সাবধান! ভিকটিম ব্লেইমিং একজন মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে!

সাবধান! ভিকটিম ব্লেইমিং একজন মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

একটি দুর্ঘটনা বা সহিংসতা মানুষের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে, কিন্তু সমাজের বাঁকা প্রশ্নগুলো ক্ষতবিক্ষত করে তার আত্মাকে। একে বলা হয় সেকেন্ডারি ভিকটিমাইজেশন। অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বদলে যখন ভিকটিমের পোশাক, সময় বা আচরণ নিয়ে কাটাছেঁড়া করা হয়, তখন সমাজ আসলে পরোক্ষভাবে অপরাধীকেই সুরক্ষা দেয়।

ভিকটিম ব্লেইমিং কী?
ভিকটিম ব্লেইমিং হলো এমন একটি প্রবণতা, যেখানে কোনো অপরাধ, দুর্ঘটনা বা নির্যাতনের জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই দায়ী করা হয়। অপরাধীর কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য না দিয়ে বরং ভিকটিমের আচরণ, পোশাক, অতীত, পরিবেশ বা সিদ্ধান্তকে দায়ী করার চেষ্টা করা হয়। এটি প্রকাশ পেতে পারে নানা ভাষায়। যেমন:“ওরই তো দোষ ছিল”, “আরেকটু সাবধান হলেই তো বাঁচত”,“ওর চরিত্র এমনিতেই সন্দেহজনক”,“এত নাটক করার কী আছে?” ইত্যাদি। এই ধরনের কথাগুলো বাহ্যিকভাবে সাধারণ মনে হলেও, এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানসিক অবস্থায় দ্বিতীয় আঘাত হানে।

অপরাধের দায় কার?
একটি মৌলিক নৈতিক সত্য হলো অপরাধের দায় অপরাধীর। কোনো ব্যক্তি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, অসতর্ক হতে পারেন, কিন্তু সেটি কখনোই অন্যের অপরাধকে বৈধতা দিতে পারেনা। যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রায়শই শোনা যায়, পোশাকের কারণে হয়েছে বা রাতে বাইরে ছিল কেন! কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের সমাজে শিশু, বয়স্ক, পুরুষ, নারী সব বয়স ও লিঙ্গের মানুষই এমন অপরাধের শিকার হয়ে থাকেন। সেখানে পোশাক বা সময়ের যুক্তি খাটে না। এ ধরনের বক্তব্য আসলে অপরাধের গুরুত্বকে খাটো করে এবং অপরাধীকে আড়াল করে রাখে।

কেন মানুষ ভিকটিমকে দোষ দেয়?
মানুষ স্বভাবতই বিশ্বাস করতে চায় পৃথিবী ন্যায়সংগত। যে ভালো করবে সে ভালো ফল পাবে, যে খারাপ করবে সে শাস্তি পাবে। কিন্তু যখন কোনো নিরীহ ব্যক্তি বিপদের শিকার হন, তখন এই বিশ্বাসে ধাক্কা লাগে। নিজের নিরাপত্তাবোধ বজায় রাখতে মানুষ মনে মনে যুক্তি বানায়, নিশ্চয়ই সে কিছু ভুল করেছিল। এটি আত্মরক্ষামূলক মানসিক কৌশল।

আবার যাকে আমরা আগে থেকেই অপছন্দ করি বা সন্দেহ করি, তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আমরা তার পুরোনো ভুলগুলো সামনে নিয়ে আসি। এই মানসিক প্রবণতা সত্যের চেয়ে নিজের বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেয়। জাতিগত, ধর্মীয়, লিঙ্গভিত্তিক বা মতাদর্শগত বিদ্বেষ ভিকটিম ব্লেইমিংকে আরও তীব্র করে তোলে। যাকে আমরা ‘অন্য’ ভাবি, তার প্রতি সহমর্মিতা কম থাকে।

ভিকটিমের উপর মানসিক প্রভাব:
ভিকটিম ব্লেইমিং একটি সেকেন্ডারি ট্রমা তৈরি করে। প্রথম আঘাত ছিল অপরাধ বা দুর্ঘটনা। দ্বিতীয় আঘাত আসে সমাজের সন্দেহ ও দোষারোপ থেকে। এর ফল হতে পারে আত্মগ্লানি, বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আত্মহত্যার প্রবণতা, আত্মবিশ্বাস হারানো ইত্যাদি। একজন মানুষ যখন নিজের পরিবার বা কাছের মানুষদের কাছ থেকেও সমর্থন না পায়, তখন তার নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ে।

পরিবারে ভিকটিম ব্লেইমিং:
শুধু বড় অপরাধ নয়, ছোট পারিবারিক ঘটনাতেও এটি ঘটে। সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে, কারণ খোঁজার বদলে সরাসরি দোষারোপ করা হয়। কোনো শিশু মারামারির শিকার হলেও পরিবারে অনেকসময়  ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের শিকার হয়। এতে শিশুর বিচারবোধ ও আত্মপরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে তার মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, ভুল না করলেও তাকে দোষ দেওয়া হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত মতামত দেওয়ার সংস্কৃতি ভিকটিম ব্লেইমিং বাড়িয়ে তুলেছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া মন্তব্য, বিদ্রূপ বা অপপ্রচার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক অবস্থা আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, প্রথম দফার ধারণাগুলো ভুল ছিল। কিন্তু ততক্ষণে মানসিকভাবে অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।

কেন এটি পরিহার করা জরুরি?
এটি অপরাধীকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করে তোলে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে দূরে ঠেলে দেয়। সমাজে অবিশ্বাস ও ভীতি বাড়ায়।সহমর্মিতাহীন সংস্কৃতি তৈরি করে। কারণ, একটি অস্থিতিশীল সমাজে কেউই নিরাপদ নয়।

যদি কেউ ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের শিকার হন,
নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিন, আপনি দোষী নন। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করবেন না। রাগ, হতাশা এসব স্বাভাবিক। সহমর্মী মানুষের সঙ্গ নিন।

নেতিবাচক পরিবেশ ও অনলাইন আক্রমণ থেকে দূরে থাকুন। প্রয়োজনে পেশাদার মানসিক সহায়তা নিন। নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভিকটিম ব্লেইমিং কেবল একটি ভুল অভ্যাস নয়। এটি সামাজিক সহিংসতার অংশ।এটি বন্ধ করতে আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানসিক পরিবর্তন।


সম্পর্কিত নিউজ