{{ news.section.title }}
নিউরাল ইমপ্লান্ট কী? মস্তিষ্কে চিপ লাগিয়ে শেখার নতুন যুগ শুরু হল!
জ্ঞান অর্জনের জন্য আর বছরের পর বছর পড়াশোনা নয়, বরং একটি চিপ ইমপ্লান্ট করলেই মস্তিষ্কে ডাউনলোড হয়ে যাবে নতুন কোনো ভাষা বা গণিতের জটিল সূত্র! শুনতে একটু অবিশ্বাস্য মনে হলেও এই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু এই আশীর্বাদের আড়ালে কি কোনো অন্ধকার গহ্বর লুকিয়ে আছে? যদি আপনার মস্তিষ্ক ক্লাউডের সাথে যুক্ত থাকে, তবে কি সেটি হ্যাক করা সম্ভব? নিউরাল ইমপ্লান্ট যখন চিকিৎসা শাস্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মেধা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামবে, তখন ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কি আরও চরম আকার ধারণ করবে?
নিউরাল ইমপ্লান্ট কীভাবে কাজ করে?
মানব মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। প্রতিটি নিউরন বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদান করে। নিউরাল ইমপ্লান্ট মূলত ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড বা সেন্সরের মাধ্যমে এই বৈদ্যুতিক সংকেত পড়তে বা প্রভাবিত করতে পারে।একটি সাধারণ ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস তিনটি ধাপে কাজ করে।
১. সিগন্যাল সংগ্রহ, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ থেকে নিউরাল কার্যকলাপ রেকর্ড করা।
২. ডিকোডিং, সেই সংকেতকে ডিজিটাল তথ্য হিসেবে বিশ্লেষণ করা।
৩. আউটপুট বা স্টিমুলেশন, কম্পিউটার বা অন্য ডিভাইসে নির্দেশ পাঠানো, অথবা মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়ামূলক উদ্দীপনা দেওয়া।
চিকিৎসাক্ষেত্রে পারকিনসন রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (DBS) প্রযুক্তি ইতিমধ্যে কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। যদিও শেখার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োগ এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
স্মৃতি কি আপলোড করা যাবে?
সবচেয়ে আলোচিত একটি প্রশ্ন হলো, নিউরাল ইমপ্লান্ট কি মানুষের শেখার গতিকে বাড়াতে পারবে?
বর্তমান গবেষণা মূলত তিনটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত।
১. স্মৃতি পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালীকরণ। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশ স্মৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা স্মৃতি পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে এটি আলঝেইমার বা ট্রমাজনিত স্মৃতিহীনতার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
২. দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ। যদি নিউরাল সংকেত সরাসরি ডিজিটাল সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণের গতি বাড়তে পারে। যদিও এটি এখনও গবেষণার স্তরে রয়েছে।
৩. পুনর্বাসন ও দক্ষতা শেখা। পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী বা মোটর স্কিল হারানো ব্যক্তিরা নিউরাল ইন্টারফেসের মাধ্যমে ভার্চুয়াল পরিবেশে অনুশীলন করে দক্ষতা পুনরুদ্ধার করতে পারেন। তবে মস্তিষ্কে সরাসরি জ্ঞান ঢুকিয়ে দেওয়া, এমন ধারণা এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। শেখা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে অভিজ্ঞতা, আবেগ, মনোযোগ ও পুনরাবৃত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মস্তিষ্ক কেবল তথ্যের সংগ্রহস্থল নয়। এটি একটি অভিযোজনশীল নেটওয়ার্ক। নিউরোপ্লাস্টিসিটি অর্থাৎ নতুন সংযোগ তৈরি ও পুরোনো সংযোগ শক্তিশালী করার ক্ষমতাই শেখার মূল ভিত্তি। নিউরাল ইমপ্লান্ট যদি এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে, তবে শেখার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত প্রযুক্তিটি মূলত চিকিৎসা পুনর্বাসনে সীমিত রয়েছে। সুস্থ মানুষের শেখার ক্ষমতা বাড়াতে এর নিরাপদ ও কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা চলমান।
ঝুঁকি ও নৈতিক প্রশ্ন:
প্রযুক্তির সঙ্গে যখন সরাসরি মস্তিষ্ক যুক্ত হয়, তখন প্রশ্নও জটিল হয়ে ওঠে।
মস্তিষ্কে ইমপ্লান্ট স্থাপন সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া। এতে সংক্রমণ, টিস্যু ক্ষতি বা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে। আবার যদি মস্তিষ্কের সংকেত পড়া যায়, তবে ব্যক্তিগত চিন্তা বা স্মৃতির গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হবে!দেখা দিতে পারে সামাজিক বৈষম্যও। যদি শেখার ক্ষমতা প্রযুক্তির মাধ্যমে বাড়ানো যায়, তবে এটি কি কেবল ধনী বা প্রযুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?সামনে আসবে পরিচয়ের প্রশ্নও। মানুষের ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি ও চিন্তাই তার পরিচয় বহন করে। প্রযুক্তি যদি এই স্তরে প্রভাব ফেলে, তবে মানবিকতার সংজ্ঞা কি বদলে যাবে!
বর্তমানে গবেষণা কতদূর এগিয়েছে?
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেসের ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। কিছু ক্ষেত্রে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি কেবল চিন্তার মাধ্যমে কার্সর নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন। Neuralink-সহ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মানব পরীক্ষা পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে শেখার ক্ষমতা বাড়ানোর সরাসরি প্রয়োগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণাগারে নিউরাল ডিকোডিং ও স্মৃতি-সংক্রান্ত গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
বাস্তবতা:
নিউরাল ইমপ্লান্ট প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বিপ্লব ঘটাতে পারে। পক্ষাঘাত, স্মৃতিহীনতা বা স্নায়ুবিক ব্যাধিতে এটি আশার আলো নিঃসন্দেহে। তবে সুস্থ মানুষের শেখার ক্ষমতা ত্বরান্বিত করার ধারণা এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে সীমিত ও পরীক্ষামূলক। অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা নয়, বরং তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নটা বেশি জরুরি।
মস্তিষ্ক মানবদেহের সবচেয়ে জটিল এক অঙ্গ। সেখানে প্রযুক্তির সরাসরি সংযোগ একদিকে অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে নৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও সামনে আনছে। নিউরাল ইমপ্লান্ট হয়তো ভবিষ্যতের শিক্ষা ও চিকিৎসাকে নতুন পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু এই পথ হবে খুবই ধীর, গবেষণানির্ভর এবং কঠোর নৈতিক কাঠামোর অধীন।