{{ news.section.title }}
হার্ট এবং মস্তিষ্কের সম্পর্ক: আবেগ নিয়ন্ত্রণে হৃদস্পন্দনের ভূমিকা
আমরা যখন প্রেমে পড়ি, তখন বলি হৃদয় দিয়ে অনুভব করছি। আবার চরম দুঃখেও বলি বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি, এই কথাগুলো কি কেবলই রূপক? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গূঢ় বৈজ্ঞানিক সত্য? দীর্ঘকাল ধরে আমরা হৃদযন্ত্র বা হার্টকে কেবল একটি রক্ত সঞ্চালনকারী পাম্প হিসেবে জেনে এসেছি। কিন্তু আধুনিক নিউরো-কার্ডিওলজি আমাদের এক চমকপ্রদ তথ্য দিচ্ছে হৃদপিণ্ড আসলে শুধু শরীরের রক্তই পাম্প করে না, এটি আমাদের আবেগ, উদ্বেগ এবং মেজাজের অন্যতম এক পরিচালকও বটে।
মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের সংযোগের প্রধান সেতু হলো অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র, যা আমাদের সচেতন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কাজ করে। এই সিস্টেমের রয়েছে দুটি অংশ। সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম, হলো লড়াই বা পালাও প্রতিক্রিয়া।
আর প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম হলো বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধার মোড।
এই দুই ব্যবস্থার ভারসাম্য হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে। যখন আমরা ভয় পাই বা চাপ অনুভব করি, সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় হয়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। শান্ত অবস্থায় প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম হৃদস্পন্দন কমিয়ে আনে। এই ওঠানামা আমাদের মুডের সঙ্গে জড়িত।
হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো ভেগাস নার্ভ। এটি মস্তিষ্ক থেকে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও অন্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। যখন ভেগাস নার্ভ সক্রিয় অবস্থায় থাকে, তখন হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানসিক প্রশান্তি, উদ্বেগ কমে যাওয়া, সামাজিক সংযোগের অনুভূতি। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস বা ধ্যানের সময় ভেগাস নার্ভ সক্রিয় হয়ে উঠে। এর ফলে হৃদস্পন্দনের ছন্দ সুশৃঙ্খল হয় এবং মস্তিষ্কে শান্তির সংকেত যায়।
হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি বা HRV হলো এক হৃদস্পন্দন থেকে আরেকটির সময় ব্যবধানের সূক্ষ্ম পরিবর্তন। এটি স্থির নয়,বরং নমনীয়। উচ্চ HRV সাধারণত ভালো মানসিক অভিযোজন ক্ষমতা, চাপ মোকাবিলায় দক্ষতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা ইইত্যাদিকে বোঝায়। আর নিম্ন HRV দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।অর্থাৎ, হৃদযন্ত্রের ছন্দ কেবল শারীরিক নয় মানসিক সুস্থতারও প্রতিফলন।
আমরা যখন খুশি হই তখন বুক হালকা লাগে। আবার ভয় পেলে বুক ধড়ফড় করে, এগুলো অনুভূতি তো বটেই, পাশাপাধি শারীরবৃত্তীয় বাস্তবতাও। মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবেগের সংকেত মস্তিষ্ক থেকে হৃদযন্ত্রে যায়, আবার হৃদস্পন্দনের ছন্দও মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয়। এটি মূলত দুইমুখী যোগাযোগ।
গবেষণায় দেখা গেছে, যখন হৃদস্পন্দন খুব অস্থির থাকে, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুলের প্রবণতা বাড়তে পারে। শান্ত ও সুষম হৃদস্পন্দন প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে কার্যকর রাখে, যা যুক্তি ও বিশ্লেষণে সহায়তা করে। অর্থাৎ, আবেগ ও যুক্তি হৃদস্পন্দনের মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত।
নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায়:
গভীর ও ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস হৃদস্পন্দনের ছন্দে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন আমরা ৪–৬ সেকেন্ডে শ্বাস নিই এবং ধীরে ধীরে ছাড়ি, তখন আমাদের প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় হয়। ফলে হৃদস্পন্দন ধীরে আসে, মস্তিষ্কে শান্তির সংকেত যায় এবং উদ্বেগ কমে যায়। এটি প্রমাণ করে যে মুড নিয়ন্ত্রণে শ্বাস একটি কার্যকর হাতিয়ার।
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও হৃদযন্ত্র:
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ কেবল মনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হৃদযন্ত্রে প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ ও ছন্দের অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। একইভাবে, হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এই পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝায় মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য আলাদা সত্তা নয়।
ইতিবাচক আবেগের প্রভাব:
কৃতজ্ঞতা, সহানুভূতি, ভালোবাসা এসব ইতিবাচক আবেগ হৃদস্পন্দনের ছন্দে সুশৃঙ্খল প্যাটার্ন তৈরি করে। এই সমন্বিত ছন্দকে অনেক সময় কার্ডিয়াক কোহেরেন্স বলা হয়। এ অবস্থায় মনোযোগ বাড়ে, আবেগ স্থিতিশীল হয় ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
আমাদের হৃদযন্ত্র মস্তিষ্কের সঙ্গে এক নীরব সংলাপে যুক্ত। প্রতিটি আবেগ, প্রতিটি চিন্তা হৃদস্পন্দনের ছন্দে প্রতিফলিত হয়। আবার হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনও আমাদের মুডে প্রভাব ফেলে। মন খারাপ হলে বুক ভারী লাগে, এটি কেবল কাব্যিক নয়, জৈবিকভাবেও সত্য।