অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার, ম্যাপিংয়ে নতুন চমক!

অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার, ম্যাপিংয়ে নতুন চমক!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, কোটি কোটি নক্ষত্র আর আলোকোজ্জ্বল গ্যালাক্সি দেখে ভাবতে শুরু করি, এটাই হয়তো মহাবিশ্ব। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে এক রূঢ় সত্য, আমরা যা কিছু দেখি, তা মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ! বাকি ৯৫ শতাংশই হলো আমাদের চোখের আড়ালে থাকা এক অন্ধকার জগৎ। এই রহস্যের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে আছে ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter)। এটি আলো ছড়ায় না, প্রতিফলন করে না, এমনকি এর ভেতর দিয়ে আলো চলে গেলেও কোনো বাধা পায় না। যেন এক অদৃশ্য ভূতুরে অস্তিত্ব, অথচ যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই কোটি কোটি গ্যালাক্সিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

কেন ডার্ক ম্যাটার ম্যাপিং জরুরি?
গ্যালাক্সির ঘূর্ণনগত বেগ, গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভর-বণ্টন, এমনকি মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডের সূক্ষ্ম ওঠানামা, সবই ইঙ্গিত যে দৃশ্যমান পদার্থ মোট ভরের একটি ছোট অংশ মাত্র। ডার্ক ম্যাটার ছাড়া গ্যালাক্সিগুলো তাদের বর্তমান কাঠামোয় স্থিতিশীল থাকত না। তাই ডার্ক ম্যাটারের বণ্টন বোঝা মানে মহাবিশ্বের বৃহৎ-স্কেলের গঠন অর্থাৎ কসমিক ওয়েব বোঝা।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং: ডার্ক ম্যাটার ম্যাপিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি হলো গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। যখন কোনো বিশাল ভর, যেমন গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, পেছনের গ্যালাক্সির আলোকে বাঁকিয়ে দেয় তখন আমরা আকাশে আর্ক বা আইনস্টাইন রিংয়ের মতো বিকৃতি দেখি। এই বিকৃতির মাত্রা বিশ্লেষণ করে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় ভর মিলিয়ে ভর-বণ্টনের মানচিত্র তৈরি করা যায়।

“উইক লেন্সিং” পদ্ধতিতে লক্ষ-কোটি দূরবর্তী গ্যালাক্সির ক্ষুদ্র আকারের বিকৃতি পরিসংখ্যানগতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এই সূক্ষ্ম বিকৃতিগুলোর সম্মিলিত চিত্রই ডার্ক ম্যাটারের বৃহৎ-স্কেল বণ্টনের ধারণা প্রদান করে থাকে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো, আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্যালাক্সি অন্তর্ভুক্ত করে উচ্চ-নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

কসমিক ওয়েবের রূপরেখা:
ডার্ক ম্যাটার একা ছড়িয়ে নেই। এটি ফিলামেন্ট বা সুতোসদৃশ কাঠামো তৈরি করে। যাকে বলা হয় কসমিক ওয়েব। গ্যালাক্সিগুলো এই ফিলামেন্ট বরাবর গুচ্ছাকারে অবস্থান করে থাকে।  উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশন ও পর্যবেক্ষণ-তথ্য একত্র করে এখন বিজ্ঞানীরা এই জালের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির পথে এগোচ্ছেন। ফলে বোঝা যাচ্ছে, কোথায় ভর ঘনীভূত, কোথায় তুলনামূলক ফাঁকা ভয়েড অঞ্চল।

গ্যালাক্সি ক্লাস্টার ও এক্স-রে পর্যবেক্ষণ:
গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভেতরে উত্তপ্ত গ্যাস এক্স-রে বিকিরণ করে। এই দৃশ্যমান উপাদান ও লেন্সিং-ভিত্তিক ভর-বণ্টন তুলনা করলে দেখা যায় যে, দৃশ্যমান গ্যাসের সঙ্গে বেশিরভাগ ভরই মেলে না, আলাদা অঞ্চলে অবস্থান করে। এমন পর্যবেক্ষণ ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব ও বণ্টন বোঝায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে। উন্নত এক্স-রে টেলিস্কোপ ও গভীর-ক্ষেত্র চিত্রায়ন প্রযুক্তি ক্লাস্টার-স্তরের মানচিত্রকে আরও সূক্ষ্ম করে তুলেছে।

