{{ news.section.title }}
মানুষ কেন কাজ করে? অনুপ্রেরণার আসল রহস্য এক বইয়ে
কেন কেউ ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে ম্যারাথনের জন্য দৌড়ায়, আর কেউ জিম মেম্বারশিপ নিয়েও বিছানা ছাড়তেই পারে না! এডওয়ার্ড এল ডেসি আমাদের নিয়ে যান মানুষের মনের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যেখানে জন্ম নেয় সেলফ ডিটারমিনেশন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। এই বই আমাদের শেখায়, সফল হওয়ার জন্য বাহ্যিক মোটিভেশনাল স্পিচ বা তালি নয়, বরং প্রয়োজন তিনটি জিনিসের সমন্বয়।স্বায়ত্তশাসন, দক্ষতা এবং অন্যের সাথে গভীর সম্পর্ক। আপনি কি নিজের জীবনের চালক, নাকি স্রেফ পরিস্থিতির শিকার? আপনার প্রতিদিনের আচরণের পেছনের সেই গোপন কেন টাকে খুঁজে পেতে, Why We Do What We Do বইটি এক অনন্য ম্যাপ। যার লেখক প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী Edward L. Deci। বইটি শুধুই তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি মানুষের সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে অনুপ্রেরণার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে।
বইটির কেন্দ্রীয় ধারণা গড়ে উঠেছে Self-Determination Theory এর ওপর।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের অনুপ্রেরণা দুই ধরনের।
১. বাহ্যিক অনুপ্রেরণা, যখন আমরা পুরস্কার, বেতন, নম্বর বা সামাজিক স্বীকৃতির জন্য কিছু করি।
২. অন্তর্গত অনুপ্রেরণা, যখন কাজটি নিজেই আনন্দ দেয়, অর্থপূর্ণ মনে হয়, কিংবা আত্মতৃপ্তি এনে দেয়।
ডেসির বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্গত অনুপ্রেরণাই বেশি স্থায়ী ও কার্যকর।
বইটির একটি চমকপ্রদ দিক হলো এটি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা সাধারণত মনে করে থাকি যে, বেশি পুরস্কার দিলে মানুষ বেশি কাজ করবে। কিন্তু গবেষণালব্ধ তথ্য দেখায়, যখন কোনো কাজ আগে থেকেই উপভোগ্য, সেখানে অতিরিক্ত বাহ্যিক পুরস্কার কখনও কখনও অন্তর্গত আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যে শিশু আঁকতে ভালোবাসে, তাকে যদি বারবার পুরস্কার দিয়ে আঁকতে বলা হয়, সে হয়তো ধীরে ধীরে আনন্দের বদলে পুরস্কারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
Self-Determination Theory অনুযায়ী মানুষের রয়েছে তিনটি মৌলিক মানসিক চাহিদা।
১. স্বায়ত্তশাসন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা।
২. দক্ষতার অনুভূতি, নিজের সক্ষমতা উপলব্ধি করা।
৩. সম্পর্কবোধ, অন্যদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার অনুভূতি।
যখন এই তিনটি চাহিদা পূরণ হয়, তখন অন্তর্গত অনুপ্রেরণা বৃদ্ধি পায়। বইটি দেখায়, যে পরিবেশে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেখানে অনুপ্রেরণা ক্ষীণ হয়ে যায়। আর যেখানে স্বাধীনতা ও সমর্থন দেওয়া হয়, সেখানে সৃজনশীলতা বিকশিত হয়।
এই বইয়ের গুরুত্ব এখানেই যে এটি শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় যদি শিক্ষার্থীদের কেবল নম্বরের চাপ দেওয়া হয়, তারা হয়তো পরীক্ষায় ভালো করবে, কিন্তু শেখার আনন্দ হারাতে পারে। অন্যদিকে, যদি শেখাকে অর্থপূর্ণ ও স্বাধীনভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তাদের শেখার গভীরতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র। কেবল বোনাস বা শাস্তির মাধ্যমে কর্মীদের পরিচালনা করলে দীর্ঘমেয়াদে মনোবল হ্রাস পেতে পারে। উল্টোদিকে দায়িত্ববোধ, অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতি অনুপ্রেরণাকে টেকসই করে।
বইটি পাঠককে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিই, নাকি সামাজিক চাপ ও প্রত্যাশা আমাদের চালিত করে! ডেসি দেখান, মানুষ যখন অনুভব করে যে সে নিজের ইচ্ছায় কাজ করছে, তখন তার মানসিক সুস্থতা উন্নত হয়। কিন্তু যদি সে মনে করে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে, তখন মানসিক চাপ বাড়ে।
অনুপ্রেরণা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় নয়। এটি সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। যখন একজন ব্যক্তি অনুভব করেন যে তিনি সম্মানিত ও সমর্থিত, তখন তার ভেতরের শক্তি জাগ্রত হয়। বইটি দেখায়, স্বীকৃতি ও সহমর্মিতা মানুষের আচরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
যদিও বইটি প্রভাবশালী, তবুও কিছু সমালোচক বলেন, বাস্তব পৃথিবীতে বাহ্যিক অনুপ্রেরণা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো অনেক সময় পুরস্কারভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তবে বইটির মূল বক্তব্য পুরস্কারকে বাতিল করা নয়, বরং তার সীমাবদ্ধতা বোঝানো।
ভাষা ও উপস্থাপনা:
“Why We Do What We Do”–এর ভাষা একাডেমিক হলেও বোধগম্য। গবেষণার তথ্য ও উদাহরণ একত্রে উপস্থাপিত হয়েছে। এটি এমন পাঠকের জন্য উপযোগী, যিনি মনোবিজ্ঞানের গভীর বিশ্লেষণ জানতে চান এবং দৈনন্দিন জীবনে তা প্রয়োগ করতে আগ্রহী।
এই বই আমাদের শেখায় মানুষ কেবল পুরস্কারের যন্ত্র নয়। তার ভেতরে আছে অর্থ খোঁজার তাগিদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের প্রয়োজন।