{{ news.section.title }}
বেলের শরবত: হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে, শরীর ঠান্ডা রাখতে কার্যকর পানীয়
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, কেন একটি ফলকে প্রকৃতি এমন এক বর্ম দিয়ে ঢেকে রেখেছে যে তা ভাঙতে হাতুড়ি লাগে! উত্তরটা লুকিয়ে আছে এর ভেতরের অমূল্য উপাদানে। প্রাচীন কবিরাজরা বেলকে বলতেন শ্রীফল বা সমৃদ্ধির ফল, আর আধুনিক বিজ্ঞানীরা একে বলছেন বায়োলজিক্যাল শিল্ড। যখন বাইরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায় এবং আপনার অন্ত্রের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, ঠিক তখনই এই পাথুরে ফলটিই হয়ে ওঠে শরীরের রক্ষাকর্তা। এটি কেবল একটি ফল নয়, এটি তপ্ত গ্রীষ্মে আমাদের শরীরের ভেতরের সারভাইভাল কিট।
পরিচয়:
বেলের বৈজ্ঞানিক নাম Aegle marmelos। এটি রুটেসি (Rutaceae) গোত্রের একটি বৃক্ষ, যা ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকভাবে জন্মায়। শক্ত খোসা, সুগন্ধি শাঁস এবং আঁশযুক্ত গঠন, এই বৈশিষ্ট্যে বেলকে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। গাছটি খরা-সহনশীল, অল্প যত্নেও বেড়ে ওঠে। ফলে পরিবেশগত দিক থেকেও এটি বেশ টেকসই ফল হিসেবে বিবেচিত। শুধু ফল নয়, বেলের পাতা, বাকল ও বীজও ঐতিহ্যগত ভেষজ ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গ্রীষ্মে শরীর ঠান্ডা রাখে কীভাবে?
গরমে শরীরের প্রধান সমস্যা দুটি। অতিরিক্ত তাপ ও পানিশূন্যতা। বেলের শাঁসে প্রাকৃতিক শর্করা, জলীয় উপাদান ও ইলেকট্রোলাইটজাতীয় খনিজ উপাদান থাকে, যা শরীরের তরল ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। বেলের শরবত দীর্ঘদিন ধরে গ্রীষ্মের পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পেছনে কেবল স্বাদ নয়, রয়েছে কিছু যুক্তিও। যেমন, এতে থাকা প্রাকৃতিক পেকটিন ও মিউসিলেজ উপাদান অন্ত্রে শীতল প্রলেপ তৈরি করে। শরীরের অতিরিক্ত তাপজনিত অস্বস্তি কমাতে এটি সহায়ক। এটি হালকা শক্তিদায়ী শর্করা, যা দ্রুত শক্তি জোগায় কিন্তু রক্তে হঠাৎ করেই শর্করার মাত্রা বাড়ায় না। তাপদাহের সময় যখন ঘাম দিয়ে সোডিয়াম-পটাশিয়াম বেরিয়ে যায়, তখন বেল শরবত শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। এটি কৃত্রিম সফট ড্রিঙ্কের বিকল্প হিসেবে অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত।
কার্যকারিতা:
গ্রীষ্মে অনিয়মিত খাবার, দূষিত পানি বা অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাদ্যের কারণে পেটের সমস্যা বাড়ে। বেল এখানে কাজ করে একাধিক স্তরে।
১️। ডায়রিয়া ও আমাশয়ে সহায়ক: অপরিপক্ব (কাঁচা) বেল দীর্ঘদিন ধরে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর ট্যানিন উপাদান অন্ত্রের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে এবং মলকে ঘন করতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত তরল নির্গমন কমে।
২️। কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকার:পাকা বেলের আঁশ ও পেকটিন অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। এটি মল নরম করে এবং অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে।
৩️। গাট মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য: বেলের মধ্যে থাকা কিছু বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম সঠিক থাকলে হজম, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য:
গরমে শরীরের জলীয় অংশ কমে গেলে মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, অবসাদ দেখা দেয়। বেল শরবত পান করলে শরীর দ্রুত তরল পায়, হালকা শক্তি সরবরাহ হয়, পেট ভারি লাগে না, গ্যাস বা অম্লতা কম হয়। এটি শিশু ও বৃদ্ধ দুই বয়সের জন্যই সহনীয় একটি পানীয়।
বেলে পাওয়া যায় ভিটামিন সি, বিটা-ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, আঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ ইত্যাদি। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ফ্রি র্যাডিক্যাল কমাতে সহায়তা করে, যা কোষের ক্ষয় ও প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখে। গরমে সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব কমাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় বেল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও গ্যাস্ট্রোপ্রটেকটিভ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু লোকবিশ্বাস নয়, এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে।
কারা সতর্ক থাকবেন?
যদিও বেল উপকারী, তবুও কিছু বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।যেমন -
১। অতিরিক্ত পাকা বেল বেশি খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়তে পারে।
২। ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত, কারণ এতে প্রাকৃতিক শর্করা আছে।
৩। দীর্ঘমেয়াদি পেটের রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিবেশবান্ধব ফল হিসেবে বেল:
বেল গাছ কম পানি চায়, খরায় টিকে থাকে এবং দীর্ঘজীবী। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সময় এটি একটি টেকসই ফলগাছ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এর চাহিদা মৌসুমি হলেও স্থিতিশীল।
বেল শরবতের প্রস্তুতপ্রনালী:
পাকা বেল ভেঙে শাঁস বের করে পানিতে ভিজিয়ে ভালোভাবে চটকে ছেঁকে নিতে হয়। অতিরিক্ত চিনি না দিয়ে সামান্য গুড় ব্যবহার করলে এটি আরও পুষ্টিকর হয়। বরফের পরিবর্তে ঠান্ডা পানি ব্যবহার করাই ভালো, যাতে হঠাৎ গলায় চাপ না পড়ে।
গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহে যখন কৃত্রিম পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার শরীরকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করতে পারে, তখন বেল হয়ে উঠতে পারে একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও উপকারী বিকল্প।শরীর ঠান্ডা রাখা, হজম ঠিক রাখা, অন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বেলের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।