দুই ভাষায় শিক্ষা: মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর সিঙ্গাপুর মডেল!

দুই ভাষায় শিক্ষা: মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর সিঙ্গাপুর মডেল!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

একটি রাষ্ট্রের কাছে ভাষা কি শুধুই মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম নাকি এটি একটি বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ! সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ যখন দেশটির দায়িত্ব নেন, তখন তিনি জানতেন, সিঙ্গাপুরের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, তাদের একমাত্র সম্পদ হলো মানুষ। আর সেই মানুষকে বিশ্ববাজারের উপযোগী করতে তিনি চালু করেন এক সাহসী শিক্ষা নীতি। আর হলো দ্বি-ভাষিকতা। একদিকে ইংরেজি, যা বিশ্ব বাণিজ্যের চাবিকাঠি, অন্যদিকে মাতৃভাষা, যা এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোর সাথে নাড়ির টান।

ভাষা শেখা মানেই কি শুধু শব্দ শেখা?

ভাষা শেখাকে অনেকেই শুধুমাত্র শব্দভাণ্ডার বা ব্যাকরণের বিষয় মনে করে থাকেন। কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, ভাষা শেখা মানে মস্তিষ্কের একাধিক অংশকে সক্রিয় রাখা। যখন একটি শিশু দুটি ভাষার মধ্যে ভাবনা বদলায়, তখন তার মস্তিষ্কের নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অপ্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দেওয়ার ক্ষমতা এবং স্মৃতি ধরে রাখার দক্ষতা।দ্বিভাষিক শিশুরা প্রায়ই একটি ভাষা থেকে অন্য ভাষায় স্যুইচ করে। এই সুইচিং প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় রাখে, যা পরিকল্পনা, মনোযোগ ও যুক্তিবোধের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দ্বিভাষিকতা কেবল ভাষাগত দক্ষতাই নয়, এটি  জ্ঞানীয় নমনীয়তাও বাড়ায়।

সিঙ্গাপুরে দ্বিভাষিক নীতি পরিচালনা করে Ministry of Education Singapore। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তাদের, ইংরেজি ও মাতৃভাষা বাধ্যতামূলক। ইংরেজি মূল শিক্ষাদান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, মাতৃভাষা শেখানো হয় সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুটি ভাষার শিক্ষাকে আলাদা আলাদা নয়, সমান্তরালভাবে গড়ে তোলা হয়। অর্থাৎ একটি ভাষা শেখার সময় অন্য ভাষার প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য কাঠামোবদ্ধ পরীক্ষা থাকলেও পাঠ্যক্রমে গল্প, নাটক, উপস্থাপনা ও আন্তঃসাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাষা ব্যবহারিক রূপ পায়। ফলে ভাষা বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মস্তিষ্ক বিকাশে প্রভাব: 

দ্বিভাষিক শিশুদের মস্তিষ্কে সাদা পদার্থ সংযোগের ঘনত্ব বেশি দেখা যায়, যা স্নায়ুকোষের মধ্যে যোগাযোগ দ্রুত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত দুই ভাষায় চিন্তা করা শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। সমস্যা সমাধানে সৃজনশীলতাও তাদের বেশি এবং  তাদের  অপ্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দেওয়ার দক্ষতা উন্নত ও কর্মস্মৃতি শক্তিশালী। তাছাড়া গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘমেয়াদে দ্বিভাষিকতা মস্তিষ্কের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সক্ষম। সিঙ্গাপুরের শিক্ষানীতিতে এই  দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও বাস্তবে এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট। 

সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মানসিক ভারসাম্য: ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি পরিচয়ের বাহকও। সিঙ্গাপুরের মতো বহুজাতিক সমাজে ইংরেজি একটি নিরপেক্ষ সংযোগভাষা হলেও মাতৃভাষা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধ বহন করে।

দ্বিভাষিক নীতির ফলে একটি শিশু একই সঙ্গে বিশ্বনাগরিক এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক হয়ে ওঠে। এই ভারসাম্য তাদের সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

চ্যালেঞ্জ:

সব শিশুর জন্য দুই ভাষায় সমান দক্ষতা অর্জন সহজ নয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি ভাষা শক্তিশালী হয়ে অন্যটি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষত বাড়ির পরিবেশ যদি একটি ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে দ্বিতীয় ভাষা আয়ত্তে আনতে অতিরিক্ত অনুশীলন প্রয়োজন হয়।সিঙ্গাপুরে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক ক্লাস, অতিরিক্ত পাঠ্যক্রম ও ভাষাভিত্তিক কার্যক্রম রয়েছে।অভিভাবকদেরও উৎসাহ দেওয়া হয় ঘরে মাতৃভাষায় কথা বলতে।

এই মডেল বিশ্বে কেন এত আলোচিত?

অনেক দেশই এখন বহুভাষিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। তবে সিঙ্গাপুরের মডেল আলাদা কারণ, এটি বাধ্যতামূলক। এটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ এবং  দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনার ফল। শুধু ভাষা দক্ষতা নয়, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। ইংরেজি দক্ষতা দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এগিয়ে রেখেছে, আর মাতৃভাষা সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করেছে।

ভাষা ও নিউরোপ্লাস্টিসিটি:

শিশুদের মস্তিষ্ক অত্যন্ত নমনীয় হয়ে থাকে। একে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। দ্বিভাষিক পরিবেশে বড় হলে মস্তিষ্ক নিয়মিত নতুন স্নায়ুপথ তৈরি করে। যখন একটি শিশু ইংরেজিতে গণিত শেখে এবং মাতৃভাষায় গল্প পড়ে, তখন সে বিভিন্ন ভাষাগত কাঠামোর মধ্যে চলাচল করে। এই মানসিক অনুশীলন ভবিষ্যতে নতুন দক্ষতা শেখার ভিত্তি শক্ত করে।

প্রযুক্তি যুগে দ্বিভাষিকতার গুরুত্ব:

বর্তমান বিশ্বে তথ্যের প্রবাহ বহুভাষিক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই ভাষা দক্ষতা একটি বড় সম্পদ। সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই বহুভাষিক চিন্তার অনুশীলন করে। ফলে তারা বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে দ্রুত অভিযোজিত হতে পারে।

একভাষিকতা কি তবে পিছিয়ে পড়বে?

বিশ্বায়নের যুগে একভাষিক শিক্ষা ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। দ্বিভাষিকতা এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি কৌশলগত প্রয়োজন। সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে, পরিকল্পিত নীতির মাধ্যমে ভাষা শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে।

দুটি ভাষায় ভাবতে শেখা মানে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীকে দেখা। একদিকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দক্ষতা, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক শিকড়ের শক্ত ভিত্তি। এই সমন্বয়ই সিঙ্গাপুরের শিক্ষানীতির সাফল্যের মূল। ভাষা এখানে কেবল পাঠ্যসূচি নয়। এটি মস্তিষ্কের ব্যায়াম, সমাজের সেতুবন্ধন এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।

 


সম্পর্কিত নিউজ