{{ news.section.title }}
ঘরেই পেয়ারার জেলি ও জুস বানানোর সহজ রেসিপি!
আমরা যখন দোকানের লাল নীল জেলি কিনি, তখন স্বাদের চেয়ে কৃত্রিম রঙ আর প্রিজারভেটিভই বেশি শরীরে প্রবেশ করাই। কিন্তু আপনি কি জানেন, পেয়ারা হলো এমন এক বিস্ময়কর ফল যাতে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পেকটিন থাকে? এই পেকটিনই কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল ছাড়াই জেলিকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। পেয়ারা থেকে কীভাবে সেই স্বচ্ছ, টকটকে লাল আর সুগন্ধি নির্যাস বের করে আনতে হয়, আর কোন ভুলে জেলি শক্ত বা বেশি পাতলা হয়ে যায় আজ আমরা শিখব সেই নিখুঁত শিল্প।
পেয়ারা বাছাই হলো ভালো রেসিপির প্রথম শর্ত!
ভালো জেলি বা জুস তৈরির মূল চাবিকাঠি হলো সঠিক পেয়ারা নির্বাচন। খুব কাঁচা পেয়ারা স্বাদে তিতা হতে পারে, আবার অতিরিক্ত পাকা পেয়ারা জেলির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ঘনত্ব নাও দিতে পারে। জেলির জন্য পেয়ারা বাছাই হালকা কাঁচা থেকে আধাপাকা পেয়ারা জেলির জন্য বেশি উপযোগী। এই অবস্থায় পেয়ারায় প্রাকৃতিক পেকটিনের পরিমাণ বেশি থাকে, যা জেলি জমতে সাহায্য করে। জুসের জন্য পেয়ারা বাছাই ভালোভাবে পাকা, সুগন্ধি ও রসালো পেয়ারা জুসের জন্য আদর্শ। এতে স্বাভাবিক মিষ্টতা বেশি থাকে, ফলে অতিরিক্ত চিনি কম ব্যবহার করা যায়। পেয়ারার গায়ে দাগ, পচন বা অতিরিক্ত নরম ভাব থাকলে সেগুলো বাদ দেওয়াই ভালো।
পরিষ্কার ও প্রস্তুতি:
পেয়ারা ভালোভাবে পরিষ্কার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর খোসায় ধুলো ও ময়লা লেগে থাকতে পারে। প্রথমে পেয়ারা পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে হালকা ব্রাশ ব্যবহার করা যায়। এরপর খোসাসহ টুকরো করে কেটে নিতে হবে। জেলির ক্ষেত্রে খোসা ছাড়ানো হয় না, কারণ খোসাতেই পেকটিনের একটি বড় অংশ থাকে। জুসের ক্ষেত্রে চাইলে খোসা ছাড়ানো যায়, তবে খোসাসহ করলে পুষ্টি বেশি থাকে।
পেয়ারা জেলি তৈরির বিস্তারিত রেসিপি:
উপকরণ:
☞ পেয়ারা, পানি, চিনি (পরিমিত)
☞ লেবুর রস (অল্প)
প্রস্তুতপ্রণালী :
☞ পেয়ারা সিদ্ধ করা: কাটা পেয়ারা একটি পুরু তলার পাত্রে নিয়ে তার পরিমাণ অনুযায়ী পানি যোগ করতে হবে। পানি এতটাই দিতে হবে, যাতে পেয়ারা ডুবে যায়। মাঝারি আঁচে পেয়ারা সিদ্ধ করতে হবে। এই সময় ঢাকনা আধখোলা রাখা ভালো। পেয়ারা নরম হয়ে এলে বুঝতে হবে সিদ্ধ হয়েছে। অতিরিক্ত সিদ্ধ করলে রং ও স্বাদ নষ্ট হতে পারে। এই ধাপে পেয়ারা থেকে রস, স্বাদ ও প্রাকৃতিক পেকটিন পানিতে বেরিয়ে আসে, যা জেলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
☞ রস ছেঁকে নেওয়া: সিদ্ধ পেয়ারা ঠান্ডা হলে একটি পরিষ্কার পাতলা কাপড় বা ছাঁকনি দিয়ে রস আলাদা করতে হবে। এখানে চাপ দিয়ে চটকে দেওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে ছেঁকতে হবে। চাপ দিলে পেয়ারার পাল্প ও দানার অংশ রসে মিশে যায়, ফলে জেলি স্বচ্ছ হয় না। স্বচ্ছতা ও উজ্জ্বল রং হলো ভালো জেলির লক্ষণ।
