{{ news.section.title }}
মৌমাছি কীভাবে নাচের মাধ্যমে একে অপরকে খবর দেয়!
ফুলবাগানে মৌমাছির ওড়াউড়ি আমাদের চোখে যতটা এলোমেলো মনে হয়, তাদের জগত আসলে ততটাই সুশৃঙ্খল এবং গাণিতিক। মৌমাছিরা শুধু মধু সংগ্রহকারী পতঙ্গ নয়, তারা প্রকৃতির এক দক্ষ নেভিগেটর এবং সংবাদকর্মী। অন্ধকার চাকের ভেতরে একটি মৌমাছি যখন অন্য সঙ্গীদের জানায় যে ঠিক কোথায় সেরা মধু পাওয়া যাবে, তখন সে কোনো শব্দ না করে, নেচে নেচে বুঝিয়ে দেয় সেই ঠিকানা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ওয়াগল ড্যান্স (Waggle Dance)।
মৌমাছিরা প্রধানত দুই ধরনের নাচের মাধ্যমে বার্তা দেয়। রাউন্ড ড্যান্স (Round Dance) এবং ওয়াগল ড্যান্স (Waggle Dance)। খাদ্য উৎস কত দূরে, তার ওপর নির্ভর করে কোন নাচ ব্যবহার হবে।
কাছাকাছি খাদ্য ও রাউন্ড ড্যান্স!
যদি খাদ্য উৎস চাকের কাছেই অর্থাৎ প্রায় ৫০-১০০ মিটারের মধ্যে তাহলে কর্মী মৌমাছি বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। এই নাচে দিক নির্দেশনা নেই, আছে কেবল খাবার খুজে পাওয়ার বার্তা! অন্য মৌমাছিরা তখন গন্ধ অনুসরণ করে উৎস খুঁজে নেয়। অর্থাৎ, এখানে দূরত্ব ও গন্ধই প্রধান সংকেত।
দূরের খাদ্য ও ওয়াগল ড্যান্স!
খাদ্য উৎস যদি দূরে হয় তখন শুরু হয় আসল বিস্ময়।
ওয়াগল ড্যান্সে মৌমাছি একটি ফিগার-এইট বা আটের মতো আকৃতি আঁকে। মাঝখানে সরলরেখায় এগোনোর সময় সে পেট দ্রুত দোলায়। এটিই ওয়াগল অংশ। এই অংশের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
১। দিকনির্দেশ: ওয়াগল অংশটি চাকের ভেতরে যে কোণে করা হয়, তা সূর্যের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ধরা যাক, চাকের ভেতরে উল্লম্ব রেখা সূর্যের দিক নির্দেশ করে। যদি মৌমাছি সেই রেখা থেকে ৩০ ডিগ্রি ডানে হেলে নাচে, তার মানে খাদ্য উৎস সূর্যের দিক থেকে ৩০ ডিগ্রি ডানে। অর্থাৎ অন্ধকার চাকের ভেতরেও সূর্যকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়।এ যেন এক জীবন্ত জ্যামিতি!
২। দূরত্ব: ওয়াগল অংশ যত দীর্ঘ সময় ধরে চলে, খাদ্য উৎস তত দূরে।
কম সময় মানে কাছাকাছি, বেশি সময় মানে দূরবর্তী। মৌমাছির শরীর যেন হয়ে ওঠে চলন্ত স্কেল।
৩। খাদ্যের মান: দোলার তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তির হার জানিয়ে দেয় খাদ্যের গুণমান।
মধু বেশি মিষ্টি বা ফুলে নেক্টার বেশি হলে নাচ হয় অধিক প্রাণবন্ত।
সূর্য, সময় ও স্মৃতি!
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, মৌমাছিরা সূর্যের চলমান অবস্থান হিসাব করে। দিনের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের কোণ বদলায়। কিন্তু মৌমাছি তার অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ির মাধ্যমে সময় বুঝে নেয় এবং সেই অনুযায়ী নাচের কোণ সামঞ্জস্য করে। অর্থাৎ, এটি শুধু স্থানজ্ঞান নয়, সময়জ্ঞানও।
অন্ধকারে দেখা, স্পর্শে বোঝা!
চাকের ভেতর প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার। তাহলে অন্য মৌমাছিরা কীভাবে এই নাচ দেখে? তারা মূলত স্পর্শ ও কম্পন দিয়ে তথ্য নেয়। অ্যান্টেনা বা শুঁড় দিয়ে নাচ করা মৌমাছির শরীর ছুঁয়ে তার দিক ও গতি অনুভব করে। এটি শব্দের ভাষা নয়, আলোর ভাষা নয়, এটি কম্পনের ভাষা।
প্রাণিজগতে যোগাযোগের নানা পদ্ধতি আছে। যেমন- ডাক, গন্ধ, রং পরিবর্তন, এমনকি বিদ্যুৎ সংকেতও। কিন্তু মৌমাছির ওয়াগল ড্যান্স একেবারেই অনন্য।এটি এমন এক প্রতীকী যোগাযোগব্যবস্থা, যেখানে শরীরের কোণ, সময়কাল ও গতি সব মিলিয়ে গঠিত হয় অর্থবহ বার্তা। এই জটিলতা প্রমাণ করে, ক্ষুদ্র দেহের ভেতরেও উন্নত স্নায়ুতন্ত্র কাজ করে।
পরিবেশ ও কৃষিতে গুরুত্ব:
মৌমাছি কেবল মধু দেয় না, তারা পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্য উৎস দ্রুত ও কার্যকরভাবে খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা পুরো উপনিবেশকে বাঁচিয়ে রাখে। যদি এই যোগাযোগব্যবস্থা কীটনাশক বা পরিবেশ দূষণে ব্যাহত হয় তাহলে পুরো বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব পড়তে পারে।
প্রযুক্তি কি অনুকরণ করতে পেরেছে?
রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় গবেষকরা মৌমাছির এই সমন্বিত আচরণ অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন। “স্বর্ম ইন্টেলিজেন্স” ধারণাটি মৌমাছির সমাজ থেকেই অনুপ্রাণিত। সেখানে অনেক ক্ষুদ্র ইউনিট মিলিতভাবে বড় কাজ সম্পন্ন করে।