নোমোফোবিয়া এখন পরিচয় সংকটের অপর নাম!

নোমোফোবিয়া এখন পরিচয় সংকটের অপর নাম!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

মনে মনে একটু কল্পন করুন ,আপনি মাঝ সমুদ্রে আছেন আর হঠাৎ করেই আপনার অক্সিজেন সিলিন্ডারটি কাজ করা বন্ধ করে দিল। সেই মুহূর্তে ঠিক যে তীব্র এক আতঙ্ক ফুটে উঠবে আপনার মধ্যে তা যেন আপনার ফুসফুসও অনুভব করবে! পকেটে ফোন না থাকলে আধুনিক মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক সেই একই সংকেত পাঠায়। একে বলা হয় ডিজিটাল অক্সিজেন কেড়ে নেওয়ার ভয়। নোমোফোবিয়া কেবল একটি ভয় নয়, এটি আমাদের বিবর্তনের এক অদ্ভুত মোড়। কেন একটি কাঁচ আর প্লাস্টিকের যন্ত্র না থাকলে আপনার হৃদস্পন্দন এমনভাবে বেড়ে যায় যেন কোনো শিকারী প্রাণী আপনাকে তাড়া করছে? আপনার অস্তিত্ব কি তবে এখন ৫ ইঞ্চির ওই স্ক্রিনটার ভেতরেই বন্দি হয়ে গেছে?

নোমোফোবিয়া আসলে কী?
নোমোফোবিয়া কোনো আনুষ্ঠানিক মানসিক রোগের তালিকায় আলাদা করে স্বীকৃত নয়, তবে মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে আচরণগত আসক্তির একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করছেন। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো ফোন হারানোর ভয়, নেটওয়ার্ক না থাকলে অস্থিরতা, ব্যাটারি কমে গেলে উদ্বেগ, ফোন ছাড়া বাইরে যেতে অনীহা, সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আতঙ্ক ইত্যাদি। অনেকেই ভাবেন, ফোন ছাড়া থাকতে না পারা তো স্বাভাবিক! কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্বাভাবিকতা কোথায় শেষ হয়, আর আসক্তি কোথায় শুরু?

মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে?
মানব মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের এক রাসায়নিক পদার্থ আছে, যা আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক মাধ্যমে লাইক, মেসেজ, নোটিফিকেশন সবকিছুই ছোট ছোট পুরস্কারের মতো কাজ করে। প্রতিবার ফোন হাতে নিলে, মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষণিক উত্থান ঘটে। এই পুনরাবৃত্তি এক ধরনের ডিজিটাল রিওয়ার্ড লুপ তৈরি করে।ফলাফল? ফোন না থাকলে মস্তিষ্ক যেন সেই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় অস্থিরতা।

কেন এটি ভয় হয়ে দাঁড়ায়?
নোমোফোবিয়া কেবল প্রযুক্তিনির্ভরতা নয়। এর পেছনে রয়েছে বেশকিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

যেমন-
১. সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়। এখনকার যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ডিজিটাল।

২. তথ্য হারানোর আতঙ্ক। তাৎক্ষণিক আপডেটের যুগে কেউই খবর, মেসেজ বা ইমেইল মিস করতে চান না।

৩. আত্মপরিচয়ের সঙ্গে সংযোগ। অনেকের কাছে ফোন শুধু যন্ত্র নয়, এটি স্মৃতি, ছবি, ব্যক্তিগত আলাপ, পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের ধারক।

কাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর ও তরুণদের মধ্যেই নোমোফোবিয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা বা সমবয়সীদের সঙ্গে ক্রমাগত সংযোগের চাপ এবং ভার্চুয়াল পরিচয়ের গুরুত্ব। তবে প্রাপ্তবয়স্করাও এ থেকে মুক্ত নন। কর্মক্ষেত্রে ইমেইল, মিটিং, আপডেট সবই তো এখন মোবাইলনির্ভর।

এটি কি সত্যিই আসক্তি?
আসক্তির কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন:

⇨ নিয়ন্ত্রণ হারানো।

⇨ ব্যবহার কমাতে না পারা।

⇨ ব্যবহার না করলে মানসিক অস্বস্তি।

⇨ দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব।

যদি ফোন ব্যবহারের কারণে আপনার ঘুম কমে যায়, কাজের মনোযোগ নষ্ট হয় বা পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বিষয়টি আপনার সাধারণ অভ্যাসের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

শারীরিক ও মানসিক প্রভাব:
নোমোফোবিয়ার প্রভাব কেবল মানসিক নয়, শারীরিকও হতে পারে-
⇨ ঘুমের সমস্যা: রাতে স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুমের চক্র ব্যাহত হয়।

⇨ উদ্বেগ ও প্যানিক- ফোন না থাকলে অনেকের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের লক্ষণ দেখা যায়।

⇨ মনোযোগের ঘাটতি- নিরবচ্ছিন্ন নোটিফিকেশন মনোযোগ ভেঙে দেয়, গভীর চিন্তাশক্তি কমায়।

সামাজিক জীবনে প্রভাব:
একটি বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। ফোন আমাদের সংযুক্ত রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে বিচ্ছিন্নও করে ফেলে।পারিবারিক আড্ডা, বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ সবকিছুতেই চোখ থাকে স্ক্রিনে। ফাবিং নামে পরিচিত একটি আচরণ অর্থাৎ, কারও সঙ্গে কথা বলার সময় ফোনে ডুবে থাকা সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করছে।

নোমোফোবিয়া কি মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে?
বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক মানসিক রোগ শ্রেণিবিন্যাসে আলাদা রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়। তবে আচরণগত আসক্তি নিয়ে গবেষণা বাড়ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভরতা ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য আলোচনায় আরও বড় জায়গা নেবে।

মুক্তির উপায় কী?
নোমোফোবিয়া রাতারাতি দূর হয় না। তবে কয়েকটি কৌশল কার্যকর হতে পারে-

☞ নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন। ফোন ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন।

☞ নোটিফিকেশন সীমিত করুন। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।

☞ ডিজিটাল ডিটক্স নিন।সপ্তাহে অন্তত একদিন কয়েক ঘণ্টা ফোন ছাড়া থাকার অনুশীলন করুন।

☞ বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলুন। বই পড়া, হাঁটা, সরাসরি আলাপ ইত্যাদি ডিজিটাল নির্ভরতা কমাতে সহায়ক।

চ্যালেঞ্জ:
প্রযুক্তি থেমে থাকবে না। বরং আরও স্মার্ট, আরও সংযুক্ত পৃথিবী আমাদের দিকে এগোচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে? নোমোফোবিয়া আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিকেই তুলে ধরছে।

ফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যোগাযোগ সহজ করেছে, তথ্যপ্রবাহ দ্রুত করেছে, জীবনকে গতিশীল করেছে। কিন্তু যখন এই যন্ত্রটি ছাড়া নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হয় তখন বিষয়টি কেবল অভ্যাস নয়, মানসিক নির্ভরতার সংকেত।


সম্পর্কিত নিউজ