☞ চিনি যোগ ও জ্বাল দেওয়া: ছেঁকে নেওয়া পেয়ারার রস মেপে নিতে হবে। সাধারণভাবে রস ও চিনি প্রায় সমান অনুপাতে নেওয়া হয়, তবে স্বাদের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি করা যায়। রস ও চিনি একসঙ্গে পাত্রে দিয়ে মাঝারি আঁচে জ্বাল দিতে হবে। নাড়তে হবে নিয়মিত, যাতে তলায় লেগে না যায়। এই ধাপে ধীরে ধীরে রস ঘন হতে শুরু করবে। ফেনা উঠলে তুলে ফেলে দিলে জেলি আরও পরিষ্কার হবে।
☞ লেবুর রস ও জেলি পরীক্ষা: শেষ দিকে অল্প লেবুর রস যোগ করতে হবে। এটি জেলি জমতে সাহায্য করে এবং স্বাদে হালকা টান আনে। জেলি প্রস্তুত কিনা বোঝার সহজ উপায় হলো এক ফোঁটা জেলি ঠান্ডা প্লেটে ফেলে দেখুন। যদি গড়িয়ে না পড়ে, বরং একটু জমে যায়, তাহলে জেলি তৈরি।
☞ সংরক্ষণ: গরম অবস্থায় জীবাণুমুক্ত কাচের বোতলে জেলি ঢেলে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। ঠান্ডা হলে জেলি নিজে থেকেই সেট হয়ে যাবে। ঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে পেয়ারা জেলি কয়েক মাস পর্যন্ত ভালো থাকে।
পেয়ারা জুস তৈরির বিস্তারিত রেসিপি:
উপকরণ:
☞ পাকা পেয়ারা,
পানি, চিনি বা মধু (ঐচ্ছিক)
☞ লেবুর রস (ঐচ্ছিক)
☞ এক চিমটি লবণ (স্বাদ অনুযায়ী)
প্রস্তুত প্রণালী :
☞ পেয়ারা ধুয়ে টুকরো করে নিতে হবে। দানা বেশি হলে চাইলে মাঝখানের অংশ আলাদা করা যায়। এই টুকরোগুলো ব্লেন্ডারে দিয়ে অল্প পানি যোগ করে ভালোভাবে ব্লেন্ড করতে হবে। খুব বেশি পানি দিলে জুস পাতলা হয়ে যাবে।
☞ ব্লেন্ড করা মিশ্রণ ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। এতে শক্ত আঁশ ও দানা আলাদা হবে। যারা আঁশযুক্ত জুস পছন্দ করেন, তারা ছাঁকনির ধাপ বাদ দিতে পারেন।
☞ ছেঁকে নেওয়া জুসে স্বাদ অনুযায়ী চিনি বা মধু যোগ করতে হবে। লেবুর রস দিলে জুস আরও সতেজ লাগে। এক চিমটি লবণ দিলে স্বাদ ভারসাম্যপূর্ণ হয়। সব উপাদান ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে।
☞ পরিবেশন: পেয়ারা জুস ঠান্ডা করে খেলে বেশি ভালো লাগে। বরফ যোগ করা যায়, তবে এতে পুষ্টি কিছুটা কমতে পারে।
পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন রাখতে যা খেয়াল রাখবেন:
পেয়ারা দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিলে ভিটামিনের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তাই জেলি বানানোর সময় অতিরিক্ত জ্বাল দেওয়া ঠিক নয়। জুস তৈরির পর দীর্ঘ সময় খোলা রাখলে রং ও স্বাদ নষ্ট হয়। বানানোর পর দ্রুত খেয়ে নেয়াই সবচেয়ে ভালো।
শিশু ও বয়স্কদের জন্য উপযোগিতা:
পেয়ারা জেলি শিশুদের জন্য নিরাপদ বিকল্প মিষ্টান্ন হতে পারে, কারণ এতে কৃত্রিম রং বা সংরক্ষক নেই। বয়স্কদের ক্ষেত্রে চিনি কমিয়ে তৈরি করলে এটি হালকা শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
ভুল ও সতর্কতা:
অনেকেই জেলি ঘন না হওয়ায় হতাশ হন। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত পাকা পেয়ারা ব্যবহার, লেবুর রস না দেওয়া, রস ও চিনির অনুপাত ঠিক না রাখা।শুধুমাত্র এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে জেলি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
পেয়ারা দিয়ে জেলি ও জুস তৈরি মানে শুধু একটি রেসিপি শেখা নয়, বরং ফল সংরক্ষণ ও সচেতন খাদ্যাভ্যাসের একটি শিক্ষা। বাজারের বোতলজাত পণ্যের ভিড়ে ঘরে তৈরি পেয়ারা জেলি ও জুস প্রমাণ করে যে স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই জটিল কিছু নয়।