{{ news.section.title }}
কোন দেশে সূর্য অস্ত যায় না? জানুন কারণ
আমরা জানি, দিনের শেষে রাত আসে। আর এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্রের একদম মাথায় এমন কিছু দেশ আছে, যেখানে গ্রীষ্মকালে প্রকৃতি তার নিজের নিয়ম ভাঙতে শুরু করে। ঘড়ির কাঁটা মাঝরাত পেরিয়ে যায়, অথচ আকাশ জুড়ে থাকে তপ্ত বিকেলের মায়াবী আলো। সূর্য দিগন্তের একদম কাছে গিয়ে যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে বাধা পায়, ডুবে যাওয়ার বদলে আবার উপরে উঠতে শুরু করে। একেই বলে মিডনাইট সান। কিন্তু কেন এই গোলার্ধের মানুষগুলো মাসের পর মাস অন্ধকার দেখতে পায় না! এটি কি পৃথিবীর এক ভৌগোলিক বিস্ময়, নাকি আমাদের সৌরজগতের এক অনন্য জ্যামিতিক খেলা!
পৃথিবীর মানচিত্রে ৬৬.৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে যে কল্পিত রেখা রয়েছে, সেটিই আর্কটিক সার্কেল। এই রেখার ভেতরে গ্রীষ্মকালীন অয়ন (সাধারণত জুন মাসে) সূর্য ২৪ ঘণ্টা আকাশের নিচে নামে না।উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নরওয়ের উত্তরের শহর ট্রমসো বা স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের কথা, প্রায় দুই মাস পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না। সেখানে রাত ১২টায়ও সূর্য দিগন্তের কাছে সোনালি আলো ছড়িয়ে থাকে।
কেন ঘটে এই ঘটনা?
পৃথিবী তার অক্ষের ওপর প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে আছে। এই হেলনই ঋতু পরিবর্তনের কারণ।গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। এর ফলে আর্কটিক অঞ্চলে সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে এবং ঘূর্ণনের সময়ও সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না। অন্যদিকে, শীতকালে ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে,তখন টানা কয়েক সপ্তাহ সূর্য ওঠেই না। একে বলা হয় পোলার নাইট।
শুধু উত্তরেই নয়, দক্ষিণেও!
উত্তর মেরুর মতো দক্ষিণ মেরু অঞ্চল, আন্টার্টিকাতেও একই ঘটনা ঘটে। তবে তা ঘটে বিপরীত ঋতুতে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সেখানে সূর্য অস্ত যায় না, আর জুন-জুলাইয়ে টানা অন্ধকার থাকে।
মানুষ ও প্রকৃতির ওপর প্রভাব:
১. জৈবঘড়ির পরিবর্তন হয়ে যায়। মানুষের শরীরে সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়ি আলো-অন্ধকারের ওপর নির্ভর করে। টানা আলো থাকলে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
২. মানসিক প্রভাব পড়ে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আলো উদ্যম বাড়ায়, আবার কারও ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
৩. পর্যটনের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। মধ্যরাতের সূর্য দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে ভিড় করেন। মধ্যরাতে পাহাড়ে হাইকিং বা সমুদ্রে কায়াকিং সবই সম্ভব সূর্যের আলোয়।
দিন-রাতের সীমা যেখানে মুছে যায়:
ধরা যাক, ঘড়িতে রাত বাজে ১টা। কিন্তু জানালার বাইরে রোদের ঝলকানি। শিশুরা খেলছে, মানুষ কাজ করছে, কোথাও কোনো অন্ধকার নেই। এমন অভিজ্ঞতা শুধু প্রকৃতির বৈচিত্র্য নয়। এটি পৃথিবীর জ্যামিতিক অবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। এই অঞ্চলগুলোতে বাড়িতে ঘুমের জন্য ব্ল্যাকআউট পর্দা ব্যবহার করা হয়, যাতে কৃত্রিমভাবে অন্ধকার তৈরি করা যায়।
কতদিন সূর্য অস্ত যায় না?
সময় নির্ভর করে অবস্থানের ওপর। আর্কটিক সার্কেলের ঠিক ভেতরে কয়েকদিন, মেরুর কাছে গেলে কয়েক সপ্তাহ বা মাস আর উত্তর মেরুতে প্রায় ছয় মাস সূর্য অস্ত যায় না, আর ছয় মাস সূর্য ওঠে না।
পৃথিবীর কৌতূহলী বিস্ময়!
পৃথিবীর অক্ষের সামান্য হেলনই সৃষ্টি করেছে এমন নাটকীয় আলোক-বৈচিত্র্য। এক প্রান্তে যখন দীর্ঘ রাত, অন্য প্রান্তে তখন অন্তহীন দিন। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দিন ও রাতের অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক নয়। ভৌগোলিক অবস্থান বদলালে সময়ের অনুভূতিও বদলে যায়।
একটি দেশে বা অঞ্চলে পুরো মাস সূর্য অস্ত যায় না! এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্বাভাবিক ফল। পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অক্ষের হেলনের কারণে মেরু অঞ্চলে সৃষ্টি হয় এই মিডনাইট সান। রাতহীন সেই সময় হয়তো আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের বাইরে, কিন্তু তা পৃথিবীর প্রকৃতিগত ভারসাম্যের অংশ। যেখানে সূর্য ডোবে না, সেখানে সময় যেন অন্যভাবে বয়ে যায়। দিগন্তে ঝুলে থাকা আলো মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী আসলে কত বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর।