পেটের লোহা গলানো এসিড! তবুও কেন অক্ষত আমাদের শরীর?

পেটের লোহা গলানো এসিড! তবুও কেন অক্ষত আমাদের শরীর?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

কল্পনা করুন তো, এমন এক তরল পদার্থ, যা একটি ইস্পাতের ব্লেডকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গলিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে। শুনতে কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির গল্প মনে হলেও, এটি আসলে আপনার আমার সবার শরীরের ভেতরকার এক বাস্তব চিত্র। আমাদের পাকস্থলীতে থাকা এই অ্যাসিডের নাম হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl)। এটি এতটাই শক্তিশালী যে এর পিএইচ (pH) মাত্রা সাধারণত ১ থেকে ৩ এর মধ্যে থাকে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই মারাত্মক ক্ষয়কারী পদার্থটি আমাদের শরীরের নরম টিস্যু বা মাংসপেশিকে স্পর্শ করলে যেখানে ক্ষত সৃষ্টি করার কথা, সেখানে এটি দিনের পর দিন আমাদের পেটের ভেতরেই নিরাপদে অবস্থান করছে।

গ্যাস্ট্রিক জুস এবং হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের রহস্য:

আমাদের ​পাকস্থলীর দেয়ালে থাকা প্যারাইটাল কোষ থেকে এই হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড নিঃসৃত হয়। এর প্রধান কাজই হলো কঠিন খাদ্যকণা ভেঙে চুরমার করা এবং খাবারের সাথে আসা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করা। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই অ্যাসিডের ঘনত্ব এতই বেশি যে এটি সরাসরি চামড়ায় লাগলে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এমনকি গবেষণাগারে দেখা গেছে, পাকস্থলীর এই অ্যাসিডে যদি একটি ছোট স্টেইনলেস স্টিলের টুকরো ডুবিয়ে রাখা হয়, তবে সেটি কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে।

শরীরের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা:

​তাহলে প্রশ্ন তো জাগতেই পারে যে, আমাদের পাকস্থলী কেন এই অ্যাসিডে গলে যায় না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে থাকা এক অদ্ভুত প্রতিরক্ষামূলক স্তরে। আমাদের পাকস্থলী ক্রমাগত এক ধরনের পিচ্ছিল এবং ঘন পদার্থ নিঃসরণ করে, যাকে বলা হয় মিউকাস।  এই মিউকাস স্তরটি পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে একটি পাতলা কিন্তু দুর্ভেদ্য পর্দা তৈরি করে রাখে। এই মিউকাস স্তরে প্রচুর পরিমাণে বাইকার্বনেট (HCO_3^-) থাকে, যা ক্ষারীয় প্রকৃতির হয়ে থাকে। যখন অ্যাসিড এই স্তরের সংস্পর্শে আসে, তখন বাইকার্বনেট সেই অ্যাসিডকে প্রশমিত বা নিউট্রালাইজ করে দেয়। ফলে অ্যাসিড পাকস্থলীর মূল পেশি বা কোষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। এটি ঠিক যেন আগুনের ওপর পানি ঢেলে নিজেকে রক্ষা করার মতো একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া।

​প্রাকৃতিক এই সুরক্ষা ব্যবস্থা এখানেই শেষ নয়। পাকস্থলীর ভেতরের এই লড়াইয়ে কিছু কোষ সবসময়ই অ্যাসিডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। কিন্তু মানবদেহের এক বিস্ময়কর ক্ষমতা হলো এর দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। পাকস্থলীর ভেতরের আবরণের কোষগুলো প্রতি ৩ থেকে ৫ দিন অন্তর সম্পূর্ণ নতুন কোষে প্রতিস্থাপিত হয়। অর্থাৎ, অ্যাসিড যে অংশটিকে সামান্যতম ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ পায়, শরীর তৎক্ষণাৎ সেখানে নতুন কোষের স্তর বসিয়ে দেয়। এর ফলে কোনো বড় ধরনের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার সুযোগ থাকে না।

​ভারসাম্য নষ্ট হলেই বিপদ!

​যতক্ষণ পর্যন্ত অ্যাসিডের নিঃসরণ এবং মিউকাস স্তরের সুরক্ষা স্তরের মধ্যে ভারসাম্য থাকে, ততক্ষণই আমরা নিরাপদ। কিন্তু যখন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার যেমন H. pylori- র কারণে এই মিউকাস স্তর পাতলা হয়ে যায়, তখনই অ্যাসিড সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে আঘাত হানে। একেই আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গ্যাস্ট্রিক আলসার বলে থাকি।

​আমাদের  শরীর হলো এক পরম বিস্ময়কর রসায়নাগার। শক্তিশালী অ্যাসিডের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে খাবার হজম করা, আবার সেই ধ্বংসাত্মক শক্তি থেকেই নিজেকে অত্যন্ত নিপুণভাবে বাঁচিয়ে রাখা, এই দ্বিমুখী ভারসাম্যই প্রাণের টিকে থাকাকে সম্ভব করেছে। আমাদের পেটের ভেতরের এই অ্যাসিড বর্ম ভাবতে বাধ্য করে, প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি কতই না গভীর এবং জটিল গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

 


সম্পর্কিত নিউজ