সাফল্য আসলে কী?
অর্থ, খ্যাতি, প্রভাব নাকি মানসিক তৃপ্তি?
এডওয়ার্ডের বিশাল ব্যবসায়িক সাফল্যও তাকে একাকিত্ব থেকে মুক্ত করতে পারেনি। অন্যদিকে কার্টারের সীমিত আয়, কিন্তু গভীর পারিবারিক বন্ধন তাকে সমৃদ্ধ করেছে। শেষ পর্যন্ত দর্শক উপলব্ধি করে, সাফল্য মানে জীবনের শেষে আফসোস কম থাকা।
মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও সিনেমাটি গুরুগম্ভীর নয়। বরং হালকা হাস্যরস, তীক্ষ্ণ সংলাপ ও উষ্ণ মুহূর্তে ভরপুর। এই ভারসাম্যই চলচ্চিত্রটিকে আবেগপ্রবণ হলেও অতিনাটকীয় হতে দেয় না।
আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষ ব্যস্ত ডিগ্রি, পদ, সম্পদ অর্জনে। কিন্তু থেমে নিজের তালিকা বানানোর সময় ক’জন নেয়? “The Bucket List” আমাদের শেখায়, স্বপ্নগুলো পরে করার জন্য নয়। সম্পর্ক মেরামত, ক্ষমা চাওয়া, ভালোবাসা প্রকাশ এসব কাজ সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে না। চলচ্চিত্রটি মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের জীবনের সময় সীমিত, কিন্তু সেটিকে অর্থপূর্ণ করা আমাদের সিদ্ধান্ত।
মৃত্যুর ছায়া যখন সামনে আসে, তখন মানুষ বুঝতে পারে, জীবনের আসল সম্পদ স্মৃতি আর সম্পর্ক। এই সিনেমা শেষ হয়, কিন্তু দর্শকের মনে একটি নীরব প্রশ্ন রেখে যায়। আর তা হলো আপনার বাকেট লিস্টে কী আছে? হয়তো আজই সময়, নিজের তালিকা লিখে ফেলার। কারণ অর্থপূর্ণ জীবন কোনো একদিন শুরু হবে না, এটি শুরু হয় এখনই।