সিএমবি ও প্রাথমিক মহাবিশ্বের ছাপ:
মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB)–এর সূক্ষ্ম তাপমাত্রা-অসামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করেও ডার্ক ম্যাটারের সামগ্রিক ঘনত্ব ও বণ্টন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রাথমিক মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র ঘনত্ব-অসামঞ্জস্য সময়ের সঙ্গে বড় হয়ে আজকের কসমিক ওয়েব গঠন করেছে। উন্নত পরিমাপ পদ্ধতি এই প্রাথমিক সংকেতকে আরও নির্ভুলভাবে ধরতে পারছে, যা পরবর্তী কাঠামো-গঠনের মডেল যাচাইয়ে বেশ সহায়ক।

পরিসংখ্যান, এআই ও সুপারকম্পিউটিংয়ের ভূমিকা:
ডার্ক ম্যাটার ম্যাপিং এখন এক বিশাল ডেটার বিজ্ঞান। লক্ষ-কোটি গ্যালাক্সির ছবি, রেডশিফট তথ্য, লেন্সিং বিকৃতি—সবকিছু বিশ্লেষণে প্রয়োজন উন্নত পরিসংখ্যান ও মেশিন লার্নিং কৌশল। এআই-ভিত্তিক অ্যালগরিদম সূক্ষ্ম সিগন্যাল ও সিস্টেম্যাটিক ত্রুটি আলাদা করতে সাহায্য করছে। পাশাপাশি সুপারকম্পিউটার-নির্ভর সিমুলেশন বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মডেল তুলনা করে তত্ত্ব যাচাই করছে।

চ্যালেঞ্জ: 
ডার্ক ম্যাটার ম্যাপিংয়ের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ক্ষুদ্র পরিমাপ-ত্রুটি ও সিস্টেম্যাটিক বায়াস। টেলিস্কোপের অপটিক্যাল বিকৃতি, বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব (ভূ-পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণে), গ্যালাক্সির অন্তর্নিহিত আকার-বৈচিত্র্য ইত্যাদি লেন্সিং সিগন্যালকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ডেটা-ক্যালিব্রেশন, ক্রস-চেক ও বহুমাত্রিক পর্যবেক্ষণ একত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি:
মানচিত্র যত সূক্ষ্ম হচ্ছে, ততই প্রশ্ন জোরালো,ডার্ক ম্যাটার আসলে কী? এটি কি কোনো নতুন কণিকা, নাকি মাধ্যাকর্ষণের বিকল্প তত্ত্ব প্রয়োজন? ম্যাপিংয়ের অগ্রগতি কণিকাভিত্তিক পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে তত্ত্ব-নির্বাচন সহজ হতে পারে। বৃহৎ-স্কেল বণ্টনের ক্ষুদ্র বিচ্যুতি বিভিন্ন তত্ত্বের পূর্বাভাস আলাদা করতে সাহায্য করে।

আগামী প্রজন্মের গভীর-আকাশ জরিপ, উচ্চ-রেজোলিউশনের লেন্সিং বিশ্লেষণ এবং বহুবর্ণালী পর্যবেক্ষণ একত্রে ডার্ক ম্যাটারের ত্রিমাত্রিক, সময়-নির্ভর মানচিত্র তৈরি করতে পারে। এতে বোঝা যাবে, কীভাবে প্রাথমিক অস্থিরতা থেকে আজকের জটিল কসমিক ওয়েব তৈরি হলো, এবং এই অদৃশ্য ভর তার কেন্দ্রে কীভাবে কাজ করেছে।

শেষ পর্যন্ত, ডার্ক ম্যাটার ম্যাপিং কেবল অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করার প্রচেষ্টা নয়। এটি মহাবিশ্বের নকশা বোঝার চেষ্টা। আলো যেখানে থেমে যায়, সেখানে মাধ্যাকর্ষণের সূক্ষ্ম ছাপই আমাদের পথ দেখাচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